গত ১৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে Science জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে গবেষকেরা LHS 1140b নামের একটি পাথুরে (rocky) এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডল থেকে হিলিয়াম বেরিয়ে যাওয়ার পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন। এই আবিষ্কার থেকে ধারণা করা হচ্ছে, LHS 1140b-এর ওপরের বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে হিলিয়াম রয়েছে। এর মাধ্যমে আগের কিছু গবেষণার প্রমাণও শক্তিশালী হচ্ছে, যেখানে বলা হয়েছিল ছোট আকারের পাথুরে গ্রহেরও বায়ুমণ্ডল থাকতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, LHS 1140b তার নক্ষত্রের ‘হ্যাবিটেবল জোন’ বা বাসযোগ্য অঞ্চলের মধ্যে অবস্থান করছে। কোনো নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা এমন একটি অঞ্চলকে বাসযোগ্য অঞ্চল বলা হয়, যেখানে কোনো গ্রহের পৃষ্ঠে তরল পানি থাকার মতো তাপমাত্রা বজায় থাকতে পারে। ফলে LHS 1140b প্রাণের অস্তিত্বের জন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজে অবস্থিত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ কলিন চেরুবিম বলেন, “পাথুরে এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডল খুঁজে বের করা এক্সোপ্ল্যানেট গবেষণার অন্যতম বড় লক্ষ্য।”
তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর মতো প্রাণের অস্তিত্বের জন্য বায়ুমণ্ডল, তরল পানি এবং পাথুরে পৃষ্ঠ দরকার। LHS 1140b-এর ক্ষেত্রে এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই গবেষণা থেকে এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে এক্সোপ্ল্যানেটটির পৃষ্ঠে পানি রয়েছে কি না। একই সঙ্গে গ্রহটির ভেতরের বায়ুমণ্ডলের সঠিক রাসায়নিক গঠনও জানা যায়নি। গবেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতে আরও এক্সোপ্ল্যানেট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই ফলাফল পুনরায় যাচাই করতে হবে।
তারপরও এই আবিষ্কারটি পাথুরে এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডল থাকতে পারে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে “ধাঁধার একটি অসাধারণ অনুপস্থিত অংশ” যোগ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির কেমব্রিজ ক্যাম্পাসের জ্যোতির্পদার্থবিদ সারা সিগার।
হিলিয়ামসমৃদ্ধ এক পৃথিবী
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই ধারণা করে আসছেন, পাথুরে এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডল থাকতে পারে। এমন বায়ুমণ্ডল গ্রহের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে গ্রহকে সুরক্ষা দিতে পারে এবং পৃষ্ঠে তরল পানি থাকার পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
তবে এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডল সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা প্রযুক্তিগতভাবে বেশ কঠিন। এখন পর্যন্ত গবেষকেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন গ্রহ শনাক্ত করেছেন যেগুলোর কোনো বায়ুমণ্ডল নেই, অথবা যেগুলোর বায়ুমণ্ডল এতটাই ক্ষীণ যে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন।
চেরুবিম ও তার সহকর্মীরা LHS 1140b-এর দিকে নজর দেন। ২০১৭ সালে আবিষ্কৃত এই এক্সোপ্ল্যানেটটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ পারসেক দূরে অবস্থিত একটি লাল বামন নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে। গবেষকেরা এই গ্রহটি বেছে নেন কারণ তাদের কম্পিউটার মডেল পূর্বাভাস দিয়েছিল, LHS 1140b থেকে হিলিয়াম মহাকাশে নির্গত হঢে যেতে পারে। আর হিলিয়াম বেরিয়ে যাওয়ার এমন প্রক্রিয়া থাকলে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল থাকার সম্ভাবনাও থাকে।
গবেষক দলটি চিলির লাস ক্যাম্পানাস অবজারভেটরিতে থাকা ম্যাজেলান ক্লে টেলিস্কোপ ব্যবহার করেন। তারা মোট ৬.৫ ঘণ্টা ধরে LHS 1140b পর্যবেক্ষণ করেন। এর মধ্যে একবার ২০২৪ সালে এবং আরেকবার ২০২৫ সালে পর্যবেক্ষণ করা হয়। দুইবারই গবেষকেরা এক্সোপ্ল্যানেটটির কাছ থেকে কাছাকাছি অবলোহিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের শোষণ স্পেকট্রা সংগ্রহ করেন।
পর্যবেক্ষণে তারা গ্রহটির বাইরের বায়ুমণ্ডল থেকে প্রচুর পরিমাণে হিলিয়াম বেরিয়ে যাওয়ার প্রমাণ পান। তবে গ্রহটির ভেতরের বায়ুমণ্ডলের গঠন এখনো স্পষ্ট নয়।
চেরুবিমের ধারণা, এই অভ্যন্তরীণ বায়ুমণ্ডলে পানি এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো ছোট আকারের অক্সিডাইজড অণু থাকতে পারে। তবে পরীক্ষামূলক তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
একটি মাত্র তথ্যবিন্দু
তবে গবেষণাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে। গবেষকেরা ২০২৪ সালের সংগৃহীত স্পেকট্রামে হিলিয়াম বেরিয়ে যাওয়ার প্রমাণ দেখতে পেলেও ২০২৫ সালের স্পেকট্রামে এমন কোনো প্রমাণ পাননি।
গবেষকেরা আগে থেকেই ধারণা করেছিলেন, পর্যবেক্ষণের সময় শনাক্ত হওয়া হিলিয়ামের পরিমাণে কিছুটা পরিবর্তন থাকতে পারে। কিন্তু একটি পর্যবেক্ষণে হিলিয়ামের কোনো প্রমাণই না পাওয়ায় তাদের মনে হয়, পরীক্ষার ফলাফলে কোনো সমস্যা থাকতে পারে।
চেরুবিম বলেন, “তখন আমাকে আবার ফিরে গিয়ে ভাবতে হয়েছিল, ‘আমি কি কোনো কিছু খেয়াল করতে পারিনি?’”
তিনি বলেন, “আমি সেই তথ্যগুলো খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করেছি এবং সম্ভাব্য ভুল ফলাফল ও অপ্রত্যাশিত সংকেত খুঁজে দেখেছি।”
গবেষকেরা বলছেন, হিলিয়াম পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে কোনো একটি পর্যবেক্ষণে শনাক্ত হওয়ার পর পরবর্তী পর্যবেক্ষণে শনাক্ত না হওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। চেরুবিমের ভাষায়, “এগুলো ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়ম বলেই মনে হয়।”
তিনি আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও এক্সোপ্ল্যানেট পর্যবেক্ষণ করা হবে। এর মাধ্যমে LHS 1140b-এ হিলিয়াম শনাক্ত হওয়ার ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের জ্যোতির্বিদ ভাতসাল পানওয়ার মনে করেন, আরও পরিমাপ প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রহটির মাতৃনক্ষত্রের কারণে তৈরি হতে পারে এমন স্পেকট্রোস্কোপিক পর্যবেক্ষণগত ভুলের সম্ভাবনা দূর করার জন্য অতিরিক্ত তথ্য দরকার।
এই মুহূর্তে LHS 1140b থেকে হিলিয়াম বেরিয়ে যাওয়ার প্রমাণকে গবেষকেরা একটি মাত্র তথ্যবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করছেন। চেরুবিমের মতে, এই কারণেই LHS 1140b সৌরজগতের বাইরে প্রাণের বসবাসযোগ্যতা নিয়ে গবেষণার জন্য একটি “আদর্শ গবেষণাগার” হতে পারে।
তিনি আশা করছেন, ভবিষ্যতে এই এক্সোপ্ল্যানেটকে আরও অনেকবার পর্যবেক্ষণ করা হবে।
———
Helium escaping from the atmosphere of a nearby rocky exoplanet orbiting in a habitable zone. Science (2026).
DOI:10.1126/science.aea9708
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


