নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগ কাঠামোয় নারী ও পুরুষের কিছু পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়।
৮ থেকে ১০০ বছর বয়সী মানুষের মস্তিষ্কের ইমেজিং ডেটা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, শৈশবে এই পার্থক্য প্রায় নেই। বয়ঃসন্ধিতে হঠাৎ করে পার্থক্য বাড়ে। প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে কিছু পার্থক্য ধীরে ধীরে আরও বৃদ্ধি পায়। গবেষণাটি bioRxiv–এ প্রিপ্রিন্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এখনো পিয়ার রিভিউড হয়নি।
গবেষকেরা মনে করেন, এই ফলাফল থেকে বোঝা যেতে পারে কেন কিছু মানসিক রোগে নারী ও পুরুষের ঝুঁকি ভিন্ন হয়। উদাহরণ হিসেবে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা প্রায় দ্বিগুণ দেখা যায়। আবার মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের শনাক্তকরণ প্রায় চার গুণ বেশি।
নিউইয়র্কের Weill Cornell Medicine–এর কম্পিউটেশনাল নিউরোইমেজার অ্যামি কুচেয়েস্কি বলেন, মানুষের পুরো জীবনকাল জুড়ে মস্তিষ্কের নেটওয়ার্কে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য কীভাবে বদলায়, তা তুলনা করার ক্ষেত্রে এটি প্রথম গবেষণা।
তবে কিছু স্নায়ুবিজ্ঞানী এই ব্যাখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, এখানে পাওয়া পার্থক্য কেবল জৈবিক লিঙ্গের কারণে নয়। সামাজিক ভূমিকা ও লিঙ্গভিত্তিক আচরণও বড় ভূমিকা রাখে, যা গবেষণাটিতে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্ক নানা বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ। কিছু বৈশিষ্ট্য পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, কিছু নারীদের মধ্যে।
কুচেয়েস্কি ও তাঁর সহকর্মীরা ১,২৮৬ জন মানুষের ফাংশনাল এমআরআই ডেটা বিশ্লেষণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেক পুরুষ, অর্ধেক নারী। স্ক্যান থেকে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট বয়সে মস্তিষ্কের অবস্থা বোঝা গেছে। তবে একই ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় ধরে অনুসরণ করা হয়নি। অংশগ্রহণকারীদের জন্মের সময় নির্ধারিত লিঙ্গ অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা হয়।
তাঁরা ‘Krakencoder’ নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক টুল ব্যবহার করেন। এই টুল মস্তিষ্কের কাঠামোগত সংযোগ, অর্থাৎ স্নায়ুতন্তুর ভৌত সংযোগ, এবং কার্যকরী সংযোগ, অর্থাৎ বিভিন্ন অঞ্চলের সমন্বিত কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, কাঠামোগত ও কার্যকরী উভয় সংযোগেই লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য রয়েছে। কার্যকরী পার্থক্য বেশি দেখা যায় উচ্চস্তরের নেটওয়ার্কে, যা মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত। কাঠামোগত পার্থক্য মধ্যবয়সে সর্বোচ্চ হয় এবং বয়সের সঙ্গে আরও বাড়ে, বিশেষ করে নিচুস্তরের নেটওয়ার্কে, যা ইন্দ্রিয় থেকে আসা তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে।
নারীদের ক্ষেত্রে ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’-এর বিভিন্ন অংশের মধ্যে কার্যকরী সংযোগ সাধারণত বেশি শক্তিশালী দেখা যায়। এই নেটওয়ার্ক উচ্চস্তরের মানসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে, বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষদের ক্ষেত্রে সেরিবেলামের দুই অর্ধের মধ্যে কার্যকরী ও কাঠামোগত সংযোগ আরও শক্তিশালী হয়। সেরিবেলাম মূলত চলন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কগনিটিভ নিউরোসায়েন্টিস্ট ইউমনাহ খান বলেন, মস্তিষ্কের সংযোগে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্যের সময়রেখা শরীরের লিঙ্গ-হরমোনের পরিবর্তনের সময়রেখার সঙ্গে মিলে যায়। তিনি জানান, ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত সংযোগ বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। নারীদের মধ্যে এই সংযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী লিস এলিয়ট বলেন, এই পার্থক্য জৈবিক লিঙ্গের ফল নাকি সামাজিক জীবনের প্রভাব, তা আলাদা করা কঠিন। তাঁর মতে, নারীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ বেশি হওয়ার পেছনে আর্থসামাজিক চাপ, যৌন সহিংসতা ও দেহকেন্দ্রিক অপমান বড় ভূমিকা রাখে, যা মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলে।
ডাফনা জোয়েল বলেন, শিক্ষার সুযোগ, পারিবারিক আচরণ, শারীরিক সক্রিয়তা এবং সামাজিক চাপের পার্থক্য থেকেও এই ফলাফল তৈরি হতে পারে।
তবে কুচেয়েস্কি বলেন, পাওয়া পার্থক্য উপেক্ষা করা কঠিন। একক কোনো মাপজোখে পার্থক্য ছোট মনে হলেও একাধিক সূচক একত্র করলে নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ক আলাদা করে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। ডেটা মানুষের জীবনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের ছবি তুলে ধরে। এর পেছনে জিনগত, হরমোনজনিত বা পরিবেশগত কারণ কাজ করতে পারে।
ভবিষ্যৎ গবেষণায় একই ব্যক্তির মস্তিষ্ক দীর্ঘ সময় ধরে অনুসরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। জীবন ইতিহাসসহ নানা উপাদান যুক্ত করে এই প্রভাবগুলো আলাদা করে বোঝার চেষ্টা করবেন গবেষকেরা। লক্ষ্য একটাই, ব্যক্তিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার পথ আরও স্পষ্ট করা।
———
The progression of sex differences in brain networks across the lifespan. bioRxiv (2026)
DOI: 10.64898/2026.01.30.702608
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


