বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর “ক্রিটিক্যাল জোন”-এর গভীর মাটির স্তরে একটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অণুজীবের পর্ব (Phylum) আবিষ্কার করেছেন। এই অঞ্চলটি মাটির এমন এক গভীর স্তর, যা পানির গুণগত মান পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভূগর্ভস্থ পানি, যেটি পরবর্তীতে পানযোগ্য পানিতে রূপান্তরিত হয়, এই অণুজীবদের বাসস্থানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং তারা সেই পানিতে থাকা দূষণকারী উপাদানগুলো ভক্ষণ করে পরিষ্কার করে। এ সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি Proceedings of the National Academy of Sciences জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
চিত্রশিল্পী ও বিজ্ঞানী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি একবার বলেছিলেন, “আমরা আকাশের নক্ষত্রদের চলাচল সম্পর্কে যতটা জানি, তার চেয়ে মাটির নিচে কী আছে, তা কম জানি।” মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির জীবাণুবিজ্ঞানী জেমস টাইডজি এই কথার সঙ্গে একমত। তবে তিনি এই সীমাবদ্ধতা দূর করার লক্ষ্যেই কাজ করছেন, বিশেষ করে পৃথিবীর “ক্রিটিক্যাল জোন” নিয়ে, যেটিকে তিনি পৃথিবীর “জীবন্ত চামড়া”র অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।
“ক্রিটিক্যাল জোন গাছের চূড়া থেকে শুরু করে মাটির প্রায় ৭০০ ফুট গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত,” বলেন টাইডজি। “এই অঞ্চল পৃথিবীর অধিকাংশ জীবনের সহায়ক, কারণ এটি মাটি গঠন, পানি ও পুষ্টি উপাদানের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে—যা খাদ্য উৎপাদন, পানির মান ও বাস্তুসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর গভীর অংশটি এখনও অনেকটাই অনাবিষ্কৃত।”
গভীর মাটির স্তরে কী পেলেন গবেষকেরা?
গবেষকরা এক বিশাল, অজানা অণুজীবীয় জগতে একটি সম্পূর্ণ নতুন ফাইলাম শনাক্ত করেছেন, যার নাম CSP1-3।
এই নতুন ফাইলামটি আইওয়া ও চীনের মাটির ৭০ ফুট গভীর থেকে সংগৃহীত নমুনায় পাওয়া গেছে। কেন এই দুটি অঞ্চল? কারণ এই দুই জায়গার মাটির গঠন তুলনায়মূলক বেশ গভীর এবং দেখতে সিমিলার, এবং গবেষকেরা জানতে চেয়েছিলেন এই অণুজীব শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে নাকি আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে আছে।
গভীর মাটি থেকে পাওয়া এই অনুজীবদের DNA বিশ্লেষণে দেখা গেছে CSP1-3 এর পূর্বপুরুষরা বহু মিলিয়ন বছর আগে গরম প্রস্রবণ ও মিঠা পানির পরিবেশে বসবাস করত। পরে তারা অন্তত একবার পরিবেশ বদল করে প্রথমে উপরিভাগের মাটিতে এবং পরে ক্রমে গভীর মাটিতে বসতি গড়ে তোলে।
টাইডজি আরও বলেন, এই অণুজীবগুলো আসলে সক্রিয়। অনেকেই ভাবতে পারেন এরা নিশ্চয়ই নিষ্ক্রিয় স্পোরের মতো। কিন্তু আমরা DNA বিশ্লেষণ করে দেখেছি, এরা ধীরে হলেও সক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আরও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এরা মাটির নিচে বেশ প্রভাবশালী। কিছু ক্ষেত্রে তারা মাটির জৈব সমাজের ৫০% বা তার বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে, যা উপরিভাগের মাটিতে কখনও দেখা যায় না।
এই অণুজীব কীভাবে পানি পরিশোধন করে?
মাটি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক পানি পরিশোধক। যখন পানি মাটির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন ফিজিক্যাল, রাসায়নিক ও জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় তা পরিষ্কার হয়। উপরিভাগের মাটি, যেখানে গাছের মূল থাকে, তার ভলিউম কম এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত তা অতিক্রম করে যায়। কিন্তু গভীর মাটির পরিমাণ বেশি, এবং এখানেই CSP1-3 কাজ করে। উপরিভাগ থেকে নেমে আসা কার্বন ও নাইট্রোজেন ব্যবহার করে তারা পানিকে আরও বিশুদ্ধ করে তোলে।
এরপর কী?
গবেষকরা এসব অণুজীবকে ল্যাবরেটরিতে চাষ করতে চান। যদি তা সম্ভব হয়, তবে তাদের অদ্বিতীয় শারীরবৃত্তীয় গঠন সম্পর্কে আরও জানা যাবে, যা তাদের এই চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে। তবে এটি মোটেই সহজ কাজ নয়। অধিকাংশ অণুজীব চাষযোগ্য নয়, কারণ তাদের বাসস্থান অনুকরণ করা কঠিন।
উদাহরণ হিসেবে, CSP1-3 এর পূর্বপুরুষরা যেহেতু গরম প্রস্রবণে বাস করত, তাই টাইডজির ল্যাব চেষ্টা করছে বেশি তাপমাত্রায় তাদের চাষ করতে।
CSP1-3-এর শারীরবৃত্তীয় গঠন ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া একেবারে আলাদা। তাই তাদের মধ্যে এমন কিছু জিন থাকতে পারে যেগুলো আমাদের জন্য অন্যভাবে উপযোগী হতে পারে। যেমন, তারা হয়তো কঠিন দূষণকারী পদার্থ ভাঙতে সক্ষম। যদি সেটা জানা যায়, তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সমস্যাগুলোর একটি সমাধানে এগিয়ে যেতে পারব।
———
Diversification, niche adaptation, and evolution of a candidate phylum thriving in the deep Critical Zone, Proceedings of the National Academy of Sciences (2025).
DOI: 10.1073/pnas.2424463122
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


