পোকামাকড়ের কোষের ভেতরে বসবাস করা মিথোজীবী (symbiotic) ব্যাকটেরিয়াগুলোর জিনোম আকারে এত ছোট যে জীবজগতের মধ্যে এর চেয়ে ছোট জিনোম আগে দেখা যায়নি। নতুন গবেষণা কোষের অঙ্গাণু যেমন মাইটোকন্ড্রিয়া এবং প্রকৃতির সবচেয়ে সরল জীবাণুর মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখাকে আরও অস্পষ্ট করে দিয়েছে।
পোল্যান্ডের ক্রাকোভে অবস্থিত জাগিয়েলোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পিওতর লুকাসিক বলেন, “এই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে একীভূত মিথোজীবী জীবটি কোথায় শেষ হয় এবং কোথা থেকে একটি অঙ্গাণুর শুরু, তা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন। দুইয়ের মধ্যকার সীমারেখা বেশ ঝাপসা।”
প্ল্যান্টহপার নামে পরিচিত এক ধরনের পোকা সম্পূর্ণভাবে উদ্ভিদের রস খেয়ে বেঁচে থাকে। তাদের খাদ্যতালিকায় পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হয় মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে। কোটি কোটি বছর আগে শুরু হওয়া এই সম্পর্কের ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলো ধীরে ধীরে এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যে তারা প্ল্যান্টহপারের দেহের বিশেষ কোষের ভেতরে বসবাস করে। পোকাটির উদর অংশে থাকা এসব কোষে তারা এমন পুষ্টি উপাদান তৈরি করে যা কেবলমাত্র চিনিযুক্ত উদ্ভিদরস থেকে পাওয়া যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ব্যাকটেরিয়া তাদের হোস্টের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং তাদের জিনগত উপকরণের বড় অংশ হারিয়ে ফেলেছে। ফলে তাদের জিনোম আকারে পূর্বপুরুষদের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গেছে।
লুকাসিক এবং তাঁর সহকর্মীরা এই ব্যাকটেরিয়া ও পোকামাকড়ের পারস্পরিক সম্পর্কের বিবর্তন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। একই সঙ্গে তারা জানতে চেয়েছিলেন ব্যাকটেরিয়ার জিনোম আকারে কতটা ছোট হতে পারে। এ জন্য গবেষক দল ১৯টি প্ল্যান্টহপার পরিবারের মোট ১৪৯টি পৃথক পোকা সংগ্রহ করেন এবং তাদের উদর অংশের টিস্যু থেকে ডিএনএ আলাদা করেন। এরপর সেই ডিএনএ বিশ্লেষণ ও সিকোয়েন্স করে সহবাসী ব্যাকটেরিয়া Vidania এবং Sulcia এর জিনোম পুনর্গঠন করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর জিনোম অত্যন্ত ছোট। জিনোমের দৈর্ঘ্য সাধারণত বেস পেয়ার দিয়ে মাপা হয়, যা জিনগত কোডের যুগল “অক্ষর” দিয়ে গঠিত। এখানে পাওয়া ব্যাকটেরিয়াগুলোর জিনোমের দৈর্ঘ্য ছিল ১ লাখ ৮১ হাজার বেস পেয়ার এরও কম। তুলনার জন্য বলা যায়, মানুষের জিনোমে বেস পেয়ার রয়েছে কয়েক বিলিয়ন।
Vidania ব্যাকটেরিয়ার কিছু জিনোম মাত্র ৫০ হাজার বেস পেয়ার দীর্ঘ, যা এখন পর্যন্ত কোনো জীবিত সত্তার মধ্যে সবচেয়ে ছোট জিনোম হিসেবে ধরা হচ্ছে। এর আগে সবচেয়ে ছোট জিনোম পাওয়া গিয়েছিল Nasuia নামের একটি মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়ায়, যা প্ল্যান্টহপারের আত্মীয় লিফহপার পোকাদের মধ্যে বাস করে। সেই জিনোমের আকার ছিল সামান্য বেশি, প্রায় ১ লাখ বেস পেয়ার।
৫০ হাজার বেস পেয়ার দৈর্ঘ্যের Vidania জিনোমের আকার অনেক ভাইরাসের জিনোমের কাছাকাছি। ভাইরাসকে সাধারণত জীবিত সত্তা হিসেবে ধরা হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোভিড-১৯ রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসের জিনোম প্রায় ৩০ হাজার বেস পেয়ার দীর্ঘ। Vidania ব্যাকটেরিয়ার কিছু প্রজাতিতে মাত্র প্রায় ৬০টি প্রোটিন তৈরি করার জিন পাওয়া গেছে, যা এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে কম সংখ্যাগুলোর মধ্যে একটি।
ক্রেডিট: Anna Michalik et al.
গবেষকদের মতে, এই ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রায় ২৬ কোটি ৩০ লাখ বছর ধরে তাদের পোকা গোস্টের সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে। দুটি ভিন্ন প্ল্যান্টহপার গোষ্ঠীর ভেতরে তারা স্বাধীনভাবে এত ছোট জিনোমে বিবর্তিত হয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর প্রধান কাজগুলোর একটি হলো ফেনাইলঅ্যালানিন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করা। এই রাসায়নিক পদার্থ পোকামাকড়ের শক্ত বাইরের আবরণ, অর্থাৎ এক্সোস্কেলেটন গঠন ও শক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লুকাসিক এবং তাঁর দল মনে করেন, যখন পোকাগুলো নতুন ধরনের খাদ্য খেতে শুরু করে এবং সেই খাদ্যে আগে ব্যাকটেরিয়া যে পুষ্টি সরবরাহ করত তা পাওয়া যায়, তখন ব্যাকটেরিয়ার অনেক জিন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। আবার কখনও নতুন জীবাণু এসে সেই কাজগুলো গ্রহণ করলে পুরোনো ব্যাকটেরিয়াগুলোও তাদের অনেক জিন হারাতে পারে।
এই অত্যন্ত ছোট জিনোমবিশিষ্ট ব্যাকটেরিয়াগুলো অনেক দিক থেকে মাইটোকন্ড্রিয়া এবং ক্লোরোপ্লাস্টের সঙ্গে মিল রাখে। মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্ট হলো প্রাণী ও উদ্ভিদের কোষের ভেতরে থাকা শক্তি উৎপাদনকারী অঙ্গাণু, যাদের উৎপত্তি বহু প্রাচীন ব্যাকটেরিয়া থেকে। একইভাবে এই মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়াগুলোও হোস্ট কোষের ভেতরে বসবাস করে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, অস্টিনের গবেষক ন্যান্সি মোরান, যিনি এই গবেষণায় অংশ নেননি, বলেন, “‘অঙ্গাণু’ মূলত একটি শব্দ মাত্র। তাই কেউ যদি এগুলোকে অঙ্গাণু হিসেবে ধরতে চান, আমার তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু তবুও মাইটোকন্ড্রিয়া বা ক্লোরোপ্লাস্টের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়ে গেছে।”
মাইটোকন্ড্রিয়া অনেক বেশি প্রাচীন। তাদের উৎপত্তি প্রায় ১৫০ কোটি বছর আগে বা তারও আগে। তাদের জিনোম আরও ছোট, প্রায় ১৫ হাজার বেস পেয়ার।
মোরান বলেন, “এই মিথোজীবী জীবগুলো কেবল হোস্টের বিশেষ কিছু কোষে বাস করে। কিন্তু মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের মতো অঙ্গাণু প্রায় সব কোষেই থাকে।”
লুকাসিক মনে করেন, এই ব্যাকটেরিয়া এবং মাইটোকন্ড্রিয়াকে আসলে বিবর্তনের একটি নির্ভরতার ধারাবাহিকতার ভিন্ন ভিন্ন স্তরে থাকা সত্তা হিসেবে দেখা যায়। তাঁর ধারণা, ভবিষ্যতে এর থেকেও ছোট জিনোমবিশিষ্ট মিথোজীবী জীবের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
———
Convergent extreme reductive evolution in ancient planthopper symbioses. Nat Commun (2026).
DOI: 10.1038/s41467-026-69238-x
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



