সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু প্রাণঘাতী ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীরা যদি কোভিড-১৯-এর জন্য এমআরএনএ ভিত্তিক ভ্যাকসিন নিয়ে থাকেন, তাহলে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি দিন বেঁচে থাকেন যারা এই ভ্যাকসিন নেননি তাদের চেয়ে।
গবেষণায় দেখা যায়, এই অতিরিক্ত বেঁচে থাকার কারণ শুধুমাত্র কোভিড প্রতিরোধ নয়; বরং ভ্যাকসিনটি শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে (রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা) সক্রিয় করে তোলার কারণে ঘটেছে। এই সক্রিয় ইমিউন প্রতিক্রিয়া ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর’ নামের ওষুধগুলোর কার্যকারিতা বাড়িয়ে তোলে, এমন ইঙ্গিত দিয়েছে প্রাণীদেহে করা পরীক্ষাগুলো।
হিউস্টনের এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টারের রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট অ্যাডাম গ্রিপিন বলেন, “কোভিড-১৯-এর এমআরএনএ ভ্যাকসিন যেন একটা অ্যালার্ম বাজানোর মতো কাজ করে, এটি পুরো শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে তোলে, এমনকি টিউমারের ভেতরেও, যেখানে এটি ক্যানসার কোষ ধ্বংসের প্রতিক্রিয়া শুরু করে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের রোগীদের ক্ষেত্রে ফলাফল দেখে আমরা বিস্মিত।”
গবেষক দল এখন এই ফলাফল যাচাইয়ের জন্য একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করার পরিকল্পনা করছে। তারা মনে করেন, এটি এমআরএনএ প্রযুক্তির আরও অপ্রকাশিত ক্ষমতার দিক উন্মোচন করছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণায় প্রায় ৫০ কোটি ডলার তহবিল কেটে দিয়েছে।
ক্যানসার থেরাপির সঙ্গে ভ্যাকসিনের সহাবস্থান
‘চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর’ ওষুধ শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে ক্যানসার কোষ আক্রমণে উন্মুক্ত করে দেয়। এগুলো অনেক ক্যানসারের চিকিৎসায় বিপ্লব এনেছে, তবে অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়, কারণ কিছু রোগীর ইমিউন সিস্টেম যথেষ্ট সক্রিয় হয় না।
এই সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন পার্সোনালাইজড ক্যানসার ভ্যাকসিন নিয়ে, যা রোগীর নিজস্ব ক্যানসার কোষের জিনগত মিউটেশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। এগুলো এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে, ব্যয়বহুল ও কম সহজলভ্য।
গ্রিপিন ও তার দল ভাবলেন, এমআরএনএ ভ্যাকসিনের সাধারণ ইমিউন সক্রিয়তা হয়তো ক্যানসার থেরাপির প্রভাব বাড়াতে পারে। ইঁদুরের উপর পরীক্ষায় এর সমর্থন মেলে, এরপর তারা মানুষের চিকিৎসা রেকর্ড বিশ্লেষণ করেন।
আশ্চর্যজনক ফলাফল
১,০০০-র বেশি ফুসফুস ও মেলানোমা ক্যানসার রোগীর রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক ধরনের ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এমআরএনএ ভ্যাকসিন নেওয়া রোগীদের গড় বেঁচে থাকা সময় ২১ মাস থেকে বেড়ে ৩৭ মাসে পৌঁছেছে।
মেলানোমা রোগীদের মধ্যে যারা ভ্যাকসিন নেননি তারা গড়ে ২৭ মাস বেঁচেছেন, আর ভ্যাকসিন নেওয়া রোগীরা এতদিন বেঁচে ছিলেন যে গবেষণা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের গড় হিসাবও করা যায়নি।
সবচেয়ে বেশি উপকার পেয়েছেন তারা, যাদের টিউমারে এমন বৈশিষ্ট্য ছিল যা সাধারণত চেকপয়েন্ট থেরাপিতে ভালো সাড়া দেয় না।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউমার ইমিউনোলজিস্ট বেনোয়া ভ্যান ডেন এন্ডে বলেন, “এই ফলাফল সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমি এত বড় প্রভাব আশা করিনি, কিন্তু ডেটা অত্যন্ত শক্তিশালী।”
সঠিক সময়ের গুরুত্ব
যেসব রোগী চিকিৎসা শুরু করার ১০০ দিনের মধ্যে ভ্যাকসিন নিয়েছিলেন, তারা অন্যদের তুলনায় বেশি উপকার পেয়েছেন। গ্রিপিনের মতে, চিকিৎসার আগে বা পরে ৩০ দিনের মধ্যে ভ্যাকসিন নিলে ফলাফল আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে এই সুবিধা দেখা যায়নি ইনফ্লুয়েঞ্জা বা নিউমোনিয়ার মতো নন-এমআরএনএ ভ্যাকসিনে, কিংবা যারা অন্য ধরণের ক্যানসার থেরাপি নিয়েছিলেন তাদের ক্ষেত্রে।
ইঁদুরের উপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, এমআরএনএ ভ্যাকসিনের ফ্যাট-ভিত্তিক ন্যানোপার্টিকল শরীরে প্রবেশ করে কোষে ঢুকে ইমিউন সিস্টেমকে জোরালোভাবে সক্রিয় করে। এর ফলে ‘কিলার সেল’ বা হত্যাকারী কোষগুলো টিউমার শনাক্ত ও ধ্বংস করতে শেখে, যা পরে চেকপয়েন্ট ইনহিবিটরের সহায়তায় আরও কার্যকর হয়।
বিতর্কিত প্রযুক্তি, সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ
গবেষকদের মতে, এমআরএনএ কোভিড ভ্যাকসিনের মতো সহজলভ্য ও তুলনামূলক সস্তা প্রযুক্তি বিভিন্ন ক্যানসারে বেঁচে থাকার সময় বাড়াতে পারে।
তবে এর মানে এই নয় যে, পার্সোনালাইজড ক্যানসার ভ্যাকসিনের গবেষণা বন্ধ হওয়া উচিত। বরং, যদি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়, তাহলে দুই ধরনের ভ্যাকসিন একসঙ্গে ব্যবহার করা যেতে পারে, একটি সাধারণ ইমিউন প্রতিক্রিয়া জাগাতে এবং অন্যটি নির্দিষ্টভাবে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই শেখাতে।
কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্ক ও তহবিল সংকট এই গবেষণাকে থামিয়ে দিতে পারে। এমডি অ্যান্ডারসনের অনকোলজিস্ট স্টিভেন লিন বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি রোগীদের ওপর প্রভাব ফেলছে, কারণ ‘এমআরএনএ’ শব্দটিই এখন অনেকের কাছে কলঙ্কিত। আমরা যেন ডিমের খোসার ওপর হাঁটছি, এত নেতিবাচক প্রচারণার কারণে।”
———
SARS-CoV-2 mRNA vaccines sensitize tumours to immune checkpoint blockade. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09655-y
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


