এই সপ্তাহে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আমাদের সৌরজগতে তৃতীয় পরিচিত আন্তঃনাক্ষত্রিক (interstellar) আগন্তুক বস্তু শনাক্ত করেছেন।
১ জুলাই, ২০২৫ তারিখে অ্যাস্টেরয়েড টেরেস্ট্রিয়াল-ইমপ্যাক্ট লাস্ট অ্যালার্ট সিস্টেম (ATLAS) প্রথম এই মহাজাগতিক অতিথিকে শনাক্ত করে, এবং তখন এটিকে সাময়িকভাবে “A11pl3Z” নামে ডাকা হচ্ছিল। নাসার সেন্টার ফর নিয়ার আর্থ অবজেক্ট স্টাডিজ এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল ইউনিয়ন (IAU) এই আবিষ্কারটি নিশ্চিত করেছে, এবং এখন বস্তুটির অফিসিয়াল নামকরণ হয়েছে: 3I/ATLAS।
ক্রেডিট: NASA/JPL-Caltech
3I/ATLAS যে আমাদের সৌরজগতের বাইরের উৎস থেকে এসেছে, তা নির্দেশ করার মতো কিছু শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রথমত, এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলেছে। বর্তমান পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এটি ঘণ্টায় প্রায় ২,৪৫,০০০ কিলোমিটার গতিতে মহাশূন্যে ছুটে চলেছে — এই গতি সূর্যের মহাকর্ষ টান থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।
যে কোনো বস্তু যদি পৃথিবীর কক্ষপথের কাছাকাছি থাকে, তাহলে সৌরজগৎ থেকে বেরিয়ে যেতে তার প্রায় ১,৫০,০০০ কিমি/ঘণ্টা গতিই যথেষ্ট।
দ্বিতীয়ত, 3I/ATLAS-এর কক্ষপথ সূর্যের চারপাশে অত্যন্ত বক্র (eccentric)। কক্ষপথের বিকেন্দ্রতা (eccentricity) মানে হল কতটা “টানা” বা লম্বাটে কক্ষপথটি— যেখানে 0 মানে একেবারে নিখুঁত বৃত্তাকার কক্ষপথ, এবং ১-এর নিচে মানে চ্যাপ্টা উপবৃত্তাকার কক্ষপথ। কিন্তু ১-এর বেশি হলে বুঝতে হবে বস্তুটি সূর্যের মাধ্যাকর্ষণে আবদ্ধ নয়, অর্থাৎ এটি সৌরজগতে বাঁধা নয়।
3I/ATLAS-এর অনুমানিক বিকেন্দ্রতা ৬.৩, যা সৌরজগতের মধ্যে কোনো বস্তুর জন্য এ পর্যন্ত পরিলক্ষিত সর্বোচ্চ।
এর আগে এমন কিছু ঘটেছে?
২০১৭ সালে ‘Oumuamua নামের এক দীর্ঘ, সিগার-আকৃতির বস্তুকে প্রথম আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এটি হাওয়াইয়ের Pan-STARRS1 টেলিস্কোপের মাধ্যমে ধরা পড়ে। বিজ্ঞানীরা ৮০ দিন ধরে এটি পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত হন যে এটি সৌরজগতের বাইরের উৎস থেকে এসেছে।
ক্রেডিট: ESO/M. Kornmesser
এরপর ২০১৯ সালে কমেট 2I/Borisov ধরা পড়ে, আবিষ্কার করেন শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী গেন্নাদি বরিসভ। এইবার বিজ্ঞানীরা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিশ্চিত হন এটি আন্তঃনাক্ষত্রিক।
ক্রেডিট: NASA, ESA, and D. Jewitt (UCLA)
এবারের 3I/ATLAS-এর উৎস শনাক্ত করতে বিজ্ঞানীদের মাত্র কয়েক দিন লেগেছে।
এটি কীভাবে এখানে এল?
আমরা এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি আন্তঃনাক্ষত্রিক ভ্রমণকারী বস্তু দেখেছি (3I/ATLAS সহ), তাই সঠিকভাবে বলা কঠিন যে তারা কীভাবে এখানে এসেছে।
তবে The Planetary Science Journal-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে এ জাতীয় বস্তু হয়তো আমরা যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় আছে। বিশেষ করে, এরা আমাদের নিকটবর্তী নাক্ষত্রিক প্রতিবেশী যেমন আলফা সেন্টাউরি (মাত্র ৪.৪ আলোকবর্ষ দূরে) থেকে আসতে পারে।
ক্রেডিট: ESA/Hubble & NASA
আলফা সেন্টোরি ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে, এবং আগামী ২৮,০০০ বছরে এটি সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছাবে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আমাদের সৌরজগতের মতো ওরাও যদি বস্তু ছুঁড়ে ফেলে, তবে ইতিমধ্যে আলফা সেন্টাউরি থেকে প্রায় ১০০ মিটারের বড় প্রায় ১০ লাখ বস্তু আমাদের সৌরজগতের বাইরের অঞ্চলে অবস্থান করতে পারে। এবং এটি আরও দশগুণ বাড়তে পারে যতই তারা কাছাকাছি আসে।
এই বস্তুগুলোর বেশিরভাগই অপেক্ষাকৃত কম গতিতে (প্রতি সেকেন্ডে ২ কিমি’র নিচে) নির্গত হয়েছে বলে মনে করা হয়, ফলে তারা ধীরে ধীরে আমাদের মহাজাগতিক আশেপাশে প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু 3I/ATLAS-এর মতো উচ্চগতিতে প্রবেশ ও প্রস্থান করার সম্ভাবনা কম। গবেষণাটি আরও জানাচ্ছে যে, প্রতি বছর কিছু অতি ক্ষুদ্র (বালুকণার মতো) মাপের উল্কা হয়তো ইতিমধ্যেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আলফা সেন্টাউরি থেকে এসে পড়ছে।
কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
3I/ATLAS-এর মতো নতুন আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু আবিষ্কার করা শুধু বিরল বলেই এক্সাইটিং নয়, বরং এর প্রত্যেকটি বস্তু আমাদের গ্যালাক্সির এক অনন্য ঝলক দেখার সুযোগ দেয়। প্রত্যেক নিশ্চিত আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু আমাদের ডেটাবেসকে সমৃদ্ধ করে এবং বিজ্ঞানীদের আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে—এইসব অতিথির স্বভাব কী, তারা কেমনভাবে মহাকাশ পাড়ি দেয়, এবং তারা কোথা থেকে আসতে পারে।
এতে সাহায্য করছে নতুন প্রজন্মের শক্তিশালী পর্যবেক্ষণযন্ত্র, যেমন: NSF–DOE Vera C. Rubin Observatory। এই অবজারভেটরির প্রথম ১০ ঘণ্টার পরীক্ষামূলক ছবি তোলার মধ্যেই ২,১০৪টি আগে অজানা অ্যাস্টেরয়েড (গ্রহাণু) শনাক্ত হয়েছে, যা গড়ে অন্যান্য সমস্ত পর্যবেক্ষণাগার থেকে বার্ষিক প্রায় ২০,০০০টি এমন বস্তুর তুলনায় বেশি। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রিপ্রিন্ট সার্ভার arXiv-এ পোস্ট করা একটি গবেষণাপত্রে গবেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে আগামী দশ বছরের জরিপে রুবিন ৬ থেকে ৫১টি আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম হবেন।
এটি ভবিষ্যতের এক অভাবনীয় ইঙ্গিত। বিশাল ফিল্ড-অব-ভিউ এবং একটানা আকাশ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থাকার কারণে, Rubin টেলিস্কোপ আমাদের আন্তঃনাক্ষত্রিক অনুসন্ধানে এক নতুন যুগের সূচনা করতে চলেছে — যেখানে একসময় বিরল মনে হওয়া আবিষ্কারগুলো হয়তো নিয়মিত ঘটতে পারে।
এখন কী হবে?
3I/ATLAS সম্পর্কে জানার এখনও অনেক কিছু বাকি। বর্তমানে, এটি IAU-এর মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ধূমকেতু (comet) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছে।
তবে কিছু বিজ্ঞানী মনে করছেন এটি হয়তো একটি অ্যাস্টেরয়েড, যার আকার প্রায় ২০ কিমি, কারণ এতে ধূমকেতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য যেমন উজ্জ্বল কোমা বা লেজ দেখা যায়নি। এর প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হলে আরও বেশি পর্যবেক্ষণ দরকার হবে।
এই মুহূর্তে, 3I/ATLAS সৌরজগতে ঢুকছে, এবং জুপিটারের কক্ষপথের একটু ভেতরে অবস্থান করছে। এটি ২৯ অক্টোবর তারিখে সূর্যের সবচেয়ে কাছে আসবে — ঠিক মঙ্গলের চেয়েও একটু কাছাকাছি। এরপর এটি আবার গভীর মহাকাশের দিকে ছুটে যাবে এবং ডিসেম্বরে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে (তবে এটি পৃথিবীর জন্য কোনো হুমকি নয়)।
সে 3I/ATLAS ধূমকেতু হোক বা অ্যাস্টেরয়েড, এ এক অন্য তারকা-পুঞ্জের বার্তাবাহক। আপাতত, এদের দেখা পাওয়া বিরল হলেও, Rubin-এর মতো পরবর্তী প্রজন্মের পর্যবেক্ষণযন্ত্র চালু হলে, আমরা হয়তো এরকম বহু আন্তঃনাক্ষত্রিক সঙ্গীর খোঁজ পেতে পারি।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।






