গবেষকরা সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় অ্যান্টিবডি-ভিত্তিক থেরাপি উন্নয়নের দিকে ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এসব থেরাপি বার্ড ফ্লু-এর মতো রোগের সংক্রমণের তীব্রতা কমাতে এবং এইচআইভি (HIV)-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিরাময়ের লক্ষ্যেও তৈরি করা হচ্ছে। কৃত্রিম অ্যান্টিবডি ভবিষ্যতে কোভিড-১৯-এর মতো রোগের ভ্যাকসিনকে আরও কার্যকর করতেও সাহায্য করতে পারে।
অ্যান্টিবডি হলো দেহের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের বি-সেল (B cells) ও মানব কোষের লাইন মিলিয়ে কৃত্রিম অ্যান্টিবডি তৈরি করেন। বর্তমানে অনুমোদিত অধিকাংশ অ্যান্টিবডি-ভিত্তিক ওষুধ ক্যান্সার এবং অটোইমিউন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
রুনহং ঝৌ (Runhong Zhou), যিনি হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ে রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেন, জানান যে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ইতোমধ্যেই ইবোলা, রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (RSV) এবং কোভিড-১৯ ভাইরাস SARS-CoV-2 দ্বারা সৃষ্ট গুরুতর সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (বার্ড ফ্লু)-এর ক্ষেত্রে আগের অ্যান্টিভাইরাল প্রচেষ্টাগুলো তেমন সফল হয়নি, কারণ ভাইরাসটি দ্রুত মিউটেশন (জিনগত পরিবর্তন) ঘটিয়ে চিকিৎসাকে কম কার্যকর করে তোলে। একই কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোভিড-১৯-এর অ্যান্টিবডি ওষুধগুলোর কার্যকারিতাও কমে গেছে।
H5N1 বার্ড ফ্লু ভাইরাসের জন্য ঝৌ এবং তার সহকর্মীরা এমন একটি অ্যান্টিবডি তৈরি করেছেন, যার দুটি লক্ষ্যবস্তু রয়েছে—ভাইরাসের পৃষ্ঠের প্রোটিনের “স্টেম” অংশ এবং মানুষের কোষের রিসেপ্টর। কোষের ওপর করা পরীক্ষায় তারা দেখতে পান যে এই অ্যান্টিবডিটি বার্ড ফ্লু-এর একাধিক জীবিত (লাইভ) স্ট্রেইনকে নিষ্ক্রিয় করতে পেরেছে এবং শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনকে লক্ষ্য করে তৈরি করা সাধারণ মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডির চেয়ে বেশি কার্যকরভাবে ভাইরাসকে কোষে ঢোকা বা কোষে লেগে থাকা থেকে বাধা দিয়েছে। তাদের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, একই সঙ্গে ভাইরাসের স্টেম এবং মানব কোষের রিসেপ্টরকে লক্ষ্য করা “অ্যান্টিবডির কার্যকারিতা বাড়ানোর একটি ভালো কৌশল”।
এই গবেষণাগুলো নিয়ে ঝৌ এবং তার দল গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত Pandemic Research Alliance International Symposium-এ তাদের ফলাফল উপস্থাপন করেন। তবে এই সুরক্ষা কতদিন স্থায়ী হবে, বা অ্যান্টিবডি চিকিৎসা ভাইরাসে এমন মিউটেশন তৈরি করতে পারে কি না যাতে ভাইরাসটি ভবিষ্যতে ইমিউন সিস্টেমকে ফাঁকি দিতে পারে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
নিউইয়র্ক সিটির কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মেডিকেল ছাত্র হসিয়াং হং (Hsiang Hong) এবং তার দলও H5N1 নিয়ে কাজ করছেন। তারা এমন একগুচ্ছ (প্যানেল) মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি তৈরি করছেন, যা ভাইরাসটির একাধিক অংশকে লক্ষ্য করে। এর মাধ্যমে তারা ভাইরাসটি সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে তা ট্র্যাক করতে এবং এমন চিকিৎসা খুঁজে বের করতে চান, যা ভাইরাসের একাধিক ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধেই কাজ করতে পারে।
অ্যান্টিবডি অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতাও বাড়াতে পারে, যেমন ভ্যাকসিন। যেহেতু অধিকাংশ ভাইরাস দ্রুত মিউটেশন ঘটায়, তাই ভ্যাকসিনকে নিয়মিত আপডেট করতে হয়।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিউনোলজি গবেষক ঝিওয়েই চেন (Zhiwei Chen) বলেন, এমন অ্যান্টিবডি, যা SARS-CoV-2-এর অত্যন্ত সংরক্ষিত (highly conserved) অংশে বাঁধতে পারে, তা ভাইরাস মিউটেশন করলেও ভ্যাকসিনকে কার্যকর রাখতে সাহায্য করতে পারে। চেন এবং তার দল SARS-CoV-2 ভাইরাসের পৃষ্ঠের এমন কয়েকটি অংশ শনাক্ত করেছেন যা মিউটেশনের সময় তেমন পরিবর্তিত হয় না। তারা আরও দেখেছেন যে, এসব সংরক্ষিত অংশকে লক্ষ্য করে তৈরি কয়েকটি অ্যান্টিবডি বিভিন্ন ধরনের করোনাভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে পেরেছে, যেমন SARS-CoV-1 (যা মারাত্মক শ্বাসযন্ত্রের রোগ SARS সৃষ্টি করে), SARS-CoV-2-এর বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট এবং বাদুড় ও প্যাঙ্গোলিনে পাওয়া কিছু করোনাভাইরাস।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অবস্থিত Peter Doherty Institute of Infection and Immunity-এর সংক্রামক রোগ গবেষক শ্যারন লিউইন (Sharon Lewin) এবং তার দল এইচআইভি চিকিৎসা উন্নত করতেও অ্যান্টিবডি ব্যবহার করতে চান। বর্তমানে এইচআইভি রোগীরা অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ নেন, যা দেহে ভাইরাল লোড কমিয়ে আনে। তবে তাদের শরীরে এমন কিছু নিষ্ক্রিয় টি-সেল (T cells) রয়ের যায়, যেগুলো ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত থাকে এবং ওষুধ বন্ধ করলে পুনরায় সক্রিয় হতে পারে।
এই রিজার্ভার কমানোর একটি কৌশল হলো এসব ঘুমিয়ে থাকা টি-সেলকে আবার সক্রিয় করা, যাতে ইমিউন সিস্টেম সেগুলো ধ্বংস করতে পারে। এ বছরের শুরুতে গবেষকরা Nature Communications জার্নালের এক প্রতিবেদনে, তারা mRNA-যুক্ত একটি ছোট অণু (small molecule) টি-সেলে পৌঁছে দিয়ে নিষ্ক্রিয় কোষকে পুনরায় সক্রিয় করতে পেরেছেন, যদিও প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় সেই অণুটি কার্যকরভাবে টি-সেলে পৌঁছাতে পারেনি। পরে তারা আবিষ্কার করেন, সেই ছোট অণুটির সঙ্গে একটি অ্যান্টিবডি যুক্ত করলে সেটিকে সঠিকভাবে টি-সেলের দিকে পরিচালিত করা যায়, লিভারে ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করা যায় এবং “scavenger cells” নামের কোষ, যা বাইরের কণাকে ধ্বংস করে, তাদের হাত থেকেও সুরক্ষা দেওয়া যায়।
এইচআইভি সংক্রমণ নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, স্বল্প সময়ের জন্য মানুষকে অ্যান্টিবডি দিলে তাদের ইমিউন সিস্টেমের কাজ করার ধরনে পরিবর্তন আসে, বলেন লিউইন। তিনি আরও যোগ করেন, “প্রমাণ রয়েছে যে, অ্যান্টিবডি গ্রহণের পর ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা উন্নত হয়,” এমনকি কেউ অ্যান্টিবডি নেওয়া বন্ধ করার পরও। মার্চে প্রকাশিত একটি প্রিপ্রিন্ট গবেষণায় (যা পরে একটি পিয়ার-রিভিউড জার্নালে গৃহীত হয়েছে) লিউইন ও তার সহকর্মীরা মডেল তৈরি করে দেখিয়েছেন যে, অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসার সময় বা ঠিক পরে যদি ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবডি দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অনেক ক্ষেত্রে আজীবন ওষুধের প্রয়োজন নাও হতে পারে।
তবে লিউইন বলেন, সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবডি থেরাপিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করার আগে এখনও অনেক কাজ বাকি। বর্তমানে অ্যান্টিবডি সরাসরি শিরায় (ইনফিউশন) দিতে হয়; মুখে খাওয়ার মতো কোনো সংস্করণ এখনো নেই, যা সাধারণত ব্যবহার করা সহজ এবং উৎপাদন খরচও কম। পাশাপাশি, যদিও এমন অ্যান্টিবডি তৈরি করা হচ্ছে যা ভাইরাসের বহু স্ট্রেইনকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে, তবুও প্রায়ই একাধিক অ্যান্টিবডির প্রয়োজন হয় সব স্ট্রেইনকে লক্ষ্য করতে, যা চিকিৎসাকে ব্যয়বহুল করে তোলে।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


