নতুন বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসটি বর্ণময় ঘটনায় মোড়া। শুরুতেই একপ্রস্ফুটিত পূর্ণ তুষার চন্দ্রের সাক্ষী থেকেছে বিশ্ববাসী। খালি চোখেই, স্নিগ্ধ শশীর আলো উপভোগ করেছেন মহাকাশপ্রেমীরা। শুধু কি তাই? উল্কাবৃষ্টি, সূর্যগ্রহণ, আমাদের প্রতিবেশী বুধ গ্রহের সূর্য থেকে সবচেয়েদূরে অবস্থান, বুধ সহ ছয়টি গ্রহের কুচকাওয়াজ তথা প্যারেড, বলতে গেলে সারা মাস জুড়েই যেন মহাকাশে উৎসব লেগেই রয়েছে।
সাধারণত, দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোতে, প্রতি ফেব্রুয়ারিতে আলফাসেন্টোরিড উল্কাবৃষ্টির দর্শন মেলে, এবং এই সময়ে গড়ে ঘণ্টায় ৩ টি উল্কার দেখা পাওয়া যায়। এই বছর, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দেখা মিলেছে এই মহাজাগতিক বস্তুর। তবে গত ৮ই ফেব্রুয়ারি, রবিবার রাতের আকাশে, এর প্রাচুর্য লক্ষ্য করা গেছে (ঘণ্টায় ৬টি)। আর সম্প্রতি, ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আকাশে দেখা মেলে সেন্টোরাস নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে সৃষ্ট এই উল্কাবৃষ্টি।
আবার, গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি, অ্যান্টার্কটিকার একটি প্রত্যন্ত অংশ থেকে বিরল বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। এইসময় চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে চলে আসে, কিন্তু পৃথিবী থেকে এতটা দূরে অবস্থান করে যে, সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারেনা (এই সময় চাঁদ সূর্যের কেন্দ্রের সর্বোচ্চ ৯৬% অংশ ঢেকে দিয়েছিল)। এর ফলে সূর্যের চারপাশে একটি “আগুনের বলয়” তৈরি হয়, সে যেন এক অনলের আংটি! যার চারপাশ থেকে ঠিকরান বেরোতে থাকে আলো। এরই পোশাকি নাম, ‘অ্যানুলার সোলার ইক্লিপস (Annular Solar Eclipse)’। প্রায় ২ মিনিট ২০ সেকেন্ড সময় ধরে চলে এই মহাজাগতিক দৃশ্য । অ্যান্টার্কটিকা ও দক্ষিণ ভারত মহাসাগর এলাকা ছাড়াও আর্জেন্টিনা, চিলি, বোতসোয়ানা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু এলাকা থেকে এই গ্রহণ প্রত্যক্ষ করেছেন মানুষজন।
পরের দিন, অর্থাৎ ১৮ই ফেব্রুয়ারি একফালি চাঁদের দেখা মিলেছে বুধের সন্নিকটে। দুরবীণে চোখ লাগিয়ে, বুধের আশেপাশে শনি ও শুক্রের সাক্ষাৎ মিলেছে বলে দাবি করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত ১৯শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বুধ গ্রহ তার কক্ষপথে সূর্য থেকে সর্বোচ্চ কৌণিক দূরত্বে বা ‘সর্বোচ্চ পূর্ব elongation’-এ (greatest eastern elongation) অবস্থান করায় পৃথিবী থেকে একে সবচেয়ে উজ্জ্বল, স্পষ্ট ।
এমনিতে সারাবছর, ছোটো আকারের এই গ্রহটি সূর্যের এতকাছে থাকে যে, সৌর কিরণের ঠেলায় একে দেখা দুষ্কর হয়ে পড়ে। সেজন্য মহাকাশপ্রেমীদের কাছে ঐদিন ছিল মোক্ষম সুযোগ; সূর্যাস্তের পরেই পশ্চিম দিগন্তে ধরা দেয় ঝকঝকে এই প্রতিবেশী গ্রহটি।
আর ফেব্রুয়ারির শেষদিকে এক রোমাঞ্চকর দৃশ্যের সাক্ষী থাকতে চলেছি আমরা। বুধ, শুক্র, নেপচুন, শনি, ইউরেনাস এবং বৃহস্পতি অর্থাৎ ছয়টি গ্রহ একই লাইনে অবস্থান করবে। এ যেন একমহাজাগতিক প্যারেড! এই রকম গ্রহের মিছিল সচরাচর নজরে পড়েনা। কেন দেখা যায় এইরকম গ্রহের কুচকাওয়াজ?
গ্রহগুলি, সাধারণত সূর্যকে কেন্দ্র করে একই সমতলে ঘুরপাক খায়, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন ক্রান্তীয় সমতল বা এক্লিপ্টিক প্লেন। তাদের গতিবেগ, অতিক্রান্ত দূরত্ব ভিন্ন ভিন্ন হলেও যাত্রাপথের কোনো একসময় তাদের অবস্থানকে পৃথিবী দেখলে মনে হয় গ্রহগুলি যেনো একই লাইনে সারিবদ্ধ ভাবে প্যারেড করছে। হয়তো তাঁরা নিজেদের থেকে লক্ষ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে, কিন্তু আমাদের কাছে কুচকাওয়াজ বলেই মনে হবে। গতবছর ২৭শে ফেব্রুয়ারি বুধ সহমোট সাতটি গ্রহের প্যারেড লক্ষ্য করা গেছে। এই বিরল দৃশ্য ২০৪০ এর আগে আর দেখা যাবেনা।
এখন কথা হচ্ছে, খালি চোখে কি আমরা এই প্যারেড দেখতে পাবো? বুধ, শুক্র, মঙ্গল এবং বৃহস্পতি, এই চারটি গ্রহকে খালি চোখে দেখাযাবে; অপরদিকে, ইউরেনাস ও নেপচুন সৌরজগতের দূরবর্তী অঞ্চলে প্রদক্ষিণ করায়, এদের দর্শনের জন্য বাইনোকুলারের দরকার হতেপারে। তবে, বুধ দিগন্তের কাছাকাছি অবস্থান করায়, তাকে পর্যবেক্ষণ করা মাঝে মাঝেই শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। এমনিতে বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী, দিগন্তের ১০ ডিগ্রি উপরে কোনো গ্রহ থাকলে, কোনোরকম দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়াই দৃশ্যমান হওয়ার কথা। অতএব আকাশ পরিষ্কার থাকলে, চলমান ফেব্রুয়ারি মাসের শেষাংশ মহাকাশপ্রেমীদের জন্য যে রোমাঞ্চকর হতে যাচ্ছে, সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


