মানুষের শেখা ও স্মৃতিশক্তির পেছনে বড় ভূমিকা রাখে নিউরাল স্টেম সেল। এই বিশেষ কোষগুলো থেকেই নতুন নিউরন তৈরি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব স্টেম সেলের নিজেকে রিজেনারেট করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। এর ফল হিসেবে দেখা দেয় স্মৃতিভ্রংশ, শেখার ক্ষমতা হ্রাস, এবং মানসিক কর্মদক্ষতার অবনতি। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন, কেন বয়স বাড়লে স্টেম সেলের এই ক্ষমতা নষ্ট হয় এবং কীভাবে তা ফিরিয়ে আনা যায়।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের গবেষকেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছেন। তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে, DMTF1 নামের একটি প্রোটিন মস্তিষ্কের স্টেম সেলের রিজেনারেট ক্ষমতা ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। বয়সজনিত কারণে যখন এই প্রোটিনের মাত্রা কমে যায়, তখন স্টেম সেল দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার কৃত্রিমভাবে DMTF1-এর মাত্রা বাড়ালে স্টেম সেলের কর্মক্ষমতা অনেকটাই ফিরে আসে। গবেষণাপত্রটি গত ২ জানুয়ারি ২০২৬ এ Science Advances জার্নালে প্রকাশিত হয়।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন এনইউএস মেডিসিনের ফিজিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অং সেক টং ডেরিক। প্রধান লেখক ছিলেন ড. লিয়াং ইয়াজিং। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, মস্তিষ্কের স্টেম সেল কেন বয়সের সঙ্গে দুর্বল হয়, সেই জৈবিক কারণগুলো শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যৎ চিকিৎসার জন্য সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
গবেষণার জন্য তাঁরা মানুষের নিউরাল স্টেম সেল এবং পরীক্ষাগারে তৈরি এমন কিছু মডেল ব্যবহার করেন, যেগুলো দ্রুত বার্ধক্যের বৈশিষ্ট্য দেখায়। উন্নত জিন বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁরা খতিয়ে দেখেন, DMTF1 কীভাবে বিভিন্ন জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় টেলোমিয়ার নামের গঠনটির ওপর। টেলোমিয়ার হলো ক্রোমোজোমের প্রান্তে থাকা সুরক্ষামূলক অংশ, যা প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় একটু করে ছোট হয়। এই ক্ষয়কে বয়স বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চিহ্ন ধরা হয়।
ক্রেডিট: National University of Singapore
গবেষকেরা দেখেন, টেলোমিয়ার ক্ষয়ের ফলে নিউরাল স্টেম সেলে DMTF1-এর মাত্রা অনেক কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কোষ বিভাজন ও নতুন নিউরন তৈরির ক্ষমতার ওপর। যখন তাঁরা পরীক্ষামূলকভাবে এই কোষগুলোর ভেতরে আবার DMTF1-এর মাত্রা বাড়ান, তখন স্টেম সেল নতুন করে বিভাজিত হতে শুরু করে এবং স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরে পায়। এই ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখায়, DMTF1 বার্ধক্যজনিত স্টেম সেল দুর্বলতা কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও গভীর বিশ্লেষণে জানা যায়, DMTF1 সরাসরি Arid2 এবং Ss18 নামের দুটি সহায়ক জিনকে সক্রিয় করে। এই জিন দুটি ডিএনএর গঠনকে এমনভাবে শিথিল করে, যাতে বৃদ্ধি ও কোষ বিভাজনের সঙ্গে জড়িত জিনগুলো সহজে কাজ করতে পারে। এই প্রক্রিয়া না হলে নিউরাল স্টেম সেল নতুন কোষ তৈরি করতে পারে না। ফলে মস্তিষ্কে নতুন নিউরন তৈরির হার কমে যায় এবং ধীরে ধীরে স্মৃতি ও শেখার ক্ষমতা ক্ষয় হতে থাকে।
সহকারী অধ্যাপক অং বলেন, নিউরাল স্টেম সেলের দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরেই মস্তিষ্কের বার্ধক্যের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা ছিল। নতুন কোষ তৈরি কমে গেলে শেখা ও স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত স্নায়ু সার্কিট ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। আগের কিছু গবেষণায় এই দুর্বলতা আংশিকভাবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও, এর পেছনের মূল প্রক্রিয়া পরিষ্কার ছিল না। এই গবেষণা সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করেছে।
গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যৎ চিকিৎসার জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এমন চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব, যা DMTF1-এর মাত্রা বাড়াতে পারবে অথবা এর কার্যকারিতা শক্তিশালী করবে। এতে বয়সজনিত কারণে স্টেম সেলের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীর করা যাবে অথবা আংশিকভাবে উল্টে দেওয়া যাবে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করছেন, এই ফলাফল মূলত পরীক্ষাগারে কোষের ওপর করা পরীক্ষার ভিত্তিতে পাওয়া। মানুষের শরীরে এর পূর্ণ প্রভাব বুঝতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে তাঁরা পরীক্ষা করতে চান, জীবিত প্রাণীর শরীরে DMTF1 বাড়ালে সত্যিই কি নতুন নিউরন তৈরির হার বাড়ে এবং শেখা ও স্মৃতিশক্তির উন্নতি ঘটে কিনা। একই সঙ্গে তাঁরা নিশ্চিত হতে চান, এই প্রক্রিয়ায় যেন মস্তিষ্কে টিউমারের ঝুঁকি না বাড়ে।
দীর্ঘমেয়াদে গবেষকদের লক্ষ্য হলো, এমন ছোট অণু বা ওষুধ তৈরি করা, যা নিরাপদভাবে DMTF1 সক্রিয় করতে পারবে। এর মাধ্যমে বয়সজনিত মস্তিষ্ক দুর্বলতা ও স্মৃতিভ্রংশের বিরুদ্ধে কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব হতে পারে।
ড. লিয়াং বলেন, এই গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, এটি দেখিয়েছে বয়সের সঙ্গে জিনগত পরিবর্তন কীভাবে নিউরাল স্টেম সেলের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। ভবিষ্যতে এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বার্ধক্যজনিত মানসিক অবনতি ঠেকানোর বাস্তবসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
———
DMTF1 up-regulation rescues proliferation defect of telomere dysfunctional neural stem cells via the SWI/SNF-E2F axis. Science Advances (2026).
DOI: 10.1126/sciadv.ady5905
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



