আমরা কেন আবেগময় ঘটনাগুলো এত ভালোভাবে মনে রাখতে পারি? ১৫ অক্টোবর, ২০২৫ Nature জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা জানাচ্ছে, মস্তিষ্কের অ্যাস্ট্রোসাইট (astrocyte) নামের এক বিশেষ ধরনের কোষ দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি স্থায়ী করে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এর আগে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, অ্যাস্ট্রোসাইট শুধু নিউরনকে সাহায্য করে মস্তিষ্কে স্মৃতির ছাপ (memory trace) তৈরি করতে। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এই কোষগুলো আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, এমনকি আবেগময় অভিজ্ঞতা বারবার ঘটলে এরা সরাসরি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। গবেষকরা মনে করছেন, এই কোষগুলো ভবিষ্যতে আলঝেইমার বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)-এর মতো রোগের চিকিৎসায় নতুন লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
গবেষণার সহলেখক ও জাপানের RIKEN Center for Brain Science-এর নিউরোসায়েন্টিস্ট জুন নাগাই বলেন, “আমরা এই গবেষণায় দেখিয়েছি, কীভাবে একটি নির্দিষ্ট স্মৃতি দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষিত থাকে।”
তিনি আরও বলেন, অ্যাস্ট্রোসাইট নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে বোঝা যায়, মস্তিষ্ক কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলো বেছে রাখে এবং অপ্রয়োজনীয়গুলো বাদ দেয়।
স্মৃতির স্থায়িত্বের রহস্য
নাগাই ও তাঁর সহকর্মীরা গবেষণায় মনোযোগ দেন কীভাবে স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি মস্তিষ্কে স্থায়ী হয়ে যায়, তা খুঁজে বের করতে। আগের গবেষণায় দেখা গেছে, হিপোক্যাম্পাস ও অ্যামিগডালা অঞ্চলের নিউরন নেটওয়ার্কে স্মৃতির ছাপ বা “এনগ্রাম” তৈরি হয়। কিন্তু সেই এনগ্রামগুলো কীভাবে স্থায়ী স্মৃতিতে রূপ নেয়, তা পরিষ্কার ছিল না।
এই রহস্য খুঁজে বের করতে বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ প্রযুক্তি তৈরি করেন, যার মাধ্যমে ইঁদুরের পুরো মস্তিষ্কে অ্যাস্ট্রোসাইটের কার্যকলাপ মাপা যায়। তারা Fos নামের একটি জিনের মাত্রা পরিমাপ করেন, যা কোষ সক্রিয়তার প্রাথমিক নির্দেশক এবং স্মৃতির ছাপের সঙ্গে সম্পর্কিত।
পরীক্ষায় ইঁদুরকে একটি খাঁচায় হালকা বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়, যাতে তারা ভয় পায় এবং সেই পরিবেশের সঙ্গে অস্বস্তির স্মৃতি যুক্ত করে। পরে, কয়েক দিন পর আবার একই খাঁচায় ফিরিয়ে দিলে তারা সেই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা মনে করে ফেলে। এই সময় বিজ্ঞানীরা দেখেন, ইঁদুরের অ্যামিগডালা ও অন্য মস্তিষ্ক অঞ্চলে অ্যাস্ট্রোসাইটের Fos জিনের কার্যকলাপ বেড়ে যায়, কিন্তু প্রথমবারের ভয়ের অভিজ্ঞতার সময় তা দেখা যায়নি।
নাগাই বলেন, “সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অ্যাস্ট্রোসাইট প্রথমবার ভয় পেলে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, কিন্তু দ্বিতীয়বার একই অভিজ্ঞতা ঘটলে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।”
মস্তিষ্কে আবেগের ছাপ
গবেষকরা এরপর ট্রান্সক্রিপটোমিক্স (transcriptomics) পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখেন, অ্যাস্ট্রোসাইটে কী ধরনের জৈব পরিবর্তন ঘটে। ফলাফলে দেখা যায়, ভয়ের অভিজ্ঞতার সময় সক্রিয় হওয়া অ্যাস্ট্রোসাইটগুলো তাদের কোষ-পৃষ্ঠে noradrenergic receptor নামের এক ধরনের প্রোটিন তৈরি করে। এই রিসেপ্টরগুলো noradrenaline নামের রাসায়নিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অ্যাস্ট্রোসাইটকে সক্রিয় করে, ফলে তারা নিউরনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
নাগাই বলেন, “অ্যাস্ট্রোসাইট বুঝে ফেলে যে কিছু ভীতিকর ঘটছে, এবং তাদের আণবিক প্রতিক্রিয়া কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।”
এই সময়কালেই বারবারের অভিজ্ঞতা অ্যাস্ট্রোসাইটে স্থায়ী আণবিক পরিবর্তন আনে, যা একে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপ দেয়।
নতুন চিকিৎসার দিগন্ত
স্পেনের University of Navarra-এর নিউরোসায়েন্টিস্ট মাইতে সোলাস সুবিয়াউরে বলেন, “এটি নিউরোসায়েন্সে এক বিপ্লবী আবিষ্কার। এখন পর্যন্ত সবাই মনে করত শুধু নিউরনই স্মৃতি সংরক্ষণ করে, কিন্তু এই গবেষণা সেই ধারণা বদলে দিতে পারে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “অ্যাস্ট্রোসাইট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্মৃতি উন্নত করার নতুন চিকিৎসা পথ খুলে যাবে। এটি শুধু সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, আলঝেইমার বা অন্যান্য স্মৃতিজনিত রোগের চিকিৎসাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
———
The astrocytic ensemble acts as a multiday trace to stabilize memory. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09619-2
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


