অ্যান্টিম্যাটার হলো সাধারণ পদার্থের সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ। এই দুই একসাথে মিললে তারা একে অপরকে ধ্বংস করে সম্পূর্ণ শক্তিতে রূপ নেয়। তাই অ্যান্টিম্যাটার সংরক্ষণ বা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া অত্যন্ত কঠিন।
২৪ মার্চ, ২০২৬, CERN-এর একদল বিজ্ঞানী বিশেষভাবে তৈরি একটি পাত্রে ৯২টি অ্যান্টিপ্রোটন পরিবহন করেন। এই পাত্রে চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে কণাগুলোকে আটকে রাখা হয়। পাত্রটি একটি ট্রাকের পেছনে করে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে ল্যাবের ভেতরে ঘোরানো হয়।
এই পরীক্ষার মূল লক্ষ্য হলো অ্যান্টিপার্টিকেলকে এমন স্থানে নেওয়া, যেখানে পরীক্ষার শব্দ বা বিঘ্ন কম থাকবে। এতে অ্যান্টিপ্রোটন নিয়ে আরও নির্ভুল গবেষণা করা সম্ভব হবে, যা বর্তমান ‘অ্যান্টিম্যাটার ফ্যাক্টরি’তে কঠিন।
CERN-ই পৃথিবীর একমাত্র জায়গা, যেখানে ব্যবহারযোগ্য পরিমাণ অ্যান্টিপ্রোটন তৈরি হয়। ট্রাকটি ল্যাবের ভেতরে ৮ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করে এবং সর্বোচ্চ ৪২ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতিতে চলে। অনেক কর্মী মোবাইল ফোনে এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত ধারণ করেন।
জার্মানির Heinrich Heine University Düsseldorf-এর পদার্থবিজ্ঞানী Stefan Ulmer বলেন, “মানবজাতি আগে কখনও এমন কিছু করেনি। এটি সত্যিই ঐতিহাসিক।” এই সাফল্য উদযাপনে তারা শ্যাম্পেনও নিয়ে আসেন।
অ্যান্টিম্যাটার ব্যবহার করে তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসের গঠনসহ নানা বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে গবেষণা করা যায়। প্রায় ৩০ বছর আগে অ্যান্টিম্যাটার ফ্যাক্টরি তৈরির সময় বিজ্ঞানীরা এমন পরিবহনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। প্রকল্পের প্রধান Christian Smorra বলেন, এখন সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের University of Liverpool-এর পদার্থবিজ্ঞানী Tara Shears বলেন, এটি বড় প্রযুক্তিগত সাফল্য। অ্যান্টিম্যাটার সবচেয়ে নাজুক ধরনের পদার্থ, তাই এটিকে সংরক্ষণ করা তো দূরের কথা, ট্রাকে করে পরিবহন করা সত্যিই বিস্ময়কর।
তিনি মজা করে বলেন, CERN যেন এখন অ্যান্টিম্যাটারের ডেলিভারি সার্ভিসে পরিণত হয়েছে।
অ্যান্টিম্যাটার তৈরি ও সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ
অ্যান্টিপার্টিকেল সাধারণ কণার মতোই, তবে তাদের চার্জ ও চৌম্বক বৈশিষ্ট্য উল্টো। মহাবিশ্বে পদার্থ প্রচুর, কিন্তু অ্যান্টিম্যাটার খুবই বিরল। Big Bang-এর সময় দুটিই সমান পরিমাণে তৈরি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এই পার্থক্যের কারণ এখনো অজানা।
CERN প্রোটনকে ধাতব লক্ষ্যবস্তুতে সংঘর্ষ ঘটিয়ে অ্যান্টিম্যাটার তৈরি করে। এরপর বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক ক্ষেত্র দিয়ে অ্যান্টিপ্রোটনগুলোকে ধীর করে ধরে রাখা হয়। এই প্রক্রিয়ায় অনেক কণাই হারিয়ে যায়।
এই কণাগুলোকে এমন পাত্রে রাখতে হয়, যাতে তারা কোনোভাবেই সাধারণ পদার্থের সংস্পর্শে না আসে। এজন্য সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক ব্যবহার করা হয় এবং তাপমাত্রা কমিয়ে প্রায় −২৬৯° সেলসিয়াসে নামানো হয়। পাত্রটিকে উচ্চ শূন্যতায় রাখা হয়, যাতে কোনো কণার সঙ্গে সংঘর্ষ না ঘটে। পুরো যন্ত্রপাতিকে ট্রাকের যাত্রার চাপও সহ্য করতে হয়। চালকের আসন থেকেই কণাগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা রাখা হয়।
এক গ্রাম অ্যান্টিম্যাটার তৈরি করতে খরচ হবে ট্রিলিয়ন ডলার। আর এটি ধ্বংস হলে পারমাণবিক বোমার মতো শক্তি উৎপন্ন হবে। কিন্তু বর্তমান উৎপাদন হারে এত অ্যান্টিম্যাটার জোগাড় করতে মহাবিশ্বের বয়সের দশগুণ সময় লাগবে।
পরবর্তী পরিকল্পনা
এই প্রকল্পের নাম BASE-STEP। পরবর্তী ধাপে অ্যান্টিপ্রোটনকে CERN-এর অন্য একটি ভবনে নেওয়া হবে, যেখানে এগুলোকে নতুন পাত্রে স্থানান্তরের অনুশীলন করা হবে।
এরপর পরিকল্পনা রয়েছে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে জার্মানির Düsseldorf শহরে পাঠানোর। সেখানে নতুন একটি ল্যাবে ২০২৯ সালের দিকে গবেষণা শুরু হবে।
অ্যান্টিপ্রোটনের ভর অত্যন্ত নির্ভুলভাবে মাপতে হলে চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে তার আচরণ বিশ্লেষণ করতে হয়। কিন্তু বর্তমান অ্যান্টিম্যাটার ফ্যাক্টরিতে চৌম্বক নয়েজ বেশি থাকে। নতুন স্থানে গেলে পরিমাপের নির্ভুলতা ১০ থেকে ১০০০ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, অ্যান্টিম্যাটারের আচরণ বোঝা মহাবিশ্বের গঠন ও বিকাশ সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে। পদার্থ ও অ্যান্টিম্যাটারের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য খুঁজে পাওয়া গেলে মহাবিশ্ব কেন আজকের মতো, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হবে।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


