অস্ট্রিয়ান সন্ন্যাসী গ্রেগর জোহান মেন্ডেল ১৬০ বছরেরও বেশি আগে মটরশুঁটির সাতটি বৈশিষ্ট্য (যেমন বীজ ও ফলের আকার, রঙ ইত্যাদি) মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা করে বংশগতির উপর তাঁর যুগান্তকারী কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। কিন্তু এতদিন পরেও বিজ্ঞানীরা এখনও মটরশুঁটির ওই সাতটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে তিনটির জন্য সুনির্দিষ্ট কোন জিন দায়ী, তা নির্ধারণ করতে পারেননি।
২৩ এপ্রিল, ২০২৫ এ Nature জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা মেনডেলের এই গুরুত্বপূর্ণ গল্পে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছেন, যা হয়তো মটরশুঁটির জিনোম সংক্রান্ত গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।
২০১৯ সালে Pisum sativum (মটরশুঁটি) উদ্ভিদের জন্য একটি রেফারেন্স জিনোম প্রকাশ করা হয়। এটি ছিল ডিজিটালভাবে উপস্থাপিত উদ্ভিদটির ডিএনএ সিকোয়েন্স। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির প্ল্যান্ট জেনেটিসিস্ট ক্লেয়ার কোয়েন বলেন, “এটা ছিল একটি বিশাল অগ্রগতি। তবে আমি বলব [সাম্প্রতিক গবেষণাটি] আরও বড় সাফল্য। এটা সত্যিই একটি অসাধারণ প্রচেষ্টা।”
প্রাচীন রহস্যের সমাধানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে সাফল্য
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ‘সিটিজেন সায়েন্টিস্ট’ মেন্ডেল প্রায় ২৮,০০০টি মটরশুঁটি গাছের সংকরায়ণ করে পরীক্ষা করেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মে বৈশিষ্ট্য কীভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে যায়। সে সময় ‘জিন’ ধারণাটি তখনও আবিষ্কৃত হয়নি, তবুও মেনডেল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে উদ্ভিদগুলো তাদের সন্তানদের মধ্যে কিছু ‘বংশগত উপাদান’ পাঠায় যা নির্ধারণ করে তারা কোন বৈশিষ্ট্য পাবে—যা আজকে আমরা ‘ডমিন্যান্ট’ ও ‘রিসেসিভ’ জিন বা অ্যালিল হিসেবে জানি। আজও বিজ্ঞানীরা এই মেনডেলীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করছেন এবং হাজার হাজার এমন বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যেও চিহ্নিত হয়েছে। তবে অনেক বৈশিষ্ট্য এখনও নির্দিষ্ট কোন জিনের সাথে সম্পর্কিত করা যায়নি—মেনডেলের সাতটি মটর বৈশিষ্ট্যের তিনটিও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
গবেষণাটির গবেষক এবং যুক্তরাজ্যের নরউইচে অবস্থিত জন ইনেস সেন্টারের (JIC) ফসলজ জেনেটিসিস্ট নোয়াম চায়ুট, জানান যে এই দীর্ঘস্থায়ী রহস্য তাদের আগ্রহ জাগিয়েছিল। তিনি বলেন, “আমরা মনে করেছি জিনোম সিকোয়েন্সিং ও কম্পিউটেশনাল টুলগুলো এখন এতটাই উন্নত যে এই শেষ তিনটি জিনের রহস্য আমরা এবার বুঝতে পারব।”
JIC-এর জার্মপ্লাজম রিসোর্স ইউনিট ব্যবহার করে (যেখানে ৩,৫০০-রও বেশি মটরের জাত সংরক্ষিত রয়েছে এবং সঙ্গে পাবলিকলি অ্যাক্সেসযোগ্য জেনোমিক ডেটাসেট) তারা প্রায় ৭০০টি মটরের জিনোম সংগ্রহ করে গভীরভাবে সিকোয়েন্স করেন। এসব জিনোমে প্রায় ১৫ কোটি ৫০ লাখ ‘সিঙ্গেল নিউক্লিওটাইড পলিমরফিজম’ (SNP) পাওয়া যায়—যা হলো ডিএনএ সিকোয়েন্সের একক বেস-জোড়ার পার্থক্য, যেগুলো স্ট্যান্ডার্ড বা রেফারেন্স Pisum sativum জেনোমের সাথে তুলনা করে ধরা পড়ে।
বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে (যার মধ্যে ছিল মটরগাছের বাছাইকৃত সংকরায়ণ এবং জিনোম-ওয়াইড অ্যাসোসিয়েশন স্টাডি (GWAS), যা প্রতিটি জিনোমে SNP-এর সংখ্যা ও অবস্থানের পার্থক্য খোঁজে) গবেষক দল অবশেষে বাকি থাকা তিনটি বৈশিষ্ট্যের সাথে সংশ্লিষ্ট জিন শনাক্ত করেন। নির্দিষ্টভাবে, তারা দেখেছেন যে মটরের ফল বা শুঁটির রঙ একটি জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় যা ক্লোরোফিল তৈরির প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, ফলে শুঁটি হয় সবুজ বা হলুদ রঙের। তাঁরা আরও দুটি জিন চিহ্নিত করেছেন যেগুলো সম্ভবত কোষ প্রাচীর ঘন হওয়ার প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে শুঁটির আকার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। আর একটি নির্দিষ্ট জিনের জেনেটিক কোডে একটি অংশ মুছে গেলে গাছে ফুলের শাখা বা গুচ্ছ গঠনে পরিবর্তন আসে — যাকে বলে fasciation।
দীর্ঘ পথচলা
এই বিভিন্ন পদ্ধতি একত্র করে গবেষণার কাজ শেষ করতে সময় লেগেছে ছয় বছর। চায়ুট বলেন, “এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সুন্দর দিক হলো একসাথে কাজ করা।”
সাউথ ক্যারোলিনার ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ প্রজননবিদ জেনা হার্শবার্গার বলেন, এই গবেষণা যেন তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শেখা Punnett square-এর পাঠগুলোকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। (Punnett square হলো এমন একটি চিত্র, যা অভিভাবকদের জিনের ভিত্তিতে সন্তানের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য পাওয়ার সম্ভাবনা পূর্বানুমান করতে ব্যবহৃত হয়।) তিনি বলেন, “গবেষকরা শুধু একটি ঐতিহাসিক রহস্যই সমাধান করেননি, বরং এমন একটি সমৃদ্ধ তথ্যভাণ্ডারও তৈরি করেছেন যা শুধু ভবিষ্যতের মটরশুঁটি নিয়ে গবেষণার জন্য নয়, বরং ব্যবহারিক প্রজননের ক্ষেত্রেও কাজে আসবে।”
এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের সাথে জিন সংযোগ করার পাশাপাশি, দলটি আরও ৭২টি গুরুত্বপূর্ণ মটরের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেছেন। চায়ুট বলেন, এই উন্মুক্ত ডেটাসেটে এখনও অগণিত তথ্য রয়েছে যা বিশ্লেষণ করার অপেক্ষায় আছে। মটর প্রোটিনের বাজার বর্তমানে বিকল্প প্রোটিন উৎসগুলোর মধ্যে দ্রুততম হারে বাড়ছে, আর গবেষকরা আরও ফলনশীল মটর উদ্ভিদ তৈরির উপায় জানতে চান। উদাহরণস্বরূপ, চায়ুট আগ্রহী শুঁটির আকার, গাছের উৎপাদনক্ষমতা ও বীজের প্রোটিন উপাদানের সাথে সম্পর্কিত জিন নিয়ে গবেষণায়। আর কোয়েন আগ্রহী রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে কাজ করা জিন শনাক্ত করতে।
চায়ুট বলেন, “একজন ফলিত বিজ্ঞানী হিসেবে আমি সবচেয়ে বেশি আগ্রহী এই গবেষণার ফলাফলগুলো ব্যবহার করে কীভাবে আমাদের ফসল উন্নত ও সংরক্ষণ করা যায়, সেটা জানার প্রতি। আর এই ডেটা দিয়ে সত্যিই অসংখ্য কাজ করা সম্ভব।”
———
Genomic and genetic insights into Mendel’s pea genes. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-08891-6
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


