বাংলাদেশের প্রতি ১৩ জন নারীর মধ্যে প্রায় একজনের ৪৫ বছর বয়সের আগেই মেনোপজ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddr,b)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মাল্টিকান্ট্রি গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য। ৪৪টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের ৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৮ জন নারীর স্বাস্থ্য তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, এসব দেশে গড়ে প্রতি ১৪ জন নারীর একজন অকাল বা আগাম মেনোপজের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। গবেষণাটি গত ৭ জুলাই, ২০২৬ তারিখে BMJ Global Health জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
মেনোপজ নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক জৈবিক পর্যায়, যখন স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে এটি ঘটে। তবে ৪৫ বছরের আগে মেনোপজ হলে তাকে “আর্লি মেনোপজ” বা আগাম মেনোপজ বলা হয়, আর ৪০ বছরের আগেই হলে সেটিকে “প্রিম্যাচিউর মেনোপজ” বা অকাল মেনোপজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষকদের মতে, স্বাভাবিক সময়ের আগে মেনোপজ শুরু হলে শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের সুরক্ষামূলক প্রভাব অনেক আগে থেকেই কমে যায়। এর ফলে পরবর্তী জীবনে হৃদরোগ, অস্টিওপোরোসিস, স্মৃতিশক্তির অবনতি, বিষণ্নতা এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
গবেষণায় ২০১৫ সালের পর পরিচালিত ৪৪টি দেশের ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (DHS)-এর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৭ লাখের বেশি নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। নারীদের মাসিক ও প্রজনন ইতিহাসের ভিত্তিতে কারা মেনোপজে পৌঁছেছেন এবং তাঁদের মধ্যে কারা ৪৫ বছরের আগেই মেনোপজে পৌঁছেছেন, তা নির্ধারণ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১২ মাস মাসিক বন্ধ থাকার সংজ্ঞা ব্যবহার করেও ফলাফল পরীক্ষা করা হয় এবং তাতেও একই ধরনের ফল পাওয়া যায়।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে আগাম বা অকাল মেনোপজের গড় হার ৭ দশমিক ১ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে এই হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপালে এ হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ভারতে ৮ শতাংশ। পাকিস্তানে হার তুলনামূলক কম, ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ হার দেখা গেছে ইথিওপিয়ায়, যেখানে ১২ শতাংশ নারী ৪৫ বছরের আগেই মেনোপজে পৌঁছান। এরপর রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মিয়ানমার, ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম হার জর্ডানে, মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। এরপর রয়েছে গ্যাবন, ২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আর্মেনিয়া, ২ দশমিক ৮ শতাংশ।
গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্যের বিষয়ও উঠে এসেছে। গ্রামীণ অঞ্চলের নারীদের মধ্যে আগাম মেনোপজের ঝুঁকি শহরের নারীদের তুলনায় বেশি। শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থা, কর্মসংস্থান এবং প্রজনন ইতিহাসের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরও গ্রামীণ নারীদের ক্ষেত্রে ৪৫ বছরের আগেই মেনোপজ হওয়ার সম্ভাবনা ১৭ শতাংশ বেশি ছিল। গবেষকদের মতে, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, পুষ্টির ঘাটতি, কঠোর শারীরিক শ্রম, সীমিত স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং জীবনযাত্রার পার্থক্য এই ব্যবধানের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষাকে এই গবেষণায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষামূলক উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেসব নারী প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন, তাঁদের আগাম মেনোপজের সম্ভাবনা নিরক্ষর নারীদের তুলনায় ১১ শতাংশ কম। মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ২৮ শতাংশ কমে যায় এবং উচ্চশিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে তা ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত কম দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, শিক্ষা নারীদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়, উন্নত পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব নারীর বিয়ে ১৮ বছর বা তার পরে হয়েছে, তাঁদের আগাম মেনোপজের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একই প্রবণতা প্রথম সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। ১৮ বছর বা তার পরে প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের মধ্যে ৪৫ বছরের আগেই মেনোপজ হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। গবেষকদের মতে, বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে মাতৃত্ব নারীর দীর্ঘমেয়াদি প্রজনন স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং icddr,b-এর গবেষক রাইশা বিনতে ইসলাম বলেন, তাঁদের ফলাফল দেখায় যে আগাম মেনোপজ শুধুমাত্র জৈবিক কারণে হয় না। শিক্ষা, বসবাসের স্থান, অল্প বয়সে বিয়ে এবং সন্তান জন্মদানের মতো সামাজিক বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর মতে, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হলে এর সুফল প্রজনন স্বাস্থ্যের বাইরেও দীর্ঘমেয়াদে নারীদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যে প্রতিফলিত হবে।
icddr,b-এর মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সিনিয়র পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান বলেন, আগাম মেনোপজকে শুধুমাত্র প্রজনন জীবনের একটি ধাপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। তিনি বলেন, যেসব নারী কম বয়সে মেনোপজে পৌঁছান, তাঁদের মধ্যে অস্টিওপোরোসিস, হৃদরোগ, বিষণ্নতা এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই চিকিৎসকদের নিয়মিত রোগীর কাছ থেকে মেনোপজের বয়স সম্পর্কে জানতে হবে। এই সাধারণ তথ্যই ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের দ্রুত শনাক্ত করতে এবং সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা করতে পারে।
গবেষণায় ধূমপানের বিষয়টি বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়নি, কারণ অংশগ্রহণকারী সব দেশের জরিপে এই তথ্য সমানভাবে পাওয়া যায়নি। তবুও গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় ধূমপানই এমন একটি প্রতিষ্ঠিত জীবনধারাগত কারণ, যা আগাম মেনোপজের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সম্পর্কিত। তাই নারীদের ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করা স্বাস্থ্য কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। তাই এখান থেকে কোনো কারণ ও ফলাফলের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করা যায় না। গবেষণাটি স্বপ্রতিবেদিত তথ্যের ওপর নির্ভর করেছে এবং ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, পরিবেশগত প্রভাব কিংবা হরমোনজনিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
গবেষকদের মতে, এই ফলাফল নারীদের স্বাস্থ্যসেবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তাঁরা মেয়েদের শিক্ষায় আরও বিনিয়োগ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ, মানসম্মত প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার এবং আগাম মেনোপজের জৈবিক ও সামাজিক কারণ আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা মনে করেন, প্রজনন স্বাস্থ্য ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচির সঙ্গে মেনোপজকে যুক্ত করলে আগাম স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করা এবং নারীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে।
———
Prevalence and determinants of premature or early menopause: a pooled analysis of 716 648 women from 44 low- and middle-income countries. BMJ Global Health (2026).
DOI: 10.1136/bmjgh-2026-023742
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


