নেপচুন সৌরজগতের সবচেয়ে দূরবর্তী, শীতল ও অন্ধকার সীমান্তে অবস্থিত, যা সূর্য থেকে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে।
প্রথমবারের মতো, নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ নেপচুনের উজ্জ্বল অরোরার ছবি ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। অরোরা তখনই ঘটে, যখন সূর্য থেকে আসা শক্তিশালী কণা কোনো গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রে আটকে যায় এবং এর আপার বায়ুমণ্ডলে আঘাত হানে। এই সংঘর্ষ থেকে নির্গত শক্তি আকাশে উজ্জ্বল আভা সৃষ্টি করে।
এর আগে, ১৯৮৯ সালে নাসার ভয়েজার ২ মহাকাশযান নেপচুনের পাশ দিয়ে উড়ে যাবার সময় এর অরোরা থাকার ক্ষীণ ইঙ্গিত দিয়েছিলো। তবে বৃহস্পতি, শনি ও ইউরেনাসে অরোরার সফল সনাক্ত হলেও, নেপচুনের ক্ষেত্রে তা এতদিন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। সৌরজগতের বৃহৎ গ্রহগুলোর মধ্যে নেপচুনই ছিল অরোরা শনাক্তকরণ পাজলের হারিয়ে যাওয়া টুকরো।
নর্থাম্ব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গবেষক হেনরিক মেলিন বলেন, “আসলে নেপচুনের অরোরার ছবি ধারণ করা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র ওয়েবের নিখুঁত নিয়ার-ইনফ্রারেড সংবেদনশীলতা থাকার কারণে।” গবেষণাটি তিনি ইউনিভার্সিটি অব লেস্টারে থাকাকালীন পরিচালনা করেন। তিনি আরও বলেন, “শুধু অরোরাই দেখতে পাওয়া নয়, বরং এর বিশদ ও স্বচ্ছ চিত্র আমাকে বিস্মিত করেছে।” গবেষণাটি Nature Astronomy জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
২০২৩ সালের জুন মাসে ওয়েবের নিয়ার-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফ (NIRSpec) ব্যবহার করে এই ডেটা সংগ্রহ করা হয়। শুধু নেপচুনের চিত্রই নয়, বিজ্ঞানীরা এর হায়ার বায়ুমন্ডলের (আয়নমণ্ডল) রাসায়নিক গঠন ও তাপমাত্রা নির্ণয়ের জন্য স্পেকট্রাম সংগ্রহ করেন। প্রথমবারের মতো, তারা H₃⁺ (ট্রাইহাইড্রোজেন ক্যাটায়ন) নামক অনু থেকে শক্তিশালী নির্গমনরেখা দেখতে পান, যা সাধারণত অরোরার সময় তৈরি হয়। ওয়েবের ছবিতে, নেপচুনের অরোরা উজ্জ্বল নীলচে সাইয়ান রঙের ছোপ হিসেবে দেখা যায়।
ক্রেডিট: Henrik Melin et al/Nature Astronomy (2025)
ওয়েব ইন্টারডিসিপ্লিনারি বিজ্ঞানী, এবং গ্যারান্টেড টাইম অবজারভেশন প্রোগ্রামের লিডার হেইডি হ্যামেল ব্যাখ্যা করেন, “H₃⁺ হলো বৃহস্পতি, শনি ও ইউরেনাসের অরোরার পরিচিত চিহ্ন, এবং আমরা আশা করেছিলাম এটি নেপচুনেও থাকবে। তবে এতদিন গ্রাউন্ড-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণে সেটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কেবল ওয়েবের মতো শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমেই আমরা অবশেষে এটি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি।”
নেপচুনের অরোরার একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হলো, এটি পৃথিবী, বৃহস্পতি বা শনির মতো মেরু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। বরং, এটি ভৌগোলিকভাবে নেপচুনের মধ্য অক্ষাংশে দেখা যায়।
এর কারণ হলো নেপচুনের অদ্ভুত চৌম্বক ক্ষেত্র, যা ১৯৮৯ সালে ভয়েজার ২ আবিষ্কার করেছিল। এটি গ্রহের ঘূর্ণন অক্ষে ৪৭ ডিগ্রি কৌণিকভাবে হেলে আছে। যেহেতু অরোরার সৃষ্টি হয় বায়ুমণ্ডলের কোথায় বা কতটুকু চৌম্বক ক্ষেত্র কভার, তাই নেপচুনের ক্ষেত্রে এটি মেরু থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে।
নেপচুনের অরোরার এই যুগান্তকারী আবিষ্কার আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে যে, কীভাবে এর চৌম্বক ক্ষেত্র সূর্য থেকে আসা চার্জযুক্ত কণার সাথে ইন্টার্যাক্ট করে এবং কীভাবে তা সৌরজগতের সুদূরবর্তী অঞ্চলে প্রভাব ফেলে।
ওয়েব পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা নেপচুনের আপার বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রাও পরিমাপ করেছেন, যা ১৯৮৯ সালে ভয়েজার ২-এর পর প্রথমবারের মতো সম্ভব হলো। ফলাফল, এতদিন নেপচুনের অরোরা অদৃশ্য থাকান সম্ভাব্য কারণের ব্যাপারে কিছুটা ইঙ্গিত প্রদান করে।
“আমি অবাক হয়েছি—নেপচুনের আপার বায়ুমন্ডল কয়েক শ ডিগ্রি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ২০২৩ সালে এর তাপমাত্রা ১৯৮৯ সালের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।” বলেন মেলিন।
এর আগে বিজ্ঞানীরা ভয়েজার ২-এর ডেটার ওপর ভিত্তি করে নেপচুনের অরোরার তীব্রতা অনুমান করেছিলেন। কিন্তু যদি তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তবে অরোরা অনেক বেশি ম্লান হয়ে যাবে। তাই এতদিন বিজ্ঞানীরা এটি শনাক্ত করতে পারেননি। এই আকস্মিক ঠাণ্ডা অবস্থা দেখায় যে, নেপচুনের আয়নমণ্ডলীয় স্তর সময়ের সাথে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, পৃথিবীর তুলনায় ৩০ গুণ বেশি দূরে থাকার পরও।
এই নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন নেপচুনের পুরো সৌরচক্র (১১ বছর) জুড়ে পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে চান। এটি নেপচুনের অদ্ভুত চৌম্বক ক্ষেত্রের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে এবং কেন এটি এতটা হেলে রয়েছে তার কারণ উন্মোচন করতে পারে।
———
Discovery of H3+ and infrared aurorae at Neptune with JWST, Nature Astronomy (2025).
DOI: 10.1038/s41550-025-02507-9
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



