নতুন শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক শেষবার বাজারে এসেছিল প্রায় তিন দশক আগে। তবে ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের ফলে শীঘ্রই এই চিত্র বদলে যেতে পারে।
গবেষক জেরি রাইটের নেতৃত্বাধীন একটি দল এমন এক শক্তিশালী অণু (molecule) চিহ্নিত করেছেন, যা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালি ড্রাগ-রেজিসট্যান্স ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও মোকাবিলা করতে পারে। এই নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের নাম দেওয়া হয়েছে লারিওসিডিন (lariocidin)। গবেষণার ফলাফল ২৬ মার্চ ২০২৫ তারিখে Nature জার্নালে প্রকাশিত হয়।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের (AMR) বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ
২০২১ সালে জীবাণুদের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ প্রতিরোধের ক্ষমতার কারণে সারা বিশ্বে ১১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০৫০ সাল পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়ে ১৯ লাখ হতে পারে।
নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের এই আবিষ্কার খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণু ধীরে ধীরে প্রচলিত ওষুধকে অকার্যকর করে তুলছে। এই প্রক্রিয়াকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বলা হয়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সংকট।
ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ও বায়োমেডিকেল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক এবং মাইকেল জি. ডিগ্রুট সংক্রামক রোগ গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক জেরি রাইট বলেন, “আমাদের প্রচলিত ওষুধগুলো ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারাচ্ছে, কারণ ব্যাকটেরিয়া দিন দিন আরও বেশি প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। প্রতি বছর প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের কারণে মারা যায়, এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।”
লারিওসিডিন: ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণের নতুন উপায়
রাইট এবং তার দল দেখেছেন যে নতুন এই লারিওসিডিন (এক ধরনের ল্যাসো পেপটাইড) ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করার অন্যান্য অ্যানিবায়োটিক থেকে আলাদা এক নতুন কৌশল ব্যবহার করে। এটি ব্যাকটেরিয়ার রাইবোজোমের সাথে সংযুক্ত হয় এবং ট্রান্সফার আরএনএ-কেও (tRNA) আটকে দেয়, যা রাইবোজোমকে পেপটাইড চেইন তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড সরবরাহ করে। এই প্রক্রিয়ায়, ল্যারিওসিডিন ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক কোড সঠিকভাবে পড়তে বাধা দেয় এবং কোডকে বিকৃত করে, ফলে প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া এলোমেলো হয়ে যায়। ফলে আর বাড়তে পারে না।
রাইট বলেন, “এটি একটি নতুন অণু এবং এটি ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করার সম্পূর্ণ নতুন উপায় ব্যবহার করে। এটি আমাদের জন্য বিশাল একটি অগ্রগতি।”
মাটির ব্যাকটেরিয়া থেকে পাওয়া এই শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক
গবেষকরা Paenibacillus নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থেকে লারিওসিডিন আবিষ্কার করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, এই ব্যাকটেরিয়াটি পাওয়া গেছে কানাডার হ্যামিল্টন শহরের একটি বাড়ির উঠানের মাটি থেকে।
তারা প্রায় এক বছর ধরে পরীক্ষাগারে এই মাটির ব্যাকটেরিয়াগুলো বৃদ্ধি করতে দিয়েছিলেন, যাতে ধীরগতিতে বৃদ্ধি পাওয়া ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও চিহ্নিত করা যায়। এই পরীক্ষার সময় তারা দেখলেন যে Paenibacillus ব্যাকটেরিয়া এমন এক বিশেষ পদার্থ তৈরি করছে, যা অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে পারে—এমনকি সেই ব্যাকটেরিয়াগুলোও, যেগুলো সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করতে পারে।
গবেষণার আরেক সদস্য মনোজ জংরা, যিনি রাইটের ল্যাবে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন, বলেন, “যখন আমরা বুঝতে পারলাম কীভাবে এই নতুন অণু অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে, সেটি আমাদের জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত ছিল।”
লারিওসিডিন: মানবদেহের জন্য নিরাপদ এবং কার্যকর
গবেষকরা লারিওসিডিন নিয়ে আশাবাদী, কারণ এটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের জন্য সম্ভাবনাময় মনে হচ্ছে:
- এটি মানব কোষের জন্য বিষাক্ত নয়।
- প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর।
- প্রাণীর সংক্রমণ মডেলেও এটি সফলভাবে কাজ করেছে।
পরবর্তী ধাপ: ওষুধে পরিণত করার চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে রাইট এবং তার দল লারিওসিডিনকে আরও উন্নত করার জন্য কাজ করছেন, যাতে এটি বড় পরিসরে উৎপাদন করা যায় এবং ক্লিনিকাল ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত করা যায়। তবে গবেষকরা বলছেন, যেহেতু এটি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক পদার্থ, তাই এটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য অনেক গবেষণা ও উন্নয়নের প্রয়োজন হবে।
রাইট বলেন, “আবিষ্কারের সেই প্রথম মুহূর্তটি ছিল রোমাঞ্চকর, তবে এখনই আসল কঠিন কাজ শুরু হয়েছে। আমাদের এখন এই অণুটিকে বিশ্লেষণ করে নতুনভাবে সাজাতে হবে, যাতে এটি আরও কার্যকর একটি ওষুধে পরিণত হতে পারে।”
এই গবেষণা অ্যান্টিবায়োটিক গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
———
A broad-spectrum lasso peptide antibiotic targeting the bacterial ribosome, Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-08723-7
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


