বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের সময় পুড়ে যাওয়া একটি SpaceX রকেট ইউরোপজুড়ে বাষ্পীভূত ধাতুর এক বিশাল মেঘ ছড়িয়ে দেয়। এই ধরনের দূষণ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে, কারণ মহাকাশযান ও স্যাটেলাইটের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে Falcon 9 রকেটের একটি আপার স্টেজ ইঞ্জিন বিকলের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারায়। পরিকল্পনা ছিল প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে পুনঃব্যবহার করা। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেটি উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ে। ইউরোপজুড়ে মানুষ আকাশে জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ ছুটে যেতে দেখে। পোল্যান্ডে একটি গুদামের পেছনে কিছু টুকরো আছড়ে পড়ে।
এই খবর দেখেই জার্মানির Leibniz Institute of Atmospheric Physics-এর বিজ্ঞানী Robin Wing ও তাঁর দল বায়ুমণ্ডলীয় লাইডার (LIght Detection And Ranging) যন্ত্র চালু করেন। এই যন্ত্র বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হয়। ২০ ঘণ্টা পর যন্ত্রটি ওপরের বায়ুমণ্ডলে লিথিয়ামের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ গুণ বেশি শনাক্ত করে। লিথিয়াম রকেটের কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই ধাতব মেঘ ধীরে ধীরে তাদের পর্যবেক্ষণ এলাকার ওপর দিয়ে সরে যাচ্ছিল।
বায়ুমণ্ডলীয় মডেলিং দেখায়, এই মেঘটি রকেট পুনঃপ্রবেশের স্থান থেকে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ভেসে যেতে পারে। গবেষণাটি প্রথমবারের মতো কোনো নির্দিষ্ট মহাকাশযানের পুনঃপ্রবেশের সঙ্গে বায়ুমন্ডলের উচ্চস্তরের বায়ুদূষণের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করল।
Wing জানান, ক্ষুদ্র ধাতব কণা ওজোন স্তর ধ্বংসের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এই কণা স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার ও মেসোস্ফিয়ারে মেঘ তৈরি করতে পারে। সূর্যালোক বায়ুমণ্ডল দিয়ে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও বদলে যেতে পারে। এই বিষয়গুলো নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি।
বাণিজ্যিক মহাকাশ উৎক্ষেপণ বাড়ার সঙ্গে এই উদ্বেগও বাড়ছে। SpaceX-এর Starlink ও Amazon-এর Leo-এর মতো প্রতিষ্ঠান বিশাল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। বর্তমানে কক্ষপথে প্রায় ১৪,৫০০ স্যাটেলাইট ঘুরছে। গত মাসে SpaceX কক্ষপথে আরও ১০ লাখ স্যাটেলাইট পাঠানোর আবেদন করেছে। লক্ষ্য, কক্ষপথে ডেটা সেন্টার গড়ে তুলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালানো।
মহাকাশে সংঘর্ষজনিত ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ চক্র ঠেকাতে স্যাটেলাইটের মেয়াদ শেষে সেগুলোকে বায়ুমণ্ডলে নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশ বছরে এই ধাতব কণার পরিমাণ ৫০ গুণ বাড়তে পারে। এই পরিমাণ বর্তমানে উল্কাপিণ্ড থেকে আসা মোট ভরের ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
Purdue University-এর বিজ্ঞানী Daniel Cziczo বলেন, অনেকের ধারণা মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ পুড়ে সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়। বাস্তবে ধাতব কণা থেকে যায় এবং বায়ুমণ্ডলে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব কতটা ভয়াবহ, সেটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
Falcon 9-এর ধ্বংসাবশেষে প্রায় ৩০ কেজি লিথিয়াম ছিল। তবে রকেটের কাঠামোয় ব্যবহৃত সংকর ধাতুর কারণে এতে আরও অনেক বেশি অ্যালুমিনিয়াম ছিল। বাষ্পীভূত অ্যালুমিনিয়াম অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড কণা তৈরি করে। এই কণার ওপর ক্লোরিন যৌগ সহজে ভেঙে যায়। ফলে মুক্ত ক্লোরিন র্যাডিক্যাল ওজোন ভেঙে দেয়।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, মহাকাশযানের পুড়ে যাওয়ার ফলে প্রতিবছর প্রায় ১০০০ টন অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে ছড়াচ্ছে। এই প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে দক্ষিণ গোলার্ধের ওজোন গহ্বর আবার বড় হতে পারে। এই গহ্বর কমছিল, কারণ বহু দেশ ওজোন-ধ্বংসকারী গ্যাস ব্যবহার বন্ধ করেছে। ওজোন স্তর কমলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি বেশি প্রবেশ করবে, যা ত্বক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
University College London-এর Eloise Marais বলেন, ওপরের বায়ুমণ্ডলে ধাতব কণার প্রভাব প্রাকৃতিক উৎসের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ ওজোন স্তর রক্ষার অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এই ধাতব অক্সাইড কণা উচ্চ ট্রপোস্ফিয়ারে সিরাস মেঘ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এই মেঘ তাপ আটকে রাখে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরও বাড়তে পারে। এই প্রভাব গ্রিনহাউস গ্যাসের তুলনায় ছোট হলেও দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে সিরাস মেঘে মহাকাশযান থেকে আসা কণার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। Cziczo বলেন, এই উপাদানগুলো বায়ুমণ্ডলের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে কি না এবং কতটা ভয়াবহ, সেটি নির্ণয় এখন বিজ্ঞানীদের দায়িত্ব।
সম্ভাব্য সমাধানের মধ্যে কাঠের মতো বিকল্প উপাদানে স্যাটেলাইট তৈরি বা উচ্চ কক্ষপথে স্থায়ীভাবে সরিয়ে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। Wing বলেন, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের এই দ্রুত বিস্তার নিয়ে আগে ভালোভাবে ভাবা প্রয়োজন। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল কী হবে, সেটি এখনও অজানা।
———
Measurement of a lithium plume from the uncontrolled re-entry of a Falcon 9 rocket. Communications Earth & Environment (2026).
DOI: 10.1038/s43247-025-03154-8
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


