মাইক্রোসফটের গবেষকেরা এমন একটি ডেটা সংরক্ষণ পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যা অন্তত ১০,০০০ বছর পর্যন্ত রিডেবল থাকবে, এবং সম্ভাব্যভাবে তার চেয়েও অনেক বেশি সময় টিকে থাকবে।
ডিজিটাল যুগে ডেটা সংরক্ষণের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু বর্তমানে ব্যবহৃত ম্যাগনেটিক টেপ ও হার্ড ড্রাইভ দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত নয়, কারণ প্রায় দশ বছরের মধ্যেই এগুলো ক্ষয় হতে শুরু করে। এই কাচভিত্তিক বিকল্পকে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির জৈবপ্রকৌশলী Massachusetts Institute of Technology-এর মার্ক বাথে একটি “চমৎকার” সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, নীতিগতভাবে এটি গুরুত্বপূর্ণ ডেটার ব্যাকআপের জন্য প্রায় স্থায়ী আর্কাইভাল সংরক্ষণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
মাইক্রোসফটের দল উচ্চশক্তির লেজার ব্যবহার করে বোরোসিলিকেট কাচের ত্রিমাত্রিক একটি ব্লকের ভেতর ক্ষুদ্র বিকৃতি তৈরি করেছে। এই কাচই সাধারণত ওভেনের পাত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। প্রতিটি ক্ষুদ্র ডিফরমেশন মধ্যে ডেটা এনকোড করা থাকে, যা মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে পড়া যায়।
১২ সেন্টিমিটার চওড়া ও ২ মিলিমিটার পুরু একটি কাচের পাত ৪.৮ টেরাবাইট ডেটা ধারণ করতে পারে। গবেষকেরা ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ Nature জার্নালে প্রকাশিত আর্টিকেলে দেখিয়েছেন, এটি প্রায় ২০ লাখ মুদ্রিত বইয়ের সমান তথ্য সংরক্ষণ করতে সক্ষম।
হার্ড ড্রাইভে ফাইল খোলার তুলনায় এই কাচে ডেটা লেখা ও পড়া অনেক বেশি জটিল। কিন্তু তথ্যের নিরাপত্তা অনেক বেশি। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে অবস্থিত Microsoft Research-এর কম্পিউটার বিজ্ঞানী রিচার্ড ব্ল্যাক, যিনি এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছেন, জানান পরীক্ষায় দেখা গেছে ২৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়ও ডেটা ১০,০০০ বছর টিকে থাকতে পারে। ঘরের তাপমাত্রায় এটি দশগুণ বা শতগুণ বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। এই প্রকল্পের নাম Project Silica।
যদিও কাচে ডেটা লেখা ও পড়ার জন্য বিশেষায়িত হার্ডওয়্যার প্রয়োজন, বেইজিংয়ের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গণনামূলক সিনথেটিক জীববিজ্ঞানী লং চিয়ান বলেন, এই গবেষণা দেখিয়েছে কাচভিত্তিক সংরক্ষণ এখন আর কেবল উপাদানভিত্তিক পরীক্ষা নয়, বরং একটি ব্যবহারযোগ্য আর্কাইভাল ব্যবস্থা।
যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অপটোইলেকট্রনিক্স গবেষক পিটার কাজানস্কি বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা দেখানোর মাধ্যমে গবেষকেরা প্রমাণ করেছেন এই প্রযুক্তি ডেটা সেন্টার শিল্পে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম। কাজানস্কি এর আগে কাচভিত্তিক সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে মাইক্রোসফটের সঙ্গে কাজ করেছেন।
ম্যাগনেটিক টেপ ও হার্ড ড্রাইভ ক্ষুদ্র ধাতব স্তরের অংশে ভিন্ন ভিন্ন চৌম্বক বিন্যাস তৈরি করে ১ ও ০ প্রকাশ করে। কিন্তু এই ক্ষুদ্র চুম্বক সহজেই চৌম্বকত্ব হারায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য নিয়মিত তথ্য কপি ও পুনর্লিখন প্রয়োজন হয়। ব্ল্যাক বলেন, কাচের ক্ষেত্রে একবার লেখা হয়ে গেলে সেটি অপরিবর্তনীয়। ডিভাইসটির জন্য তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও প্রয়োজন হয় না।
কাজানস্কি ও তার সহকর্মীরা লেজার রাইটিং প্রযুক্তির মৌলিক পদার্থবিদ্যা উন্নয়ন করেন এবং ফিউজড সিলিকা কাচ ব্যবহার করে সবচেয়ে টেকসই ডিজিটাল সংরক্ষণ মাধ্যমে গিনেস বিশ্বরেকর্ডও অর্জন করেন। ২০১৭ সালে মাইক্রোসফট তাদের কাজের ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন শুরু করে। যদিও ফিউজড সিলিকা বেশি টেকসই ও উচ্চ ঘনত্বে ডেটা ধারণে সক্ষম, তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় মাইক্রোসফট তুলনামূলক সস্তা বোরোসিলিকেট কাচ ব্যবহার করেছে, যা তৈরি করাও সহজ। নতুন পদ্ধতিতে ডেটা দ্রুত লেখা যায় এবং আগের সংস্করণের তুলনায় নির্ভরযোগ্যভাবে ডিকোড করা যায়।
তথ্য এনকোড করতে গবেষকেরা অতি ক্ষণস্থায়ী, কয়েক কোয়াড্রিলিয়ন ভাগের এক সেকেন্ড লং ফায়ারিং লেজার পালস ব্যবহার করেছেন। নির্দিষ্ট শক্তি দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে কাচে আঘাত করলে সেখানে প্লাজমা সৃষ্ট ন্যানো বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কাচের ডিফরমেশন হয় এবং আলোর গতিপথ বদলে যায়। এই ক্ষুদ্র ডিফরমেশনগুলোর মাধ্যমেই তথ্য লেখা হয়। পরে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে আলো প্রতিটি বিন্দুর মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় আচরণের পরিবর্তন শনাক্ত করে তথ্য পড়া হয়।
একটির ওপর আরেকটি সাজানো প্রায় ৩০০ স্তর থেকেও ডেটা উদ্ধার করা সম্ভব। পাশের স্তরের ডিফরমেশন থেকে সৃষ্ট নয়েজ দূর করতে একটি মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়।
গবেষকেরা বয়সজনীত পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন তাপমাত্রায় সময়ের সঙ্গে ডেটা কতটা পাঠযোগ্য থাকে তা নির্ধারণ করেন এবং সেখান থেকে স্থায়িত্বের হিসাব করেন।
তবে এই হিসাব রাসায়নিক ক্ষয় বা কাচ ভেঙে যাওয়ার মতো সম্ভাব্য অন্যান্য অবক্ষয় কারণ বিবেচনায় নেয় না। এই কাচভিত্তিক ব্যবস্থা রিরাইটেবল নয় এবং নিয়মিত ব্যবহৃত ডেটা সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত নয় বলে লং চিয়ান উল্লেখ করেন। তার গবেষণায় ডেটা সংরক্ষণে ডিএনএ ব্যবহারের বিষয়ও রয়েছে। ডিএনএ অত্যন্ত উচ্চ ঘনত্বের বিকল্প হলেও তথ্য লেখা ও পড়ার জন্য জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন হয়, ফলে গতি ধীর।
কাচে ডেটা লেখা ও পড়ার ব্যয় বেশি হওয়ায় দৈনন্দিন তথ্য সংরক্ষণে এটি ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে দীর্ঘমেয়াদি আর্কাইভ, যেখানে দশক বা শতাব্দী ধরে ডেটা সংরক্ষণ দরকার, সেখানে এটি উপযুক্ত। যেমন বৈজ্ঞানিক তথ্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নথি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংক্রান্ত সংরক্ষণাগার। উদাহরণ হিসেবে মাইক্রোসফট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করছে একটি কাচের প্লেট তৈরিতে, যেখানে পৃথিবীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। এই উদ্যোগ অনুপ্রাণিত হয়েছে নাসার গোল্ডেন রেকর্ড থেকে, যা ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণ করা ভয়েজার মহাকাশযানে স্থাপন করা হয়েছিল।
একবার ডেটা লেখা হয়ে গেলে তা ধরে রাখতে অতিরিক্ত খরচ কম। ফলে গবেষণা প্রকল্প শেষ হওয়ার পর যেসব ডেটা রক্ষণাবেক্ষণের বাজেট থাকে না, সেগুলো সংরক্ষণে এই পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে বলে ব্ল্যাক মনে করেন।
ভবিষ্যতে এই প্রকল্প কোন পথে এগোবে তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। ব্ল্যাক বলেন, পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে ব্যবসায়িক অগ্রাধিকারের ওপর।
———
Laser writing in glass for dense, fast and efficient archival data storage. Nature (2026).
DOI: 10.1038/s41586-025-10042-w
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


