বিশ্বব্যাপী দূষণ এখন এক ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে। দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপে শহরের বাতাস প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে। বিশ্বের অধিকাংশ বড় শহরেই এখন শ্বাস নেওয়ার জন্য বিশুদ্ধ বাতাস যেন একটি বিরল সম্পদে পরিণত হয়েছে। বৃক্ষ আমাদের প্রাকৃতিক অক্সিজেন সরবরাহকারী হলেও ঘনবসতিপূর্ণ শহরে যথেষ্ট পরিমাণ গাছ লাগানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে লিকুইড ট্রি বা তরল গাছ প্রযুক্তি মানুষের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
লিকুইড ট্রি মূলত একটি কৃত্রিম ফটোবায়োরিয়্যাক্টর, যেখানে পানিতে শৈবাল (মাইক্রোঅ্যালগি) ভাসমান অবস্থায় রাখা হয়। এই শৈবালগুলো সূর্যের আলো কিংবা কৃত্রিম LED আলোর সাহায্যে ফটোসিনথেসিস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। ফলে বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই অক্সাইড শোষিত হয় এবং অক্সিজেন উৎপন্ন হয়। গবেষণা অনুসারে, মাইক্রোঅ্যালগি গাছের তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ৫০ গুণ বেশি দক্ষতার সঙ্গে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে।
একটি লিকুইড ট্রিতে সাধারণত ১১০ লিটার পানি থাকে, যার মধ্যে বিশেষ প্রজাতির মাইক্রোঅ্যালগি ভাসে। পুরো সিস্টেমটি পরিচালিত হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং দূরনিয়ন্ত্রিত সেন্সরের মাধ্যমে। এতে করে যন্ত্রটির কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণও হয় তুলনামূলকভাবে সহজ। সৌরশক্তি কিংবা বিদ্যুৎ—উভয়ভাবেই এটি চালানো সম্ভব। প্রতি ৮০–১০০ দিন অন্তর শুধুমাত্র শৈবাল সংগ্রহ ও পানি রিফিল করলেই নতুন করে যন্ত্রটি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রকৃত গাছ অবশ্যই পরিবেশের জন্য অপরিহার্য, তবে শহরের কংক্রিট জঙ্গলে নতুন গাছ লাগানো অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় মাইক্রোঅ্যালগি প্রযুক্তির বিশেষ কিছু সুবিধা রয়েছে। মাইক্রোঅ্যালগি সহজে নষ্ট হয় না এবং পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে। এগুলো উচ্চ বা নিম্ন তাপমাত্রাতেও কার্যকরভাবে টিকে থাকে এবং সাধারণত পোকামাকড় বা ভারী ধাতুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। যেহেতু এদের জন্য মাটির প্রয়োজন নেই, তাই ছোট জায়গাতেও এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয়। শহুরে অবকাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মতোভাবে লিকুইড ট্রিকে ডিজাইন করা হয়েছে, ফলে এটি কেবল প্রযুক্তিগতভাবে নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও কার্যকর সমাধান হয়ে উঠতে পারে।
লিকুইড ট্রি শহরের নানা স্থানে ব্যবহার করা যায়। পার্ক, ফুটপাত বা জনবহুল খোলা জায়গায় এটি বসানো সম্ভব। একইসঙ্গে অফিস, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা হাসপাতাল ও জিমের মতো ইনডোর জায়গাতেও এটি কার্যকর হতে পারে। এছাড়া শপিং মল, সিনেমা হল বা রেস্টুরেন্টে লিকুইড ট্রি বসিয়ে বাতাসকে পরিশুদ্ধ করা যায়। এমনকি বিমানবন্দর, রেলস্টেশন কিংবা মেট্রো স্টেশনের মতো ভিড়ভাট্টার জায়গাতেও এটি ব্যবহারযোগ্য, যেখানে প্রকৃত গাছ লাগানোর সুযোগ প্রায় নেই।
লিকুইড ট্রির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো বায়ু শুদ্ধকরণ। এটি কেবল কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করেই থেমে থাকে না, বরং বাতাসে বিদ্যমান ভিএওসি (VOC), ধুলাবালি, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এর ফলে শহুরে পরিবেশে শ্বাস নেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ হয়। শুধু তাই নয়, অক্সিজেনসমৃদ্ধ পরিবেশে মানুষ আরও মনোযোগী হয়ে ওঠে, মানসিক চাপ কমে এবং কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
শৈবাল থেকে সংগৃহীত বায়োমাসও মানুষের কাজে লাগতে পারে। এটি ব্যবহার করা যায় জৈব সার, মাছের খাবার, বায়োফুয়েল, কসমেটিকস এবং ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে। ফলে লিকুইড ট্রি কেবল বাতাস পরিশোধনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক ও শিল্পখাতেও এর ব্যবহারিক গুরুত্ব রয়েছে।
ভবিষ্যতের জন্য এই প্রযুক্তির সম্ভাবনাও অপরিসীম। গবেষকরা মনে করেন, লিকুইড ট্রি প্রযুক্তি একদিন বর্জ্য পানির শোধন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হতে পারে। মহাকাশ গবেষণায় এটি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে, যেখানে অক্সিজেন ও খাদ্য উৎপাদনের বিকল্প উপায় প্রয়োজন। একইসঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মূল্যবান রাসায়নিক যৌগ উৎপাদনেও এর ব্যবহার হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ বায়ুদূষণের কারণে মারা যায়। এর মধ্যে একটি বড় অংশ ইনডোর দূষণের শিকার। দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে আগামী দিনে বায়ুদূষণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে লিকুইড ট্রি কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং টেকসই নগর জীবনের জন্য অপরিহার্য সমাধান হয়ে উঠতে পারে।
প্রকৃত গাছের বিকল্প কিছুই হতে পারে না—এটি সত্য। তবে যখন শহুরে পরিবেশে নতুন গাছ লাগানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, তখন লিকুইড ট্রি কার্যকর সমাধান হয়ে উঠতে পারে। এটি আমাদের ভবিষ্যৎ শহরের জন্য কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং একধরনের টিকে থাকার কৌশল। আগামী দিনের নগর পরিকল্পনায় লিকুইড ট্রি যদি অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে একদিন হয়তো আমরা দূষণমুক্ত শহরে স্বাচ্ছন্দ্যে শ্বাস নিতে পারব।
সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োরিসোর্সেস টেকনোলজি অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল বায়োটেকনোলজি ল্যাব, গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র (আরআইসি) এবং বাংলাদেশ সরকারের ইডিজিই প্রকল্পের সহযোগিতায় সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ও স্থানীয় অ্যালগি ব্যবহার করে লিকুইড ট্রি-এর একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়েছে।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


