গৃহপালিত বিড়াল হল ফেলিডি (Felidae) পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্যদের মধ্যে একটি। একটি পরিবার সিংহ, বাঘ, জাগুয়ার ও কাউগার অন্তর্ভুক্ত। বিড়ালই সেই পরিবারের একমাত্র সদস্য যাকে মানুষ গৃহপালিত করতে পেরেছে।
বিড়াল হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের সঙ্গে বসবাস করছে। ধারণা করা হয়, তারা সম্ভবত প্রথমে মানুষের শস্যভাণ্ডারের আশেপাশে ঘোরাফেরা শুরু করে। ইঁদুর ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ খেয়ে শস্যভাণ্ডার রক্ষায় সাহায্য করার পর এরা জাহাজে করে নাবিকদের সঙ্গে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
বিড়াল এখনও ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করণেও মানুষকে সঙ্গী হিসাবে এখন বেশি জনপ্রিয়। বিগত কয়েক শতাব্দীতে মানুষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য কিছু বিড়াল প্রজাতিকে প্রজনন করিয়েছে। যার ফলে অনেকগুলো ভিন্ন বিড়ালের ব্রিড তৈরি হয়েছে।
গৃহপালিত বিড়ালের উৎপত্তি অনুসন্ধানকারী গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই মনে করতেন, বিড়ালরা সম্ভবত নবপ্রস্তরযুগে (১০,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে আনুমানিক ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত) কৃষকদের সঙ্গে ইউরোপে এসেছে কৃষিকাজের বিস্তারের সময়।
তবে দুটি নতুন বৃহৎ গবেষণা — একটি রোমের টর ভারগাটা বিশ্ববিদ্যালয় ও ৪২টি প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচেষ্টায় এবং অন্যটি এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় — দেখিয়েছে যে এই ইতিহাসটি অনেক বেশি জটিল। উভয় গবেষণাই গৃহপালিত বিড়ালের সম্ভাব্য উৎপত্তিস্থল হিসেবে তিউনিশিয়াকে নির্দেশ করছে।
এই দুই গবেষণায় বিপুল পরিমাণ জেনেটিক তথ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ একত্রিত করে ইউরোপে গৃহপালিত বিড়ালের আগমনের সময়সীমাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এবং বিড়াল গৃহপালনে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিড়াল দীর্ঘদিন ধরে প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এক ধাঁধা ছিল। তাদের কঙ্কাল কাঠামো ও সাধারণত ব্যবহৃত মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ মার্কার বন্য বিড়ালের সঙ্গে অনেকাংশে মিলে যায়।
টর ভারগাটা বিশ্ববিদ্যালয়-নেতৃত্বাধীন দলটি ইউরোপ ও আনাতোলিয়ার ৯৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে প্রাচীন বিড়ালের নমুনা, ইতালি, বুলগেরিয়া ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন জাদুঘরের নমুনা বিশ্লেষণ করে প্যালিওজেনোমিক গবেষণা চালায়।
তাদের গবেষণা “The dispersal of domestic cats from Northern Africa and their introduction to Europe over the last two millennia“, bioRxiv প্রিপ্রিন্ট সার্ভারে প্রকাশিত হয়েছে। এতে ৭০টি লো-কভারেজ প্রাচীন জিনোম, ১৭টি জাদুঘরের জিনোম এবং ৩৭টি রেডিওকার্বন ডেটেড বিড়ালের দেহাবশেষ বিশ্লেষণ করা হয়।
পারমাণবিক ডিএনএ বিশ্লেষণের ফলাফলে দেখা যায়, ইউরোপে গৃহপালিত বিড়ালের পূর্বপুরুষদের উপস্থিতি প্রথম শতাব্দী খ্রিস্টাব্দের পর থেকে দেখা যায় — যা পূর্বের প্রচলিত ধারণার চেয়ে হাজারখানো বছর পর।
এই গবেষণায় তারা দুটি আগমনের ঢেউ চিহ্নিত করেছে: প্রথম ঢেউয়ে খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতকে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা থেকে সার্ডিনিয়ায় বন্য বিড়াল আসে, যেখান থেকে আজকের বন্য বিড়াল জনসংখ্যার উৎপত্তি। দ্বিতীয় ঢেউটি আসে রোমান সাম্রাজ্যিক সময়ে, যখন আধুনিক গৃহপালিত বিড়ালের মতো জিনগত বৈশিষ্ট্যযুক্ত বিড়াল ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে — এবং এর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তিউনিশিয়ার নাম উঠে আসে।
এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটির শিরোনাম “Redefining the timing and circumstances of cat domestication, their dispersal trajectories, and the extirpation of European wildcats”। এটিও bioRxiv-এ প্রিপ্রিন্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। তারা ২০৬টি স্থানের ২,৪১৬টি প্রত্নতাত্ত্বিক বিড়ালের হাড় বিশ্লেষণ করে এবং জেনেটিক ফলাফলের সঙ্গে গঠনগত তথ্য মিলিয়ে দেখে, ইউরোপে গৃহপালিত বিড়াল সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শুরুতেই এসে পৌঁছেছিল — রোমান সাম্রাজ্যের উত্থানের আগেই।
তাদের গবেষণায় ব্রিটেনে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ থেকে দ্বিতীয় শতকের মধ্যে মাইটোকন্ড্রিয়াল হ্যাপ্লোগ্রুপ পাওয়া গেছে, যা আয়রন যুগে বিড়ালের আগমনের ইঙ্গিত দেয়। এরপর রোমান, লেট অ্যান্টিক এবং ভাইকিং সময়ে একাধিক ঢেউয়ে বিড়াল ইউরোপে প্রবেশ করে। এই গবেষণাতেও তিউনিশিয়াকে গৃহপালিত বিড়ালের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আগের ধারণায় বিড়ালের গৃহপালন মূলত কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য বলে মনে করা হতো। কিন্তু এই গবেষণাগুলোতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিকগুলো গৃহপালনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।
মিশরে বিড়ালদের দেবী বাসতেত-এর সঙ্গে পূজা করা হতো, যার ফলে বিড়াল মমি করার প্রথা এবং ধর্মীয় নেটওয়ার্কে তাদের স্থানান্তর ঘটেছে। গ্রিক-রোমান ধর্মাচারে বিড়াল দেবী আর্টেমিস ও ডায়ানার প্রতীক ছিল, যেটি মিশরের বাসতেত-এর গুরুত্বের প্রতিচ্ছবি। নর্স পুরাণেও দেবী ফ্রেয়্যার সঙ্গে বিড়ালের সংযোগ দেখা যায় — এই বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানগুলো বিড়ালের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
উভয় গবেষণায় গৃহপালিত বিড়াল এবং ইউরোপের দেশীয় বন্য বিড়ালের মধ্যে মিশ্রণ ও প্রতিযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রথম সহস্রাব্দ খ্রিস্টাব্দ থেকে বন্য বিড়ালের সংখ্যায় ধীরে ধীরে পতনের ইঙ্গিত পাওয়া যায় — সম্ভবত খাদ্য উৎসের জন্য প্রতিযোগিতা, রোগবালাই এবং আন্তঃপ্রজননের কারণে।
যদিও দুটি গবেষণায় গৃহপালিত বিড়ালের ইউরোপে আগমনের সময় ও পথ নিয়ে পার্থক্য আছে, তবে একটি ব্যাপারে উভয়ই একমত — ইউরোপে বিড়ালের গৃহপালন ও বিস্তার অনেক দেরিতে, এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের মধ্য দিয়ে ঘটেছিল।
এই আবিষ্কার প্রাচীন নিওলিথিক বসতিতে বিড়ালের সর্বব্যাপী উপস্থিতির ধারণা ভেঙে দেয় এবং দেখায় যে শুধু মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ ব্যবহার করলে বিড়ালের গৃহপালনের পুরো চিত্র বোঝা যায় না।
সার্বিকভাবে, এই গবেষণাগুলো আমাদের অন্যতম পরিচিত সঙ্গী প্রাণী সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। প্রাচীন কৃষকদের পেছনে ছায়ার মতো হাঁটা প্রাণী নয়, বরং উত্তর আফ্রিকায় গৃহপালিত হওয়ার পর বহু ঢেউয়ে, মানব সভ্যতার ধর্মীয় বিশ্বাস, বাণিজ্যিক পথ ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে বিড়াল ইউরোপে পৌঁছেছিল।
———
- The dispersal of domestic cats from Northern Africa and their introduction to Europe over the last two millennia, biorxiv (2025).
DOI: 10.1101/2025.03.28.645893 - Redefining the timing and circumstances of cat domestication, their dispersal trajectories, and the extirpation of European wildcats, biorxiv (2025).
DOI: 10.1101/2025.03.28.645877
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


