বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো পুরো মস্তিষ্কজুড়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাকচার, মাইটোকন্ড্রিয়ার একটি মানচিত্র তৈরি করেছেন—যা বার্ধক্যজনিত মস্তিষ্কের রোগ বোঝার নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।
গবেষণার ফলাফল দেখিয়েছে যে কোষের শক্তি উৎপন্ন করা মাইটোকন্ড্রিয়া মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে প্রকারভেদ ও ঘনত্বের দিক থেকে আলাদা। উদাহরণস্বরূপ, বিবর্তনীয়ভাবে প্রাচীন মস্তিষ্কের অংশগুলিতে মাইটোকন্ড্রিয়ার ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে কম, যেখানে নতুন অঞ্চলে এটি বেশি।
গবেষকরা এই মানচিত্রকে “মাইটোব্রেইনম্যাপ (MitoBrainMap)” নামে অভিহিত করেছেন, যা প্রযুক্তিগতভাবে চমকপ্রদ এবং ধারণাগতভাবে যুগান্তকারী বলে মন্তব্য করেছেন জার্মানির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখের স্নায়ুবিজ্ঞানী ভ্যালেন্টিন রিডল।
কোষ থেকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত
নিউ ইয়র্ক সিটির কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোবায়োলজিস্ট এবং গবেষণার গবেষণা মার্টিন পিকার্ড বলেন, “মস্তিষ্কের জীববিদ্যা এখন শক্তির গতিবিধির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত বলে আমরা জানি।” উল্লেখযোগ্যভাবে, মানবদেহের মোট শক্তির ২০% ব্যয় হয় শুধুমাত্র মস্তিষ্কের কার্যক্রমের জন্য।
গবেষকরা এক ৫৪ বছর বয়সী হৃদরোগে কারণে মৃত দাতার হিমায়িত মস্তিষ্কের একটি অংশকে ৭০৩টি ছোট ছোট ঘনক্ষেত্রে বিভক্ত করেন। প্রতিটি ঘনক্ষেত্র ছিল ৩ × ৩ × ৩ মিলিমিটার আকারের, যা সাধারণত মস্তিষ্কের ৩ডি ইমেজিংয়ে ব্যবহৃত এককগুলোর সমান। পিকার্ড বলেন, “এই গবেষণায় সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ ছিল এতগুলো নমুনা বিশ্লেষণ করা।”
ক্রেডিট: Martin Picard/Columbia University Vagelos College of Physicians and Surgeons
গবেষকরা বায়োরাসায়নিক ও জৈব-আণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি নমুনায় মাইটোকন্ড্রিয়ার ঘনত্ব নির্ধারণ করেছেন। কিছু নমুনায়, তারা মাইটোকন্ড্রিয়ার শক্তি উৎপাদনের দক্ষতা পরিমাপ করেছেন।
গবেষণার ফলাফল একটি নির্দিষ্ট মস্তিষ্কের নমুনার গণ্ডি ছাড়িয়ে নিতে, গবেষকরা একটি মডেল তৈরি করেন যা সম্পূর্ণ মস্তিষ্কজুড়ে মাইটোকন্ড্রিয়ার সংখ্যা ও ধরন প্রেডিক্ট পারে। তারা এই মডেলে মস্তিষ্ক-ইমেজিং ডেটা এবং মস্তিষ্ক-ঘনক্ষেত্রের তথ্য যুক্ত করেন। পরীক্ষা চালানোর পর দেখা যায়, মডেলটি অন্যান্য নমুনার মাইটোকন্ড্রিয়ার বিন্যাস নির্ভুলভাবে অনুমান করতে সক্ষম।
মস্তিষ্কের গাইডবুক
এই মডেল থেকে দেখা যায় যে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মাইটোকন্ড্রিয়ার ঘনত্ব ও কার্যক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। গবেষকরা দেখতে পান, নিউরনের মূল গঠন দ্বারা গঠিত গ্রে ম্যাটারে মাইটোকন্ড্রিয়ার ঘনত্ব হোয়াইট ম্যাটারের তুলনায় ৫০% বেশি। এছাড়া, গ্রে ম্যাটারের মাইটোকন্ড্রিয়া শক্তি উৎপাদনে বেশি দক্ষ। বিশেষ করে, বিবর্তনের ধারায় সরীসৃপ থেকে প্রাইমেট পর্যন্ত বিকশিত হওয়া কর্টেক্সের গ্রে ম্যাটারের মাইটোকন্ড্রিয়া অত্যন্ত কার্যকরী শক্তি উৎপাদনকারী।
এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোবিজ্ঞানী নাটালি রোশেফোর্ট বলেন, “বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে কিছু মানসিক রোগ ও বয়সজনিত স্নায়ুরোগের প্রাথমিক পর্যায়েই মাইটোকন্ড্রিয়ার পরিবর্তন ঘটে।” নতুন এই মানচিত্র বিজ্ঞানীদের জন্য মাইটোকন্ড্রিয়ার পরিবর্তন বিশেষভাবে দুর্বল মস্তিষ্ক অঞ্চলে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ দেবে।
গবেষকরা বলছেন, মাইটোকন্ড্রিয়ার বৈচিত্র্য এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে এর পার্থক্য পুরোপুরি বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজন। তারা ইতোমধ্যে ৫০০টি মানব মস্তিষ্কের ৯টি অঞ্চলের উপর একটি বৃহৎ গবেষণা শুরু করেছেন, যা নিউরোলজিক্যাল, মেন্টাল এবং নিউরোডিজেনারেটিভ রোগে আক্রান্ত ও সুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে মাইটোকন্ড্রিয়ার পার্থক্য নির্ণয়ে সাহায্য করবে।
———
A human brain map of mitochondrial respiratory capacity and diversity. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-08740-6
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



