মানব জিনোমের প্রায় এক-দশমাংশে প্রাচীন ভাইরাস সংক্রমণের অবশিষ্টাংশ হিসেবে ভাইরাসের ডিএনএ (Viral DNA)-এর ছোট ছোট অংশ রয়েছে। এই ডিএনএ অংশগুলিকে এন্ডোজেনাস রেট্রোভাইরাস (ERVs) বলা হয়, যা কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মে স্থানান্তরিত ও পরিবর্তিত হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে এই ভাইরাল ডিএনএ-এর বেশিরভাগই ক্ষয়ে গেছে এবং এখন আর কার্যকর নয় বলে মনে করা হয়। একে হরহামেশাই “জাঙ্ক ডিএনএ” বলা হয়ে থাকে। তবে কিছু ভাইরাসজনিত জিন এখনও আংশিকভাবে অক্ষত অবস্থায় মানব জিনোমে থেকে গেছে।
একটি নতুন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের জিনোমে থাকা প্রাচীন ভাইরাসের ডিএনএ জিনের কাজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষকরা MER11 নামের একটি নির্দিষ্ট ডিএনএ ফ্যামিলি নিয়ে কাজ করেছেন এবং দেখিয়েছেন, এই অংশগুলো কিভাবে মানব ভ্রূণের শুরুর দিককার বিকাশে জিন চালু ও বন্ধ করার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।
এই ধরনের ডিএনএ অংশকে বলা হয় ট্রান্সপোজেবল এলিমেন্টস (TEs), যেগুলো মূলত পুরনো ভাইরাস থেকে উৎপন্ন এবং ‘কপি-পেস্ট’ পদ্ধতিতে সারা জিনোমে ছড়িয়ে পড়েছে। আজ মানব জিনোমের প্রায় অর্ধেকই এই TEs দিয়ে তৈরি। আগে ভাবা হতো এগুলো কোনো কাজের না, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, কিছু TEs আসলে “জেনেটিক সুইচ” হিসেবে কাজ করে, মানে আশেপাশের জিনগুলো কখন সক্রিয় হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে।
তবে MER11-এর মতো নতুন এবং অল্প-পরিচিত TE-গুলোকে বোঝা কঠিন, কারণ এদের গঠন অনেকটা অন্যরকম এবং আগে ভালোভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি।
এই সমস্যা কাটাতে গবেষকরা একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তারা MER11 উপাদানগুলোকে তাদের বিবর্তনীয় সম্পর্ক এবং প্রাইমেট প্রাণীদের মধ্যে সংরক্ষণের ভিত্তিতে ভাগ করেন। এতে MER11 কে চারটি উপশ্রেণিতে ভাগ করা যায়: MER11_G1 থেকে G4 (G1 পুরনো, G4 সবচেয়ে নতুন)।
এই নতুন শ্রেণিবিন্যাসের ফলে অনেক অজানা জিন নিয়ন্ত্রণ প্যাটার্ন ধরা পড়ে। তারা দেখতে পান, এই নতুন শ্রেণি আগের তুলনায় অনেক ভালোভাবে জিন-নিয়ন্ত্রণের বাস্তব চিত্র বোঝাতে সক্ষম।
এটা পরীক্ষার জন্য তারা lentiMPRA (lentiviral massively parallel reporter assay) নামের একটি পরীক্ষার পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এতে হাজার হাজার ডিএনএ টুকরো একসঙ্গে কোষে ঢুকিয়ে দেখা হয় কোনটি কতটা জিন-সক্রিয়তা বাড়াতে পারে। তারা প্রায় ৭,০০০ MER11 সিকোয়েন্স মানুষ ও অন্যান্য প্রাইমেটের ওপর ব্যবহার করেন এবং মানব স্টেম সেল ও নিউরাল কোষে তাদের প্রভাব পরিমাপ করেন।
ফলাফলে দেখা যায়, MER11_G4 সবচেয়ে বেশি জিন অ্যাক্টিভ করতে পারে। এতে বিশেষ কিছু “মোটিফ (motif)” বা ছোট ছোট ডিএনএ সিকোয়েন্স থাকে, যেগুলোতে ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (জিন চালু/বন্ধ করার প্রোটিন) যুক্ত হতে পারে। এই মোটিফগুলো বিকাশ ও পরিবেশগত সংকেত অনুযায়ী জিনের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
আরও বিশ্লেষণে দেখা যায়, মানুষের, শিম্পাঞ্জির এবং মাকাক বানরের MER11_G4 অংশগুলোতে সময়ের সঙ্গে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। মানুষের ও শিম্পাঞ্জির ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় মিউটেশন ঘটেছে, যা স্টেম সেলে এই ডিএনএ অংশের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করেছে। গবেষণার প্রধান লেখক ড. জুন চেন জানান, “এই পরিবর্তনের ফলে MER11_G4 নতুন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্জন করেছে এবং এটাই বিভিন্ন প্রজাতির পার্থক্য তৈরি করতে ভূমিকা রেখেছে।”
এই গবেষণা দেখিয়েছে কীভাবে “জাঙ্ক” ডিএনএ বিবর্তনের মাধ্যমে একসময় জীববিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। গবেষকরা বলছেন, “আমাদের জিনোম অনেক আগেই সিকোয়েন্স করা হয়েছে, কিন্তু এর অনেক অংশের কাজ এখনও অজানা।” এই ভাইরাস-উৎপত্তি TEs ভবিষ্যতে জীববিজ্ঞানের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে বলে তারা আশাবাদী।
———
A phylogenetic approach uncovers cryptic endogenous retrovirus subfamilies in the primate lineage, Science Advances (2025).
DOI: 10.1126/sciadv.ads9164
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


