ইউরোপে পাওয়া এক ধরনের সাধারণ পিঁপড়া জীববিজ্ঞানের একটি মৌলিক নিয়ম ভেঙে দিয়েছে। এদের রানিরা এমন পুরুষ পিঁপড়ার জন্ম দিতে পারে, যারা আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির। আইবেরিয়ান হারভেস্টার পিঁপড়া (Messor ibericus)-এর রাণীরা একধরনের যৌন পরজীবী, যারা নির্ভর করে Messor structor নামের অন্য প্রজাতির পুরুষ পিঁপড়ার শুক্রাণুর ওপর। এই শুক্রাণু ব্যবহার করে তারা শক্তিশালী শ্রমিক পিঁপড়ার বাহিনী তৈরি করে, যেগুলো দুই প্রজাতির মিশ্রণ।
তবে নতুন তথ্য বলছে, আশেপাশে যদি কোনো M. structor উপনিবেশ না থাকে, তাহলেও M. ibericus রাণীরা এমন ডিম দিতে পারে, যাতে থাকে কেবলমাত্র M. structor-এর ডিএনএ। অর্থাৎ তারা ক্লোন করে জন্ম দিতে পারে M. structor পুরুষ পিঁপড়ার। এই চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে Nature জার্নালে, ৩ সেপ্টেম্বর।
কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন জীববিজ্ঞানী জ্যাকবুস বুমস্মা বলেন, “এটি একেবারেই অবিশ্বাস্য ও অদ্ভুত এক গল্প। এমন এক প্রজনন পদ্ধতি, যা প্রায় কল্পনাতীত।”
আইবেরিয়ান হারভেস্টার অ্যান্ট ইউরোপের কিছু অঞ্চলে M. structor-এর সঙ্গে সহাবস্থান করে এসেছে। ফলে ঐতিহাসিকভাবে তাদের কাছে সবসময় মিলনের জন্য M. structor পুরুষ সহজলভ্য ছিল।
কিন্তু ফ্রান্সের মন্টপেলিয়ারের ইনস্টিটিউট অব ইভোলিউশনারি সায়েন্সের গবেষক জোনাথান রোমিগুইয়ের দল সিসিলি দ্বীপে এক অদ্ভুত ঘটনা খুঁজে পান। সেখানে প্রচুর M. ibericus পিঁপড়া থাকলেও M. structor-এর কোনো উপনিবেশ দেখা যায়নি।
তবে উপনিবেশের ভেতরে ঢুকে তারা খুঁজে পান দুই ধরনের চেহারার পিঁপড়া। জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেল, ওগুলো আসলে দুই প্রজাতিরই—M. ibericus ও M. structor। রহস্য উন্মোচন হলো: আইবেরিয়ান রানীরা নিজেরাই ক্লোন করে তৈরি করে M. structor পিঁপড়া, যাদের শুক্রাণু তারা ব্যবহার করে শ্রমিক হাইব্রিড জন্ম দিতে। এসব শ্রমিক আবার উপনিবেশের যত কাজকর্ম করে—বসতি বানানো, খাবার সংগ্রহ ইত্যাদি। রোমিগুইয়ের ভাষায়, “আসলে M. ibericus যেন M. structor এবং তার জিনোমকে গৃহপালিত করে ফেলেছে।”
গবেষকরা আরও জানান, এই দুই প্রজাতি ৫০ লক্ষ বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। মানুষের সঙ্গে শিম্পাঞ্জির বিচ্ছেদের সময়কালও প্রায় এতটাই পুরনো। তাই এক প্রজাতির পক্ষে আরেক প্রজাতিকে জন্ম দেওয়া সত্যিই বিস্ময়কর।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গবেষকরা যখন এই ক্লোন করা M. structor পিঁপড়াদের আসল M. structor উপনিবেশে ঢোকান, তখন তারা বিদেশি অনুপ্রবেশকারী ভেবে মেরে ফেলে। কারণ, দেখতে একই রকম হলেও ক্লোনগুলোর শরীরে ছিল আইবেরিয়ান আত্মীয়দের ফেরোমোন, যা তাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, যদিও ক্লোনগুলোর কোষের নিউক্লিয়াসে থাকে কেবল M. structor ডিএনএ, কিন্তু তাদের মাইটোকন্ড্রিয়ায় পাওয়া যায় M. ibericus-এর ডিএনএ।
রোমিগুইয়ে মনে করেন, এই ঘটনা অনেকটা মিল রাখে প্রাচীন সেই সহযোগিতার সঙ্গে, যেটির মাধ্যমে প্রায় একশ কোটি বছর আগে ইউক্যারিওটিক কোষে মাইটোকন্ড্রিয়া যুক্ত হয়েছিল। তখন এক প্রাচীন কোষ একটি ব্যাকটেরিয়াকে গ্রাস করেছিল, আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল প্রাণীর, উদ্ভিদের ও ছত্রাকের কোষের দ্বৈত জিনোম। তবে কোপেনহেগেনের বুমস্মার মতে, M. ibericus-এর এই বিরল যৌন পরজীবিতা কখনোই মাইটোকন্ড্রিয়ার মতো সফল হয়ে জীবজগতে ছড়িয়ে পড়বে না।
প্যারিসের প্র্যাকটিক্যাল স্কুল অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের বিবর্তন-বিশারদ ক্লদী ডুমস মন্তব্য করেন, “পিঁপড়ারা সত্যিই অসাধারণ। তারা আমাদের নতুন ধরনের, অস্বাভাবিক প্রজনন ব্যবস্থার প্রতি মন খোলা রাখতে বাধ্য করে।”
———
One mother for two species via obligate cross-species cloning in ants. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09425-w
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


