অর্গ্যাজম (Orgasm) বা যৌন চরমসুখ বা সেক্সুয়াল ক্লাইম্যাক্স হল যৌন প্রতিক্রিয়া চক্রের এমন একটি পর্যায়, যখন যৌন উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে হঠাৎ শেষ হয়। এ সময় পেলভিক অঞ্চলের পেশিগুলো ছন্দবদ্ধভাবে সংকুচিত হয় এবং ব্যক্তি তীব্র যৌন আনন্দ অনুভব করেন।
পুরুষদের ক্ষেত্রে অর্গ্যাজম সাধারণত বীর্যপাতের সঙ্গে একই সময়ে ঘটে। তবে অর্গ্যাজম ও বীর্যপাত দুটি আলাদা শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুটো একসঙ্গে ঘটলেও সব সময় এমনটা হয় না। অর্থাৎ, বীর্যপাত ছাড়াও অর্গ্যাজম হতে পারে। একইভাবে, বীর্যপাত ঘটলেও অর্গ্যাজমের অনুভূতি নাও হতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে অর্গ্যাজমের অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন। একজন নারী অর্গ্যাজমের সময় অত্যন্ত তীব্র যৌন আনন্দ অনুভব করতে পারেন। হস্তমৈথুনের সময় কিংবা একজন বা একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে যৌন কার্যকলাপের মাধ্যমেও অর্গ্যাজম হতে পারে। তবে যৌন কার্যকলাপের সময় অর্গ্যাজমের অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যৌন কার্যকলাপের সময় প্রায় ৬৫ শতাংশ বা তারও কম নারী অর্গ্যাজমে পৌঁছান। অন্যদিকে, পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ১০০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়। যদিও গবেষণার ধরন, অংশগ্রহণকারীদের বৈশিষ্ট্য এবং যৌন কার্যকলাপের সংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করে এই পরিসংখ্যানের তারতম্য হতে পারে।
বাংলাদেশে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রতিনিধিত্বমূলক সমীক্ষার তথ্য না থাকায় দেশের নারীদের মধ্যে অর্গ্যাজমের অভিজ্ঞতা কতটা প্রচলিত, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ, যৌনশিক্ষার অভাব এবং নারীর যৌন আনন্দ সম্পর্কে সীমিত সচেতনতার কারণে অনেক নারী অর্গ্যাজম সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা পান না বলে মনে করা হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে অর্গ্যাজমের অভিজ্ঞতা অর্জন তো দূরের কথা, অর্গ্যাজম বলতে কী বোঝায়, সে সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা থাকে না।
বায়োফিডব্যাক ভাইব্রেটর থেকে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে করা একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, নারীদের অর্গ্যাজমের ধরন তিনটি (ফিজিওলজিক্যালি)। উল্লেখ্য, এর আগের গবেষণাগুলোতেও অর্গ্যাজমের তিনটি ধরন শনাক্ত করা হয়েছিল, যেগুলো Type I, Type II এবং Type IV নামে পরিচিত। মজার বিষয় হলো, Type III কেবল সিসজেন্ডার পুরুষদের (cis-men) মধ্যে এবং Type IV কেবল সিসজেন্ডার নারীদের (cis-women) মধ্যে দেখা গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে আগের গবেষণাগুলোর সীমাবদ্ধতা ছিল। সেগুলোর বেশিরভাগই অল্পসংখ্যক অংশগ্রহণকারীর ওপর পরিচালিত হয়েছিল এবং সংগৃহীত তথ্যের পরিমাণও ছিল সীমিত। এ ছাড়া, এসব ধরন নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা না হওয়ায় ফলাফলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ছিল কম।
নতুন গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ব্লুটুথের মাধ্যমে সংযুক্ত করা যায় এমন একটি বিশেষ ডিলডো দেওয়া হয়। এই যন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা অর্গ্যাজমকে তিনটি স্বতন্ত্র ধরনে শ্রেণিবদ্ধ করেন। ধরনগুলো হলো Wave, Avalanche এবং Volcano। নামগুলো শুনতে মজার হলেও অর্গ্যাজমের সময় পেলভিক অঞ্চলের পেশিতে সংকোচনের যে ভিন্ন ভিন্ন ধরন দেখা যায়, সেগুলোর সঙ্গে নামগুলোর বেশ ভালো মিল রয়েছে।
স্মার্ট ভাইব্রেটরটি তৈরি করে লায়নেস হেল্থ (Lioness Health) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে অর্গ্যাজমের এই তিনটি ধরন শনাক্ত করার দাবি করেছিল। এবার The Journal of Sexual Medicine জার্নালে প্রকাশিত নতুন গবেষণাটির ফলাফল তাদের আগের দাবির পক্ষে আরও প্রমাণ হাজির করেছে বলে মনে হচ্ছে।
তুলনামূলক ছোট পরিসরে পরিচালিত এই গবেষণায় ৫৪ জন নারী অংশ নেন। লায়নেস ভাইব্রেটর ব্যবহার করে তাঁদের হস্তমৈথুনের সময়কার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর গবেষকেরা এমন পরিস্থিতিতে অর্গ্যাজমের তথ্য বিশ্লেষণ করেন, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা নিজের হাতে বা অন্য কোনো উপায়ে অতিরিক্ত উদ্দীপনা না দিয়ে কেবল ডিলডোটি ব্যবহার করেছিলেন। গবেষণায় এই অবস্থাকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ (control) পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গবেষক দলটি তাদের গবেষণাপত্রে পরীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে লিখেছে, “অর্গ্যাজমের পরিস্থিতিতে অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে নিজে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে অর্গ্যাজমে পৌঁছানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অর্গ্যাজম হওয়ার দুই মিনিট পর যন্ত্রটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। একইভাবে, নিজে কোনো উদ্দীপনা সৃষ্টি না করে কেবল ডিলডো ব্যবহার করেও একই পরীক্ষা করা হয়েছিল। এর ফলে অর্গ্যাজম ঠিক কখন ঘটেছে এবং যন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ধরনে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছিল। যেহেতু পেলভিক অঞ্চলের ছন্দবদ্ধ পেশি সংকোচন অর্গ্যাজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, তাই বিশ্লেষণে এই অংশটির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।”
লায়নেসের তৈরি স্মার্ট সেক্স টয়গুলোতে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর রয়েছে। এসব সেন্সরের মাধ্যমে চাপ শনাক্ত করার পাশাপাশি তাপমাত্রা পরিমাপ করা যায়। যন্ত্রগুলোতে জাইরোস্কোপ ও অ্যাক্সিলোমিটারও রয়েছে, যেগুলো যন্ত্রের অবস্থান, নড়াচড়া এবং গতির পরিবর্তন শনাক্ত করতে সাহায্য করে। ব্লুটুথের মাধ্যমে এসব সেন্সর থেকে তথ্য প্রথমে স্মার্টফোনে এবং পরে সার্ভারে পাঠানো হয়। গবেষণায় ব্যবহৃত ডিলডোগুলো থেকে এভাবেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।
সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা অর্গ্যাজমের যে তিনটি ধরন শনাক্ত করেছেন, সেগুলো লায়নেসের আগের অনুসন্ধানে বর্ণিত ধরনগুলোর সঙ্গে মিলে যায় বলে মনে হয়।
A wave: এই ধরনের অর্গ্যাজমে পেলভিক অঞ্চলের পেশি অল্প সময়ের জন্য ছন্দবদ্ধভাবে সংকুচিত হয়। পেলভিক ফ্লোরের পেশির সংকোচন ও প্রসারণের একটি নির্দিষ্ট ছন্দের মাধ্যমে এই ধরনটি প্রকাশ পায়।
A volcano: এই ধরনের অর্গ্যাজমে পেলভিক ফ্লোরের পেশির প্রসারণ ক্রমশ বাড়তে থাকে। এরপর প্রসারণের মাত্রা আরও বেড়ে যাওয়ার ঠিক আগের পর্যায়ে অর্গ্যাজম ঘটে।
An avalanche: এই ধরনের অর্গ্যাজমে হস্তমৈথুনের সময়জুড়ে পেলভিক ফ্লোরের পেশিতে তুলনামূলক বেশি মাত্রার প্রাথমিক বা স্বাভাবিক সংকোচন বজায় থাকে। এই ধারাবাহিক সংকোচনের সঙ্গে সম্পর্কিত পেশির কার্যকলাপের ধরন থেকেই অর্গ্যাজমটি আলাদা করে শনাক্ত করা হয়।
লায়নেসের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে শনাক্ত করা অর্গ্যাজমের এই তিনটি ধরন সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের দেওয়া বিবরণেও আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। এসব বিবরণ থেকে অর্গ্যাজমের সময় পেশির সংকোচনের ধরন এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য থাকতে পারে, সে সম্পর্কে আরও ধারণা পাওয়া সম্ভব।
ক্রেডিট: Lioness
একজন ‘Wave’ ধরনের অর্গ্যাজমের অভিজ্ঞতা অর্জনকারী নারীর বর্ণনা: “অর্গ্যাজমের সময় মনে হয়, আমি যেন সমুদ্রের ওপর ভাসছি। আনন্দের ঢেউ একের পর এক বারবার এসে আছড়ে পড়ে।”
ক্রেডিট: Lioness
একজন ‘Volcano’ ধরনের অর্গ্যাজমের অভিজ্ঞতা অর্জনকারী নারীর বর্ণনা: “আমার শরীরের প্রায় প্রতিটি পেশি টানটান হয়ে ওঠে। পুরো শরীরজুড়ে আনন্দের অনুভূতি তীব্র হতে থাকে। এরপর আসে এক বিশাল মুক্তির অনুভূতি। আমি বুঝতে পারি অর্গ্যাজম শেষ হয়েছে, যখন শরীর আবার শিথিল হতে শুরু করে এবং স্বস্তি অনুভব করি।”
ক্রেডিট: Lioness
একজন ‘Avalanche’ ধরনের অর্গ্যাজমের অভিজ্ঞতা অর্জনকারী নারীর বর্ণনা: “আমার শরীর কাঁপতে শুরু করে। এরপর হঠাৎ প্রচণ্ড যৌন উত্তেজনার বিস্ফোরণ ঘটে। আমার শরীর বারবার ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে এবং পেশিতে একধরনের খিঁচুনি হয়, যদিও অনুভূতিটা আনন্দদায়ক। পেশিগুলো শিথিল হওয়া পর্যন্ত এভাবে বারবার চলতে থাকে। একসময় শরীর শান্ত হতে শুরু করে।”
নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ‘Wave’ ধরনের অর্গ্যাজম। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫৪ জন নারীর মধ্যে ২৬ জনের অর্গ্যাজম এই ধরনের ছিল। এরপর ছিল ‘Avalanche’ ধরনের অর্গ্যাজম, যার অভিজ্ঞতা হয়েছিল ১৭ জনের। সবচেয়ে কম দেখা গেছে ‘Volcano’ ধরনের অর্গ্যাজম। এই ধরনের অর্গ্যাজমের অভিজ্ঞতা হয়েছিল ১১ জনের।
গবেষণা এবং লায়নেসের নিজস্ব অনুসন্ধান, উভয় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নারীদের অর্গ্যাজমের ধরন একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হলেও একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে ধরনটি ধারাবাহিকভাবে একই থাকে। অর্থাৎ, একজন নারী সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধরনের অর্গ্যাজম অনুভব করেন। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তাঁর অর্গ্যাজমের ধরন অন্য ধরনে পরিবর্তিত হয় না। বিষয়টিকে রক্তের গ্রুপের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যেমন, একজন ‘Volcano’ ধরনের অর্গ্যাজমের অভিজ্ঞতা অর্জনকারী নারী ‘Avalanche’ ধরনের অর্গ্যাজম অনুভব করবেন না বলে গবেষণায় দেখা গেছে। ব্যতিক্রম থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও, গবেষণা বা লায়নেসের নিজস্ব অনুসন্ধানে এমন কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি।
———
Women’s Orgasms Determined by Autodetection of Pelvic Floor Muscle Contractions Using the Lioness “Smart” Vibrator. The Journal of Sexual Medicine (2022).
DOI: 10.1016/j.jsxm.2022.05.011
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।





