কখনো কি ভেবে দেখেছেন মঙ্গল গ্রহ কি কোনোদিন পৃথিবীর মতো ছিল? সেখানে কি কখনও টানা বৃষ্টি হতো, নদী বইত অথবা কাদামাটি জমত? এমন প্রশ্ন অনেকদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের মনে ঘুরছে। আর এখন মনে হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তরের কিছুটা হয়তো সত্যিই পাওয়া গেছে। মঙ্গল নিয়ে কাজ করা মার্স ২০২০ মিশনের রোভার পার্সিভিয়ারেন্স সম্প্রতি এমন কিছু পাথর খুঁজে পেয়েছে যা দেখে বিজ্ঞানীরা বেশ আশাবাদী। তারা বলছেন, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে মঙ্গলে এক সময় খুব ভেজা, বৃষ্টিপূর্ণ পরিবেশ ছিল। রোভারটি জেজেরো ক্রেটার এলাকায় ঘুরতে গিয়ে অ্যালুমিনিয়াম-সমৃদ্ধ এক ধরনের “ফ্লোট” পাথর খুঁজে পায়। ফ্লোট মানে হলো পাথরগুলো তাদের আসল জায়গা থেকে ভেঙে বা সরে এসে অন্য জায়গায় পড়ে আছে। এসব পাথরের মধ্যে কিছুতে কাওলিনাইট নামে এক ধরনের কাদামাটির খনিজও পাওয়া গেছে, যা সাধারণত পানির সংস্পর্শে তৈরি হয়। তাই বোঝা যায়, এখানে অনেক দিন ধরে তরল পানি ছিল।
রোভারটি জেজেরো ক্রেটারের মাটির ওপর আর পলির এলাকায় চলতে চলতে হাজার হাজার হালকা রঙের ছোট ছোট পাথরের টুকরো দেখে। এগুলো আগের কোনো শিলাস্তরের সঙ্গে মিলছে না। এসব পাথরে অ্যালুমিনিয়ামের পরিমাণ অনেক বেশি, প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত। কিছু পাথরে কাওলিনাইট বা হ্যালয়সাইটের মতো খনিজের চিহ্ন পাওয়া গেছে। লৌহের পরিমাণ খুব কম, মোট এক শতাংশেরও কম। আবার কিছু ক্ষেত্রে টাইটানিয়াম বা নিকেলের পরিমাণ বেশি। মজার বিষয় হলো, কিছু টুকরোতে ৯০ শতাংশের বেশি সিলিকা রয়েছে। এতে বোঝা যায়, সেখানে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের জলীয় প্রক্রিয়া কাজ করেছিল।
যেহেতু এই পাথরগুলো তাদের আসল জায়গায় নেই, তাই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অনুরূপ পাথরের সঙ্গে তুলনা করে বুঝতে চেয়েছেন এগুলোর আসল গল্প কী। এ জন্য তারা রোভারের SuperCam এবং Mastcam-Z যন্ত্রের তথ্য ব্যবহার করেছেন। তারা পৃথিবীর দুই ধরনের জায়গার সঙ্গে তুলনা করেছেন হাইড্রোথার্মাল জমা এবং অনেক বৃষ্টিতে তৈরি পুরোনো মাটি বা প্যালিওসোল। তুলনা করে দেখা গেছে, মঙ্গলের পাথরগুলো পৃথিবীর সেইসব পুরোনো মাটির সঙ্গে বেশি মিল রাখে যেগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ভারী বৃষ্টির কারণে পরিবর্তিত হয়েছে।
এগুলোর মধ্যে অ্যালুমিনিয়াম আর টাইটানিয়াম বেশি, কিন্তু ম্যাগনেশিয়াম আর লৌহ কম, যা পৃথিবীর বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া মাটির স্তরের মতো। “চিগনিক” নামে একটি নমুনা প্রায় ২.২ বিলিয়ন বছর পুরোনো এক প্যালিওসোলের “প্যালিড জোন”-এর সঙ্গে বেশ মিল দেখায়। টাইটানিয়ামের গড় পরিমাণ প্রায় ০.৯ শতাংশ, যা সাধারণত মাটিজনিত আবহাওয়াজনিত পরিবর্তনের লক্ষণ। কারণ অন্য উপাদান ধুয়ে গেলেও টাইটানিয়াম সহজে সরে যায় না। হাইড্রোথার্মাল পরিবেশে সাধারণত এমন উচ্চ টাইটানিয়াম দেখা যায় না।
পাথরগুলো কোথা থেকে এসেছে সেটাও বিজ্ঞানীরা খুঁজে দেখেছেন। তারা CRISM যন্ত্রের কক্ষপথের তথ্য ব্যবহার করে সম্ভাব্য উৎস খুঁজেছেন। জেজেরো ক্রেটারের কিনারায় হালকা রঙের ফাটলযুক্ত শিলায় কাওলিন-জাতীয় খনিজের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যেগুলো রোভারের পথ থেকে খুব বেশি দূরে নয়, মাত্র এক-দুই কিলোমিটার দূরে। এছাড়া ক্রেটারের পশ্চিম দিকে নেরেতভা ভ্যালিস চ্যানেলের শেষ দিকেও একই ধরনের শিলার বড় অংশ দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে এই আবিষ্কার আমাদের জানায়, মঙ্গলের কিছু অংশ এক সময় পৃথিবীর মতোই অনেক বৃষ্টি আর সক্রিয় পানির প্রভাবের মধ্যে ছিল। সেখানে হয়তো দীর্ঘ সময় ধরে পানি ছিল, জলস্তর উঠানামা করত, আর পরিবেশ ছিল তুলনামূলকভাবে আর্দ্র। এই অ্যালুমিনিয়াম-সমৃদ্ধ পাথরগুলো তাই মঙ্গলের সবচেয়ে ভেজা সময়গুলোর সাক্ষী হতে পারে। আর এর মাধ্যমে আমরা মঙ্গলের অতীত জলবায়ু আর সেখানে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে পারি।
ভাবতে অবাক লাগে আজ যে মঙ্গলকে আমরা শুকনো, ধুলোময় আর ঠান্ডা এক গ্রহ হিসেবে দেখি, সেই গ্রহই কি একসময় বৃষ্টিভেজা, কাদামাটিতে ভরা আর সম্ভবত প্রাণের উপযোগী ছিল? যদি পাথর এত কিছু বলে দিতে পারে, তাহলে মঙ্গলের মাটির নিচে এখনো কত অজানা গল্প লুকিয়ে আছে তা কি আমরা কল্পনাও করতে পারি?
———
Alteration history of aluminum-rich rocks at Jezero crater, Mars. Commun Earth Environ (2025).
DOI: 10.1038/s43247-025-02856-3
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


