ব্যাকটেরিয়া দীর্ঘদিন ধরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। এই লড়াইয়ে তারা ব্যবহার করে জটিল আণবিক অস্ত্রভান্ডার, যার বড় অংশ এতদিন বিজ্ঞানীদের অজানা ছিল। সাম্প্রতিক গবেষণায় সেই গোপন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিস্তৃত চিত্র সামনে এসেছে।
২ এপ্রিল, ২০২৬ Science জার্নালে প্রকাশিত দুটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ার জিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন প্রোটিন শনাক্ত করা, যা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে ব্যাকটেরিয়াকে রক্ষা করে। এই বিশ্লেষণে লক্ষাধিক সম্ভাব্য অ্যান্টিভাইরাল প্রোটিন পাওয়া গেছে, যা ভবিষ্যতে নতুন বায়োটেকনোলজি উন্নয়নে কাজে লাগতে পারে।
স্পেনের মাদ্রিদের CSIC ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজির মাইক্রোবায়োলজিস্ট হোসে আন্তোনিও এস্কুদোরো বলেন, এই আবিষ্কার বায়োকেমিস্টদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার ভান্ডার।
এর আগে ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিভাইরাল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল CRISPR–Cas9 এবং Restriction enzyme। গবেষকরা ইতিমধ্যেই এগুলোকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শক্তিশালী টুল হিসেবে ব্যবহার করছেন। নতুন আবিষ্কৃত সিস্টেমগুলো থেকেও ভবিষ্যতে আরও উন্নত আণবিক প্রযুক্তি আসার আশা করছেন তারা।
একটি ব্যাকটেরিয়ার জিনোম বিশ্লেষণ করলে এখনো অনেক অংশ অজানা থেকে যায়, যাকে গবেষকেরা “ডার্ক ম্যাটার” বলে থাকেন। আগে জানা ছিল, ২৫০টির বেশি প্রোটিন ব্যাকটেরিয়াকে ভাইরাস থেকে রক্ষা করে। তবে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছিলেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।
ফ্রান্সের পাস্তুর ইনস্টিটিউটের অড বার্নহেইম ও তাঁর সহকর্মীরা ডিপ-লার্নিং মডেল ব্যবহার করে এই অজানা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি ব্যাকটেরিয়ার জিনোমের গড়ে প্রায় ১.৫ শতাংশ জিন ভাইরাস প্রতিরোধে জড়িত, যা আগের ধারণার প্রায় তিনগুণ। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, শনাক্ত হওয়া প্রোটিন পরিবারের ৮৫ শতাংশ আগে কখনো ইমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা ছিল না।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় Escherichia coli এবং Streptomyces albus ব্যাকটেরিয়ায় ১২টি নতুন ‘অ্যান্টিফেজ’ সিস্টেমের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। এই সিস্টেমগুলো ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমণকারী ভাইরাস, অর্থাৎ ব্যাকটেরিওফেজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যদিও এগুলো আগে কখনো অ্যান্টিভাইরাল প্রতিরক্ষা হিসেবে চিহ্নিত হয়নি।
অন্য গবেষণায়, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মাইকেল লব ও তাঁর দল DefensePredictor নামের একটি মেশিন লার্নিং টুল তৈরি করেছেন। এটি ১৭ হাজার ব্যাকটেরিয়ার জিনোম বিশ্লেষণ করে প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত প্রোটিন শনাক্ত করে।
এই টুলটি ৬৯টি ভিন্ন ধরনের E. coli স্ট্রেইনে প্রয়োগ করে ৬২৪টি প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত প্রোটিন শনাক্ত করা হয়, যার মধ্যে শতাধিক আগে অজানা ছিল। পরবর্তী সময়ে ল্যাব পরীক্ষায় ৪২টি প্রোটিনের প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুটি গবেষণাই এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছে, ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সংখ্যা এতদিন অনেক কম ধরে নেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে এই ব্যবস্থা অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় এবং বিস্তৃত।
গবেষণায় শত শত নতুন জিন শনাক্ত হয়েছে, যেগুলোর কাজ আগে জানা ছিল না। DefensePredictor অনলাইনে উন্মুক্ত করা হয়েছে, যাতে গবেষকরা সহজেই এটি ব্যবহার করতে পারেন। পাশাপাশি DefenseFinder নামে একটি উন্মুক্ত ডাটাবেজ তৈরি হয়েছে, যেখানে ৪৪ হাজারের বেশি সম্ভাব্য অ্যান্টিভাইরাল সিস্টেম সংরক্ষিত রয়েছে।
এই নতুন তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে গবেষকরা এখন প্রোটিনগুলোর কার্যপ্রণালি পরীক্ষা করছেন। বিশেষ করে তারা জানতে চাইছেন, এই সিস্টেমগুলো কীভাবে ভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত করে এবং কীভাবে সেই ভাইরাসের বংশবিস্তার থামিয়ে দেয়।
ভবিষ্যতে এই গবেষণা নতুন অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এবং আরও নিখুঁত আণবিক টুল তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি এটি ইমিউন সিস্টেমের বিবর্তন সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, স্তন্যপায়ী প্রাণীর ইমিউন সিস্টেমের কিছু বৈশিষ্ট্য ব্যাকটেরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত, যা জীববিজ্ঞানের একটি বড় চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিক উন্মোচন করছে।
———
Protein and genomic language models uncover the unexplored diversity of bacterial immunity. Science (2026).
DOI: 10.1126/science.adv8275
DefensePredictor: A machine learning model to discover prokaryotic immune systems. Science (2026)
DOI: 10.1126/science.adv7924
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


