অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে একসময় হুমকির মুখে থাকা কোয়ালার জনসংখ্যা জিনগত দিক থেকে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখাচ্ছে। নতুন এক গবেষণায় এমন একটি পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে যার মাধ্যমে কোনো প্রাণী জনসংখ্যার জিনগত স্বাস্থ্য মূল্যায়ন করা যায়। গবেষণাটি দেখায়, বিলুপ্তির কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া প্রজাতিও হারানো জিনগত বৈচিত্র্য আবার ফিরে পেতে পারে।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় মারসুপিয়াল প্রাণী কোয়ালা (Phascolarctos cinereus) তাদের লোমের জন্য বিপুল সংখ্যায় শিকার হয়। ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে লক্ষ লক্ষ কোয়ালা হত্যা করা হয়, ফলে প্রজাতিটি প্রায় বিলুপ্তির মুখে পড়ে। পরে সংরক্ষণ উদ্যোগের ফলে তাদের সংখ্যা আবার বাড়ে। কিন্তু এত বড় ধসের পর জনসংখ্যায় জিনগত বৈচিত্র্য কমে যায়। সাধারণভাবে মনে করা হয়, এমন জিনগত সংকোচন কোনো প্রজাতির রোগ বা পরিবেশগত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অভিযোজনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
গবেষণার সহলেখক কলিন আহরেন্স বলেন, একবার জিনগত বৈচিত্র্য অনেক কমে গেলে তা আবার বাড়তে দেখা বিরল ঘটনা। মেলবোর্নভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিজার অস্ট্রেলিয়ার প্রধান বিজ্ঞানী আহরেন্স বলেন, সংরক্ষণ জিনতত্ত্বে সাধারণ ধারণা হলো বেশি জিনগত বৈচিত্র্য থাকা জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি সুস্থ।
তবে Science জার্নালে প্রকাশিত নতুন গবেষণায় আহরেন্স এবং তার সহকর্মীরা দেখিয়েছেন, ভিক্টোরিয়ার কোয়ালারা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কার্যকর জনসংখ্যা আকার বা effective population size, অর্থাৎ কতজন সদস্য প্রজননে অংশ নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের জিনভাণ্ডারে অবদান রাখে। গবেষকরা দেখেছেন, গত কয়েক দশকে ভিক্টোরিয়ার কোয়ালাদের কার্যকর জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যদিও অতীতে তাদের সংখ্যা ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে গিয়েছিল।
সিডনির অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়ামের জিনতত্ত্ববিদ ম্যাথিউ লট বলেন, এই গবেষণা সংরক্ষণ পরিকল্পনায় জিনতাত্ত্বিক ও বিবর্তনগত জ্ঞান একত্র করার একটি রূপরেখা দিয়েছে। এর মাধ্যমে সংরক্ষণ ব্যবস্থাপকরা কোন জনসংখ্যা জিনগতভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
হারানোর পথ থেকে পুনরুদ্ধার
১৯২০-এর দশকে ভিক্টোরিয়ায় মাত্র ৫০০ থেকে ১,০০০ কোয়ালা অবশিষ্ট ছিল। প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে কিছু কোয়ালাকে দ্বীপে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করা হয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সেই দ্বীপে জন্ম নেওয়া কোয়ালাদের বংশধরদের আবার মূল ভূখণ্ড ভিক্টোরিয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে দ্রুত কোয়ালা সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ২০২০ সালের মধ্যে অঙ্গরাজ্যটিতে প্রায় পাঁচ লক্ষ কোয়ালা বাস করছিল। কিন্তু এত ছোট একটি মূল জনসংখ্যা থেকে এই বৃদ্ধি হওয়ায় তাদের জিনগত বৈচিত্র্য কম ছিল।
গবেষক দল ২৭টি ভিন্ন জনসংখ্যা থেকে সংগ্রহ করা ৪১৮টি কোয়ালার জিনোম তথ্য বিশ্লেষণ করে ভিক্টোরিয়া এবং আরও দুটি অঙ্গরাজ্যে কোয়ালার জনসংখ্যা বৃদ্ধির ইতিহাস পুনর্গঠন করেন। তারা দেখেন, ভিক্টোরিয়ায় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে recombination নামের একটি প্রক্রিয়া বেড়েছে। এই প্রক্রিয়ায় বাবা-মায়ের ডিএনএ একত্র হয়ে নতুন বিন্যাস তৈরি করে, ফলে সন্তানদের মধ্যে জিনের নতুন সমন্বয় দেখা যায় এবং জিনগত বৈচিত্র্য বাড়ে।
গবেষণায় ভিক্টোরিয়ার কোয়ালাদের জিনোমে বিরল জিনগত ভিন্নতার সংখ্যাও বাড়তে দেখা গেছে। আহরেন্স বলেন, recombination বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করলে দেখা যায় ভিক্টোরিয়ার কোয়ালা জনসংখ্যা আগের ধারণার চেয়ে দ্রুত পুনরুদ্ধার করছে।
তিনি আরও বলেন, বড় জনসংখ্যা মানে বেশি প্রাণী প্রজননে অংশ নেয়। ফলে বেশি recombination ঘটে। সময়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক নির্বাচন উপকারী জিনের সমন্বয় ছড়িয়ে দেয় এবং ক্ষতিকর সমন্বয় কমিয়ে দেয়।
ধীরে ধীরে পতন
অন্যদিকে গবেষকেরা দেখেছেন, কুইন্সল্যান্ড এবং নিউ সাউথ ওয়েলসের কোয়ালা জনসংখ্যা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। আগে ধারণা ছিল এই অঞ্চলগুলোর কোয়ালা জিনগতভাবে শক্তিশালী, কারণ তাদের জিনগত বৈচিত্র্য তুলনামূলক বেশি। কিন্তু এখন সেখানে কার্যকর জনসংখ্যা ধীরে ধীরে কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
আহরেন্স বলেন, জনসংখ্যা কমতে থাকলে প্রজননের ঘটনাও কমে যায়। ফলে নতুন জিনের সমন্বয় তৈরির সুযোগ কমে যায় এবং recombination উপকারী বৈশিষ্ট্য ছড়িয়ে দিতে কম সক্ষম হয়।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ম্যাথিউ ক্রাউদার বলেন, নিউ সাউথ ওয়েলস এবং কুইন্সল্যান্ডে আবাসস্থল ধ্বংস, বনভূমি খণ্ডিত হয়ে যাওয়া, নগরায়ন এবং রোগের কারণে কোয়ালার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। শুরুতে জিনগত বৈচিত্র্য বেশি থাকলেও তাদের মধ্যে ক্ষতিকর মিউটেশন তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।
লট বলেন, কোনো প্রাণী জনসংখ্যার স্বাস্থ্য মূল্যায়নে কার্যকর জনসংখ্যা আকার বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত। জিনোমিকসের যুগে বড় আকারের তথ্য ব্যবহার করে হুমকির মুখে থাকা প্রজাতির বিবর্তনীয় পুনরুদ্ধার এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তন সূক্ষ্মভাবে বোঝার একটি নতুন উদাহরণ এটি।
———
The demographic path to genetic recovery in koalas (Phascolarctos cinereus). Science (2026).
DOI: 10.1126/science.adz1430
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


