ডাইনোসর ধ্বংসকারী গ্রহাণুর আঘাতের পর পৃথিবীর জীবজগৎ আশ্চর্যজনক দ্রুততায় ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। নতুন এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মহাবিলুপ্তির ঘটনার মাত্র কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই সামুদ্রিক জীবের প্রথম নতুন ঢেউ আবির্ভূত হয়। বহু বিজ্ঞানীর ধারণার তুলনায় সময়টি ছিল বহু গুণ কম।
২১ জানুয়ারি ২০২৬ Geology জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিবর্তন কত দ্রুত জীববৈচিত্র্য পুনর্গঠন করতে পারে। শুধু ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে চিক্ষুলুব গ্রহাণুর আঘাতের পর নয়, বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট পরিবেশগত চাপের সময়েও এই ধারণা গুরুত্বপূর্ণ।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিওওশানোগ্রাফার ক্রিস্টোফার লোয়ারি বলেন, এই ফলাফল দেখায় প্রজাতি কত দ্রুত বিবর্তিত হতে পারে। দ্রুত ও তীব্র পরিবেশগত পরিবর্তনের পর বাস্তুতন্ত্র কীভাবে পুনরুদ্ধার হয়, তা বোঝার বিরল সুযোগ দেয় এই গবেষণা।
প্রমাণ এসেছে প্ল্যাঙ্কটোনিক ফোরামিনিফেরা (planktonic foraminifera) নামের সামুদ্রিক জীবাশ্ম থেকে। এরা এককোষী, অতি ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী, যাদের দেহ ঘিরে থাকে খনিজের খোলস। এই গোষ্ঠীর একটি প্রজাতি Parvularugoglobigerina eugubina এর প্রথম উপস্থিতিকেই গ্রহাণু আঘাতের পর জীবনের পুনরুত্থানের সূচক ধরা হয়।
২০১১ সালের এক বহুল জনপ্রিয় গবেষণায় বলা হয়েছিল, গ্রহাণুর আঘাতের প্রায় ৩০ হাজার বছর পর এই প্রজাতির আবির্ভাব ঘটে। হিসাবটি করা হয়েছিল শিলা স্তরের পুরুত্ব মেপে এবং দীর্ঘ সময়ের গড় পলিসঞ্চয়ের হার ধরে।
ক্রেডিট: Chris Lowery
লোয়ারি নিজেও দীর্ঘদিন এই সংখ্যাকে সঠিক ভেবেছিলেন। কিন্তু পরে অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে এই হিসাবের গরমিল দেখা দেয়।
চিক্ষুলুব গহ্বর থেকে সংগৃহীত পলির নমুনা বিশ্লেষণ করে লোয়ারি ও তাঁর সহকর্মীরা হিলিয়াম-৩ ব্যবহার করেন। এই বিরল গ্যাস মহাজাগতিক ধূলিকণার মাধ্যমে প্রায় ধ্রুব গতিতে পৃথিবীতে পৌঁছায়। এর সাহায্যে তাঁরা নির্ণয় করেন, আঘাতের পর কত দ্রুত পলি জমেছিল। ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। দেখা যায়, P. eugubina মাত্র ৬ হাজার বছরের মধ্যেই বিবর্তিত হয়। প্রথমে লোয়ারি নিজেও এই ফলাফলে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেননি।
পরে তাঁরা ইতালি, স্পেন ও তিউনিসিয়াসহ বিশ্বের ছয়টি স্থান থেকে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এসব জায়গায় হিলিয়াম-৩ মাপা হয়েছিল এবং প্রথম দিককার জীবাশ্ম শনাক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু সময়রেখা নতুন করে হিসাব করা হয়নি।
সব তথ্য একত্র করে দেখা যায়, পলি জমতে আগের ধারণার তুলনায় অনেক কম সময় লেগেছে। গড়ে P. eugubina আবির্ভূত হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ বছর পর। অন্য নতুন প্ল্যাঙ্কটন প্রজাতিগুলো দেখা দিয়েছে এক থেকে দুই হাজার বছরের মধ্যেই।
এরপর দ্রুত নতুন প্রজাতির বিস্ফোরণ ঘটে। ডাইনোসরসহ উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রায় ৭৫ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পর যে পরিবেশগত শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করে নেয় নতুন জীবেরা। এই সংক্ষিপ্ত সময়রেখা দেখায়, প্রারম্ভিক প্যালিওসিন যুগ ছিল ধীর পুনরুদ্ধারের সময় নয়, বরং দ্রুত বিবর্তনী উদ্ভাবনের অধ্যায়। এমনকি এই হিসাবও হয়তো প্রকৃত গতির তুলনায় ধীর।
গত বছর স্মিথসোনিয়ান জাদুঘরের প্যালিওবায়োলজিস্ট ব্রায়ান হুবার ও তাঁর দল জীবাশ্মের খোলসে সংরক্ষিত তাপমাত্রার সংকেত বিশ্লেষণ করে দেখান, নতুন প্ল্যাঙ্কটন প্রজাতি গ্রহাণু আঘাতের মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই আবির্ভূত হয়ে থাকতে পারে।
তাঁরা জলবায়ু মডেলের সঙ্গে জীবাশ্মের তথ্য মিলিয়ে দেখান, আঘাতের পর স্বল্প সময়ের অন্ধকার কাটিয়ে আকাশ দ্রুত পরিষ্কার হয়। এরপর শুরু হয় দ্রুত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, যা সামুদ্রিক পরিবেশে বিবর্তনের গতি বাড়িয়ে দেয়।
হুবার বলেন, যদি এই মডেলগুলো সঠিক হয়, তবে বিবর্তনের গতি কল্পনার চেয়েও দ্রুত ছিল। বিষয়টি চোখ খুলে দেওয়ার মতো।
সুইডিশ ন্যাশনাল মিউজিয়ামের প্যালিওবায়োলজিস্ট ভিভি ভাইদা বলেন, বিপর্যয়ের পর সামান্য সুযোগ পেলেই জীবন দ্রুত ফিরে আসতে শুরু করে। তবে লোয়ারি মনে করিয়ে দেন, দ্রুত নতুন প্রজাতির উদ্ভব হলেও পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধারে লেগেছে লক্ষ লক্ষ বছর। আর ডাইনোসরের মতো প্রাণীরা আর কখনো ফিরে আসেনি।
বিবর্তন বিস্ময়কর দ্রুততায় নতুন পথ তৈরি করতে পারে, কিন্তু মুহূর্তে সব ক্ষতি পূরণ করতে পারে না।
———
New species evolved within a few thousand years of the Chicxulub Impact. Geology (2026).
DOI: 10.1130/G53313.1
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



