২০ বছর, ৫৮ প্রজন্ম আর ৩০,০০০-এর বেশি ক্লোনিং প্রচেষ্টার পর গবেষকেরা বুঝতে পেরেছেন, একটি ইঁদুরকে ধারাবাহিকভাবে কতবার পুনরায় ক্লোন করা যায় তার একটি সীমা আছে।
২৪ মার্চ, ২০২৬ Nature Communications জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা দেখায়, অযৌন প্রজনন শেষ পর্যন্ত ইঁদুরের ক্ষেত্রে টেকসই নয়, এবং সম্ভবত অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র প্রযোজ্য। তৈরি হওয়া ক্লোনগুলো দেখতে স্বাভাবিক ছিল এবং স্বাভাবিক ইঁদুরের মতোই বেঁচেছে। কিন্তু তাদের জিনোমে বড় ধরনের মিউটেশন অস্বাভাবিক হারে জমা হয়েছে, এমনকি একটি সম্পূর্ণ ক্রোমোজোম হারানোর ঘটনাও ঘটেছে।
গবেষকেরা বলছেন, এই ডিএনএ পরিবর্তনই পরবর্তী ক্লোনিং ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ হতে পারে। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী মাইকেল লিঞ্চ (যিনি গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না) বলেন, এই ফলাফল মেরুদণ্ডী প্রাণীর ক্লোনিং সম্পর্কে বড় প্রশ্ন তোলে এবং কৃষিক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। সাধারণভাবে, একটি আদর্শ জিনোম সংরক্ষণের সহজ উপায় ক্লোনিং, কিন্তু মিউটেশন জমা হওয়ার সমস্যা এতে বড় বাধা।
অযৌন প্রজননে মিউটেশন জমা হওয়া বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এখানে অন্য কোনো জিনোমের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে একবার কোনো মিউটেশন কোনো বংশধারায় ঢুকে গেলে সেটি স্থায়ী হয়ে যায়, ফেরার পথ থাকে না।
১৯৯৭ সালে জাপানের ইয়ামানাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজনন জীববিজ্ঞানী তেরুহিকো ওয়াকায়ামা ও তাঁর সহকর্মীরা প্রথম একটি ক্লোন ইঁদুর তৈরি করেন। তারা প্রাপ্তবয়স্ক ইঁদুরের একটি দেহকোষ থেকে নিউক্লিয়াস নিয়ে এককোষী ভ্রূণের নিউক্লিয়াসের জায়গায় বসান। এতে তৈরি হয় জেনেটিকভাবে একেবারে অভিন্ন একটি ইঁদুর।
এরপর থেকে ওয়াকায়ামা বিভিন্ন উৎসের কোষ ব্যবহার করে ক্লোনিংয়ের সীমা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। জীবিত ও মৃত ইঁদুর, ১৬ বছর ধরে হিমায়িত মৃত ইঁদুর, ফ্রিজ-ড্রাইড কোষ, এমনকি ইঁদুরের প্রস্রাবের কোষ থেকেও তিনি ক্লোন তৈরি করেছেন। এখন তিনি ইঁদুরের মল থেকে পাওয়া কোষ ব্যবহার করে ক্লোন তৈরির চেষ্টা করছেন। এছাড়া, তিনি ও তাঁর দল ফ্রিজ-ড্রাইড শুক্রাণু দিয়ে ভ্রূণ নিষিক্ত করতে পেরেছেন, যা প্রায় ছয় বছর আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরেছিল। ওয়াকায়ামার লক্ষ্য, সব প্রাণীর জিনগত সম্পদ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা।
বহু বছর আগে তিনি ও সায়াকা ওয়াকায়ামা একটি পরীক্ষা শুরু করেন, যেখানে দেখা হয় শুধুমাত্র ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে একটি ইঁদুরের বংশধারা কতদিন টিকিয়ে রাখা যায়। ২০১৩ সালে তারা ২৫ প্রজন্ম পর্যন্ত সফলতার খবর দেন এবং ধারণা করেন, হয়তো আজীবন ক্লোনিং চালানো সম্ভব।
কিন্তু ২৭তম প্রজন্মের পর থেকেই সমস্যা বাড়তে থাকে। একই পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা সত্ত্বেও ক্লোন তৈরি করা ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। ৫৮তম প্রজন্মে এসে তারা আর কোনো ক্লোন তৈরি করতে পারেননি।
সম্ভাব্য কারণ খুঁজতে গিয়ে গবেষকেরা ডিএনএর রাসায়নিক চিহ্নের পরিবর্তনসহ নানা বিষয় পরীক্ষা করেন। তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় ডিএনএর মূল সিকোয়েন্সেই।
ওয়াকায়ামার হিসাব অনুযায়ী, ক্লোন ইঁদুরে মিউটেশনের হার স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। পরবর্তী প্রজন্মগুলোতে বড় আকারের জিনগত পরিবর্তন জমা হতে থাকে, যেমন ক্রোমোজোমের অংশ মুছে যাওয়া, উল্টে যাওয়া বা এক ক্রোমোজোম থেকে অন্যটিতে স্থানান্তর হওয়া। এমনকি পুরো একটি X ক্রোমোজোম হারিয়ে যায়। এই জিনগত বিশৃঙ্খলাই শেষ পর্যন্ত নতুন ক্লোন তৈরি অসম্ভব করে তোলে।
জাপানের RIKEN BioResource Research Center-এর প্রজনন জীববিজ্ঞানী আতসুও ওগুরা বলেন, এই গবেষণা প্রথমবার দেখাল, স্তন্যপায়ীদের মধ্যে অযৌন প্রজনন চালিয়ে গেলে প্রজন্মের পর প্রজন্মে মিউটেশন জমা হয় এবং একসময় পুরো বংশধারাই থেমে যায়।
এই ফলাফল কৃষিক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মূল্যবান গবাদি পশু সংরক্ষণের জন্য ক্লোনিং ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওগুরা পরামর্শ দেন, আগে থেকেই প্রচুর দেহকোষ সংরক্ষণ করা উচিত এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধারাবাহিক ক্লোনিং এড়িয়ে চলা উচিত।
———
Limitations of serial cloning in mammals. Nat Commun (2026).
DOI: 10.1038/s41467-026-69765-7
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


