চারজন মানুষ আবার চাঁদের পথে। ৫০ বছরের বেশি সময় পর, Apollo missions–এর নভোচারীরা চাঁদের মাটি ছেড়ে আসার পর এই প্রথম এমন অভিযান শুরু হলো। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল সকালে NASA–এর Artemis II মিশনে তারা Cape Canaveral, ফ্লোরিডা থেকে সফলভাবে উড্ডয়ন করতে সক্ষম হয়। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে, তারা মানুষের ইতিহাসে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাবে।
রকেট লঞ্চ টাওয়ার ছাড়ার সময় নাসার ভাষ্যকার ডেরল নেল বলেছিলেন, “মানবজাতির পরবর্তী মহান অভিযান শুরু হলো।”
নভোচারীরা প্রথমে প্রায় ২৪ ঘণ্টা পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে তাদের মহাকাশযান পরীক্ষা করেন। তারা তাদের যানের নাম দিয়েছেন “ইন্টেগ্রিটি (Integrity)”। কাছাকাছি অপারেশন পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করার পর এবং গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের সহায়তায় টয়লেটের একটি ছোট সমস্যা ঠিক করার পর, বাংলাদেশ সময় শুক্রবার তারা সার্ভিস মডিউলের প্রধান ইঞ্জিন চালু করেন। এই ইঞ্জিনই তাদের চাঁদের পথে পাঠায়।
চাঁদে পৌঁছাতে তাদের তিন দিন সময় লাগবে। ক্যাপসুলের জানালায় ধীরে ধীরে বড় হতে থাকবে চাঁদের দৃশ্য। ৬ এপ্রিল, সোমবার তারা নির্ধারিত চাঁদ পর্যবেক্ষণ ফ্লাইবাই করবে। সেখানে গিয়ে তারা চাঁদের অদেখা পাশ ঘুরে আসবে, এমন সব এলাকা দেখবে যা আগে কোনো মানুষ সরাসরি চোখে দেখেনি। এরপর আবার তিন দিনের যাত্রায় পৃথিবীতে ফিরবে।
আর্টেমিস ২ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক চাঁদ মিশনের দ্বিতীয় ধাপ। লক্ষ্য, চীনের আগে আবার মানুষকে চাঁদে নামানো। এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য হলো Orion capsule কতটা নিরাপদভাবে নভোচারীদের রক্ষা করতে পারে তা পরীক্ষা করা। কারণ এই যাত্রায় তাদের পৃথিবীর সুরক্ষামূলক চৌম্বক ক্ষেত্রের বাইরে যেতে হবে এবং গভীর মহাকাশের উচ্চ বিকিরণ পরিবেশ পার হতে হবে।
কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গ্রহবিজ্ঞানী Gordon Osinski বলেন, “চাঁদের পৃষ্ঠে আবার মানুষ পাঠানোর পথে আর্টেমিস ২ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।”
ক্রেডিট: Jasiek Krzysztofiak/Nature/BigganBart
এই যাত্রায় আর্টেমিস ২–এর নভোচারীরা নানা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালাবেন। দলে আছেন Reid Wiseman, Victor Glover, Christina Koch এবং Jeremy Hansen। তারা মহাকাশ ভ্রমণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে তা পরীক্ষা করবেন এবং চাঁদের অদেখা পৃষ্ঠকে সূক্ষ্মতায় পর্যবেক্ষণ করবেন।
এই মিশনে কিছু ঐতিহাসিক দিকও আছে। ক্রু মোম্বারদের মধ্যে গ্লোভার হবেন পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে যাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি, কচ হবেন প্রথম নারী, আর হ্যানসেন হবেন প্রথম নন-আমেরিকান যিনি এত দূর ভ্রমণ করবেন।
এই ফ্লাইট অনেকটাই ১৯৬৮ সালের Apollo 8–এর মতো। সেই মিশনে তিনজন নভোচারী চাঁদ ঘুরে এসেছিলেন, ভবিষ্যৎ চাঁদে অবতরণের প্রস্তুতি হিসেবে। আর্টেমিস মিশনের নাম রাখা হয়েছে গ্রিক পুরাণের চাঁদের দেবী আর্টেমিসের নাম থেকে, যিনি Apollo program–এর দেবতা অ্যাপোলোর যমজ বোন।
নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের চন্দ্রবিজ্ঞানী Juliane Gross বলেন, “আর্টেমিসে কাজ করা বেশিরভাগ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী অ্যাপোলো যুগে ছিলেন না। আমি এটা নিয়ে খুবই উত্তেজিত।”
চাঁদ নিয়ে সংশয়
তবে সবাই এতটা উচ্ছ্বসিত নয়। Pew Research Center–এর ২০২৩ সালের এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ১২% প্রাপ্তবয়স্ক মনে করেন চাঁদে মানুষ পাঠানো নাসার প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। অনেকেই মনে করেন, পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসতে পারে এমন গ্রহাণু পর্যবেক্ষণ বা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আর্টেমিস ২ মিশনের জন্য নাসা ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেছে। এর বড় অংশ গেছে Space Launch System রকেট তৈরিতে। ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি উৎক্ষেপণে এই রকেট ও Orion capsule–এর খরচ প্রায় ৪.১ বিলিয়ন ডলার।
ক্রেডিট: Chandan Khanna/AFP/Getty Images
১৯৬০–এর দশকেও Apollo program–এর বিশাল খরচ নিয়ে জনমনে অসন্তোষ ছিল। মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করলে এই প্রকল্পে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২৫৭ বিলিয়ন ডলার। এত খরচ করার ফলেই ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে Neil Armstrong ও Buzz Aldrin চাঁদের মাটিতে হাঁটেন।
১৯৭২ সালে নাসা অ্যাপোলো মিশন বন্ধ করে দেয়। এরপর তারা মনোযোগ দেয় স্পেস শাটল তৈরিতে, যা পুনঃব্যবহারযোগ্য মহাকাশযান হিসেবে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ এবং International Space Station–এ যাতায়াত সহজ করে। ১৯৮১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে স্পেস শাটল ১৩৫ বার উড়েছে, আর ২০০০ সাল থেকে আইএসএস–এ নিয়মিত নভোচারীরা অবস্থান করছেন।
২০১৭ সালে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump তার প্রথম মেয়াদে চাঁদে আবার মানুষ পাঠানোর বর্তমান উদ্যোগ শুরু করেন।
চীনের উত্থান
ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদে Jared Isaacman এবং মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্য আর্টেমিস মিশনকে চীনের সঙ্গে এক ধরনের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন। লক্ষ্য একটাই, আগে কে মানুষকে চাঁদে নামাতে পারে।
চীন ইতিমধ্যেই সফল রোবোটিক মিশন গড়ে তুলেছে। তারা চারবার চাঁদে প্রোব অবতরণ করিয়েছে এবং দুইবার নমুনা পৃথিবীতে এনেছে। এর মধ্যে চাঁদের অদেখা পাশ থেকে আনা প্রথম নমুনাও রয়েছে। দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে নভোচারী (যাদের তারা “টাইকোনট (taikonauts)” বলে) চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে।
এই বছর দুইবার, আইজ্যাকম্যান আর্টেমিস মিশনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনেছেন, যাতে গতি বাড়ানো যায়। Linda Godwin বলেন, “এই মিশন যত ভালোভাবে সফল হবে, তত দ্রুত আমরা এগোতে পারব।” বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, Artemis III মিশনে ২০২৭ সালে নভোচারীরা নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে গিয়ে চাঁদে অবতরণের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করবেন।
ক্রেডিট: Miguel J. Rodriguez Carrillo/AFP/Getty Images
এর পরের মিশন Artemis IV, যা ২০২৮ সালের শুরুর দিকে পাঠানোর কথা রয়েছে। সেই মিশনে প্রথমবারের মতো মানুষকে চাঁদের মাটিতে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর আরও বহু রোবোটিক ও মানব মিশন হতে পারে, লক্ষ্য একটি স্থায়ী মার্কিন চাঁদ ঘাঁটি তৈরি করা।
তবে কাজটি সহজ নয়। ২০১৮ সাল থেকে NASA খরচ কমাতে বেসরকারি কোম্পানির তৈরি রোবোটিক ল্যান্ডারে বিভিন্ন পেলোড পাঠানোর চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত চারটি উৎক্ষেপণের মধ্যে মাত্র একটি পুরোপুরি সফল হয়েছে।
আইজ্যাকম্যান জানিয়েছেন, আর্টেমিস মিশনের পূর্ণ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নাসার হাতে আছে। এর একটি বড় কারণ হলো, গত বছর মার্কিন কংগ্রেস সংস্থাটিকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। যদিও একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন নাসার অন্যান্য অনেক বৈজ্ঞানিক মিশনের বাজেট কমানোর চেষ্টা করেছে।
চাঁদে ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনাকে Clive Neal সমর্থন করেন। তিনি বলেন, “এই ভাবনাটা ভালো।” তবে বাস্তবায়ন কঠিন। বড় প্রশ্ন হলো, ২০২৭ সালের বাজেটে হোয়াইট হাউস এই প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ দেবে কি না। Jared Isaacman জানিয়েছেন, আগামী সাত বছরে চাঁদের ঘাঁটি পরিকল্পনায় প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে চান।
বিজ্ঞানময় মিশন?
NASA স্পষ্ট করেছে, আর্টেমিস শুধু Apollo program–এর পুনরাবৃত্তি নয়। এখানে বিজ্ঞানকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর্টেমিসের চন্দ্রপৃষ্ঠ গবেষণা দলের সদস্য Gordon Osinski বলেন, এই মিশনে অনুসন্ধান ও বিজ্ঞানের সমন্বয় আরও গভীর।
আর্টেমিস ২–এ একটি নতুন পদও আছে, “সায়েন্স অফিসার”। অ্যাপোলো যুগে এই পদ ছিল না। নাসার তিনজন কর্মী পালা করে এই দায়িত্ব পালন করেন। মিশনের সময় বিজ্ঞানীদের দল আলাদা কক্ষে বসে কাজ করবে। তারা তথ্য বিশ্লেষণ করে দায়িত্বে থাকা সায়েন্স অফিসারকে পরামর্শ দেবে, বিশেষ করে যখন নভোচারীরা চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যাবে।
ক্রেডিট: Jasiek Krzysztofiak/Nature/BigganBarta
আরেকটি বড় পার্থক্য হলো আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ। Artemis Accords–এ বাংলাদেশ সহ ৬০টির বেশি দেশ স্বাক্ষর করেছে। এটি মহাকাশ অনুসন্ধানের জন্য কিছু সাধারণ নীতিমালা নির্ধারণ করে।
এই মিশনে European Space Agency–ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তারা Orion capsule–এর সার্ভিস মডিউল তৈরি করেছে, যা মহাকাশযানকে শক্তি ও গতি দেয়।
NASA এই মিশনে Argentina, Germany, Saudi Arabia এবং South Korea–এর মহাকাশ সংস্থাগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তারা আর্টেমিস ২–এর সঙ্গে ছোট স্যাটেলাইট (যেগুলোকে কিউবস্যাট বলা হয়) মহাকাশে পাঠাবে। এসব কিউবস্যাট গভীর মহাকাশের বিকিরণ কীভাবে মহাকাশযানের যন্ত্রাংশ বা মানুষের শরীরের মতো টিস্যুকে প্রভাবিত করে, তা পরীক্ষা করবে।
এর আগে ২০২২ সালে Artemis I মিশনেও একই ধরনের কিউবস্যাট পাঠানো হয়েছিল। সেই মিশন সামগ্রিকভাবে সফল হলেও অনেক কিউবস্যাট কাজ করেনি। এমনকি নাসার অর্থায়নে তৈরি কিছু ছোট মহাকাশযান, যেগুলো চাঁদের পানি নিয়ে গবেষণা করার কথা ছিল, সেগুলোও ব্যর্থ হয়। এছাড়া Lunar Trailblazer মিশনের মতো প্রকল্পও উৎক্ষেপণের কিছুক্ষণ পরই যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। এসব ঘটনা দেখায়, মানুষ ছাড়া মহাকাশ মিশনেও বড় চ্যালেঞ্জ থাকে।
এই কারণেই অনেক বিজ্ঞানী এখন আর্টেমিস ২–এর দিকে তাকিয়ে আছেন। নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের গ্রহবিজ্ঞানী Barbara Cohen বলেন, “এটা সত্যি ঘটছে, বিশ্বাস করা কঠিন। আমরা অনেক দিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করেছি।”
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।






