কোষের ভেতরে নষ্ট মাইটোকন্ড্রিয়ার জায়গায় নতুন মাইটোকন্ড্রিয়া ঢোকাতে এক নতুন কৌশল দেখালেন বিজ্ঞানীরা। ১৮ মার্চ, ২০২৬ Cell জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, লোহিত রক্তকণিকার ঝিল্লি দিয়ে ঢেকে দেওয়া মাইটোকন্ড্রিয়া সহজেই কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেওয়া হলে মাইটোকন্ড্রিয়া-জনিত মারাত্মক রোগে আক্রান্ত ইঁদুরের আয়ু বেড়েছে।
গবেষকেরা দেখেছেন, লাল রক্তকণিকার ঝিল্লিতে মোড়ানো মাইটোকন্ড্রিয়া কোষে ঢোকার সময় দেহের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার নজর এড়িয়ে যায়। ফলে কোষ এগুলোকে ধ্বংস করে না। লন্ডনের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের স্নায়ুবিজ্ঞানী মাইক ডিভাইন, (যিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না) বলেন এই পদ্ধতি আগের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। তার মতে, পার্থক্যটি দিন-রাতের মতো স্পষ্ট।
তবে সব বিজ্ঞানী পুরোপুরি একমত নন। ক্যালিফোর্নিয়ার গ্ল্যাডস্টোন ইনস্টিটিউটসের স্নায়ুবিজ্ঞানী কেন নাকামুরা বলেন, গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও পারকিনসন রোগ প্রতিরোধের দাবি কিছুটা বাড়িয়ে বলা হয়েছে।
মাইটোকন্ড্রিয়া হলো কোষের শক্তিকেন্দ্র, যা কোষের কাজ চালাতে জ্বালানি তৈরি করে। এদের নিজস্ব ডিএনএ থাকে। এই ডিএনএ-তে ত্রুটি হলে লেই সিনড্রোমের মতো মারাত্মক রোগ হতে পারে, যা সাধারণত ছোট শিশুদের আক্রমণ করে।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা সুস্থ মাইটোকন্ড্রিয়া কোষে প্রতিস্থাপন করার উপায় খুঁজছেন। কিন্তু কোষের বাইরে এলে মাইটোকন্ড্রিয়ার বাইরের ঝিল্লির বৈদ্যুতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। তখন কোষ এগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত ধ্বংস করে ফেলে।
ক্রেডিট: S. Du et al./Cell
আগের গবেষণাগুলিতে সাধারণত সরাসরি রক্ত বা টিস্যুতে ‘খোলা’ মাইটোকন্ড্রিয়া প্রবেশ করানো হতো। এই পদ্ধতি খুব কার্যকর ছিল না। তাই বড় মাত্রায় মাইটোকন্ড্রিয়া দিতে হতো, যা মানুষের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নয়। গবেষকদের মতে, কোষের বাইরে থাকলে মাইটোকন্ড্রিয়াকে সুরক্ষা দেওয়া দরকার, কিন্তু কী দিয়ে ঢেকে রাখা হবে সেটাই ছিল বড় প্রশ্ন।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা লোহিত রক্তকণিকার ঝিল্লি ব্যবহার করেন, কারণ এই কোষে নিজস্ব অঙ্গাণু থাকে না। ভাঙা লাল রক্তকণিকা ও আলাদা করা মাইটোকন্ড্রিয়া একসাথে মিশিয়েই তৈরি করা হয় ‘ক্যাপসুল’। এরপর এগুলো ইঁদুরের শরীরে প্রবেশ করানো হয়।
এই আবরণ মাইটোকন্ড্রিয়ার বৈদ্যুতিক ভারসাম্য বজায় রাখে, ফলে এগুলো সহজে কোষে ঢুকতে পারে। আগে যেখানে ল্যাবের কোষগুলোর ৫ শতাংশেরও কম মাইটোকন্ড্রিয়া গ্রহণ করত, সেখানে নতুন পদ্ধতিতে প্রায় ৮০ শতাংশ কোষ মাইটোকন্ড্রিয়া গ্রহণ করেছে।
লেই সিনড্রোমে আক্রান্ত ইঁদুরের ক্ষেত্রে এই ক্যাপসুল ব্যবহারে তাদের আয়ু প্রায় দুই সপ্তাহ বেড়েছে। এটি আগের পদ্ধতির তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।
গবেষকেরা পারকিনসন রোগের ইঁদুর মডেলেও এই পদ্ধতি পরীক্ষা করেন। তাদের দাবি, এতে স্নায়ুকোষের ক্ষতি কমেছে, চলাফেরার ক্ষমতা উন্নত হয়েছে এবং মস্তিষ্কে মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতা ফিরেছে।
তবে এই মডেলটি একটি বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে তৈরি, যা মানুষের পারকিনসন রোগের প্রকৃত কারণের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তাই এই ফলাফল নিয়ে কিছু বিজ্ঞানী সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। গবেষণায় ব্যবহৃত বিষের মাত্রাও প্রচলিত নিয়ম থেকে আলাদা ছিল বলে মন্তব্য করেন অন্য এক গবেষক।
গবেষকেরা বলেন, এটি মূলত ধারণা প্রমাণের কাজ। ভবিষ্যতে আরও বিভিন্ন প্রাণী মডেলে পরীক্ষা করা দরকার। তারা এখন নির্দিষ্ট কোষে এই মাইটোকন্ড্রিয়া ক্যাপসুল পৌঁছে দেওয়ার উপায় উন্নত করতে চান। তাদের লক্ষ্য, চোখের পেশি দুর্বলতার মতো সীমিত টিস্যুতে প্রভাব ফেলে এমন রোগের চিকিৎসায় এই পদ্ধতি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় নিয়ে যাওয়া।
———
Transplantation of encapsulated mitochondria alleviates dysfunction in mitochondrial and Parkinson’s disease models. Cell (2026)
DOI: 10.1016/j.cell.2026.02.023
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



