মস্তিষ্কের এক ধরনের নিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে যা বড় বড় শিরার একটি নেটওয়ার্ক এবং খুলি ঘেঁষা একটি ঝিল্লির ভেতরে বসানো। আগে ধারণা করা হতো এগুলো নিষ্ক্রিয় নালির মতো। নতুন গবেষণা জানাচ্ছে, বাস্তবে এগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করে।
নাজুক মস্তিষ্ককে শারীরিক আঘাত ও আক্রমণকারী জীবাণু থেকে রক্ষা করে তিন স্তরের ঝিল্লি, যাকে সম্মিলিতভাবে মেনিনজেস বলা হয়। এই স্তরগুলোর সবচেয়ে বাইরের অংশে থাকে বড় শিরা, যেগুলোকে বলা হয় ভেনাস সাইনাস। এগুলো মস্তিষ্ক ও খুলির ভেতরের তরল নিষ্কাশনে সাহায্য করে। কিন্তু এগুলোর সম্পূর্ণ কাজ এতদিন পরিষ্কার ছিল না।
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ Nature জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ইঁদুর ও মানুষের শরীরে ভেনাস সাইনাসের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা দেখেছেন, এই শিরাগুলো রক্ত ও সেরিব্রোস্পাইনাল তরল পাম্প করে। পাশাপাশি এগুলোর কোষ নিয়মিত নিজেদের অবস্থান বদলায়, যাতে টহলরত রোগপ্রতিরোধী কোষগুলো সহজে চলাচল করতে পারে।
ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের নিউরোইমিউনোলজিস্ট জনাথন কিপনিস বলেন, এই গবেষণা দেখায় মস্তিষ্কের সীমানা কেবল শারীরিক আবরণ নয়, বরং অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত একটি কার্যকর সংযোগস্থল। তার মতে, গবেষণাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত।
গবেষণার সহলেখক এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডারস অ্যান্ড স্ট্রোকের নিউরোইমিউনোলজিস্ট ডোরিয়ান ম্যাকগাভার্ন বলেন, ভেনাস সাইনাসের এই গতিশীল আচরণ কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। খুলির নিচে প্রদাহ, তরল বা চাপ জমে গেলে মস্তিষ্ক দ্রুত ঝুঁকিতে পড়ে। এমন অবস্থায় সাইনাস সক্রিয়ভাবে সাড়া দিয়ে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
গবেষকেরা জীবিত ও অজ্ঞান করা ইঁদুরের মস্তিষ্কে ভেনাস সাইনাসের কার্যকলাপ রেকর্ড করেন। তারা খুলির একটি প্রায় এক বর্গমিলিমিটার অংশ ঘষে এত পাতলা করেন যাতে লেজার আলো ভেতর দিয়ে যেতে পারে। এতে ফ্লুরোসেন্ট প্রোটিন দিয়ে চিহ্নিত রোগপ্রতিরোধী কোষগুলো স্পষ্ট দেখা যায়।
এই পদ্ধতিকে বলা হয় ইনট্রাভাইটাল ইমেজিং। এর মাধ্যমে দেখা যায়, মসৃণ পেশি দ্বারা ঘেরা বড় শিরাগুলো খুলির নিচে স্পন্দিত হচ্ছে। শিরাগুলো সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে সক্রিয়ভাবে তরল নিষ্কাশন করে।
গবেষকেরা শিরার দেয়াল তৈরি করা এন্ডোথেলিয়াল কোষগুলোর স্টপ মোশন ভিডিও তৈরি করেন। সেখানে দেখা যায়, কোষগুলোর মধ্যে এক মাইক্রোমিটার পর্যন্ত ব্যাসের ছোট ছোট ছিদ্র রয়েছে। এসব ছিদ্রকে ফেনেস্ট্রেশন বলা হয়। এই ছিদ্র দিয়ে তরল, অণু এবং অণুজীব পার হতে পারে।
আরও দেখা যায়, শিরাগুলো তাদের সীমানা নতুন করে সাজিয়ে টহলরত রোগপ্রতিরোধী কোষগুলোর জন্য জায়গা তৈরি করে। গবেষকেরা এই অদ্ভুত আচরণকে রাফলিং নামে অভিহিত করেন।
ম্যাকগাভার্ন বলেন, দুই দশকের বেশি সময় ধরে রক্তনালি নিয়ে কাজ করেও তিনি আগে কখনও এমন আচরণ দেখেননি। তার ভাষায়, এই সংযোগস্থলগুলো সবসময় খুলছে ও বন্ধ হচ্ছে। সাইনাসের দেয়ালের চারপাশে ঘোরাফেরা করা রোগপ্রতিরোধী কোষগুলো এই প্রক্রিয়াকে চালিত করে। এন্ডোথেলিয়াল কোষগুলোর নমনীয়তা এখানে একেবারেই আলাদা ধরনের।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, মানুষের ভেনাস সাইনাসও মসৃণ পেশির স্তর দিয়ে আবৃত এবং ইঁদুরের সাইনাসের মতোই ছিদ্রযুক্ত। তবে মানুষের ক্ষেত্রে কোষের রাফলিং সরাসরি দেখানো যায়নি, কারণ বর্তমান নন ইনভেসিভ ইমেজিং প্রযুক্তিতে জীবিত মানুষের শরীরে এত সূক্ষ্ম আচরণ পর্যবেক্ষণ করার মতো রেজোলিউশন নেই।
গবেষকেরা RAMP2 নামের একটি রিসেপ্টর বন্ধ করে দিলে ইঁদুরের শরীর ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে সমস্যায় পড়ে। তখন তাদের সাইনাস নিষ্ক্রিয় নালির মতো আচরণ করে এবং রোগপ্রতিরোধী কোষের কার্যকলাপ কমে যায়। এতে ধারণা পাওয়া যায়, শিরার দেয়াল বরাবর চলাচল করা রোগপ্রতিরোধী কোষ ভাইরাস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষক দল আরও জানায়, CGRP নামের একটি নিউরোপেপটাইড শিরাগুলোকে প্রসারিত করে। মাইগ্রেন চিকিৎসায় ব্যবহৃত CGRP ইনহিবিটার ধরনের ওষুধ আংশিকভাবে সাইনাসের কার্যকলাপ পরিবর্তনের মাধ্যমে কাজ করে থাকতে পারে।
———
Highly dynamic dural sinuses support meningeal immunity. Nature (2026).
DOI: 10.1038/s41586-026-10165-8
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


