গবেষকরা লেজার ও ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের চোখের রেটিনায় নির্দিষ্ট কোষগুলিকে আলাদাভাবে সক্রিয় করে পাঁচজন মানুষের চোখে একেবারে নতুন একটি রঙ দেখাতে সক্ষম হয়েছেন — যা এর আগে কোনো মানুষের চোখে দেখা যায়নি। এই নীল-সবুজ রঙটির উজ্জ্বলতা বা ‘স্যাচুরেশন’ এমন স্তরে পৌঁছেছে, যা মানুষের স্বাভাবিক রঙ দেখার সীমার বাইরে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইরভিন) রঙ-দর্শন বিজ্ঞানী কিম্বারলি জেমসন এই কাজটিকে “প্রযুক্তিগতভাবে অসাধারণ” এবং “একটি ব্যতিক্রমী অর্জন” বলে মন্তব্য করেছেন।
এটি প্রথমবার নয় যে গবেষকরা চোখের ফটোরিসেপ্টর কোষ (কন কোষ) গুলিকে আলাদাভাবে উদ্দীপ্ত করেছেন। তবে এবার তারা চোখের এমন একটি বড় অংশে এটি করেছেন, যা দৃষ্টির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। পর্তুগালের ব্রাগায় ইউনিভার্সিটি অব মিনহোর দৃষ্টিবিদ্যাবিশেষজ্ঞ সার্জিও ন্যাসিমেন্তো বলেন, “এই গবেষণায় নতুন বিষয় হলো, সত্যিই এমন নতুন রঙ মানুষের চোখে দেখা যেতে পারে — তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।”
স্যাচুরেশন লেভেল চার্টের বাইরে
গতকাল ১৮ এপ্রিল, ২০২৫-এ Science Advances জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই নতুন রঙের নাম দিয়েছেন ‘ওলো (olo)’। এটি কিছুটা ময়ূরের পালকের মতো নীল-সবুজ হলেও, তার উজ্জ্বলতা একেবারে প্রচলিত মাত্রার বাইরে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও দৃষ্টি গবেষক রেন এনজি, যিনি গবেষণার গবেষক এবং পরীক্ষার একজন অংশগ্রহণকারীও, বলেন, “এর স্যাচুরেশন লেভেল তো চার্টেই আসে না!”
এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘Oz’, এবং এটি ‘Wizard’ নামের একটি সফটওয়্যার দ্বারা পরিচালিত হয়। এটি রেটিনার প্রতিটি কোষে নিখুঁত পরিমাণে আলোর ডোজ পাঠিয়ে মস্তিষ্কের রঙ বোঝার প্রক্রিয়াকে ধোঁকা দেয় — এমনকি এমন সংকেতও সৃষ্টি করে যা আগে চোখ দেখা যায়নি।
এনজি বলেন, এই প্রযুক্তি দিয়ে আরও নতুন রঙ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এমনকি যারা কালার ব্লাইন্ড, যাদের জন্য কার্যকর চিকিৎসা নেই, তারাও এর মাধ্যমে রঙের পার্থক্য বুঝতে সক্ষম হতে পারেন।
তবে, এটি বাস্তবায়নে অনেক কাজ বাকি। এখন পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে চোখের একেবারে ছোট একটি অংশে রঙ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এবং এই প্রযুক্তি খুব সীমিত আকারে শুধুমাত্র ল্যাবেই পাওয়া যায়। কিন্তু ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা না গেলেও, যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজ্যুয়াল নিউরোসায়েন্টিস্ট জেনি বোস্টেন বলেন, “এটি প্রযুক্তিগত দিক থেকে অত্যন্ত চমৎকার একটি অর্জন। ভবিষ্যৎ গবেষণার অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।”
আলোর ফিঙ্গারপ্রিন্ট
মানুষের রঙ দেখার ক্ষমতা নির্ভর করে মস্তিষ্কে তিন ধরনের কন কোষ থেকে পাওয়া সংকেতের তুলনার ওপর। এস (S) কন নীল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোতে সবচেয়ে বেশি সাড়া দেয়, এম (M) কন সবুজ আলোতে, এবং এল (L) কন লাল তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বেশি সংবেদনশীল। এই তিন কনের নির্দিষ্ট মাত্রার সক্রিয়তাই একটি নির্দিষ্ট রঙের অনুভূতি তৈরি করে — অনেকটা আঙুলের ছাপ বা কো-অর্ডিনেটের মতো।
ক্রেডিট: BenRG/Wikimedia Commons
এম কন চোখের রঙ দর্শনের মাঝখানে থাকায়, একে সক্রিয় করলে সাধারণত এস ও এল কনও সক্রিয় হয়ে যায়। কিন্তু এনজি ও তার দল ভাবলেন, যদি শুধু এম কনকেই আলাদা করে উদ্দীপ্ত করা যায়, তাহলে কি নতুন কোনো রঙ সৃষ্টি হবে?
তারা প্রথমে প্রতি অংশগ্রহণকারীর রেটিনা স্ক্যান করে প্রতিটি কনের অবস্থান চিহ্নিত করেন। তারপর লেজার দিয়ে শুধুমাত্র এম কনগুলিকে আলতোভাবে উদ্দীপ্ত করেন। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়, তারা যেটি দেখছেন, সেটির সঙ্গে একক তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কোনো আলো মেলাতে। কিন্তু কোনো মিল পাওয়া যায়নি — ওলো (olo) রঙটি স্বাভাবিক দৃষ্টির সবচেয়ে উজ্জ্বল নীল-সবুজ রঙ থেকেও বেশি তীব্র। এনজি বলেন, অংশগ্রহণকারীদের এই ওলো রঙকে ‘প্রাকৃতিক রঙে’ নামিয়ে আনতে সাদা আলো মেশাতে হয়েছিল।
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজ্যুয়াল নিউরোসায়েন্টিস্ট আনিয়া হার্লবার্ট বলেন, “এভাবে রেটিনাকে উদ্দীপ্ত করার ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।”
রঙের মায়া
Oz প্রযুক্তি শুধু একটি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ব্যবহার করেই অংশগ্রহণকারীদের চোখে বিভিন্ন রঙ দেখাতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন কনকে বিভিন্ন মাত্রায় উদ্দীপ্ত করে এমন একটি সিগন্যাল তৈরি করা হয়েছে, যা মস্তিষ্ক সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট রঙ দেখলে রিঅ্যাক্ট করে। ফলে একটি লেজার দিয়েই পুরো রঙিন ভিডিও দেখানো সম্ভব হয়েছে।
গবেষকরা এখন এই পদ্ধতি ব্যবহার করে বর্ণান্ধদের দৃষ্টি উন্নত করার চেষ্টা করছেন। সবচেয়ে প্রচলিত বর্ণান্ধদ মানুষের মাত্র দুটি কন ঠিকভাবে কাজ করে। স্পাইডার মানকির ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, জিন থেরাপি দিয়ে তৃতীয় কন যোগ করলে তারা পূর্ণ রঙদর্শন ক্ষমতা অর্জন করে। এনজি আশা করেন, লেজার দিয়ে নির্দিষ্ট কোষে আলো নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিমভাবে তৃতীয় কন তৈরি করা যাবে। “তাহলে মস্তিষ্ক তিনটি চ্যানেলের তথ্য পাবে। প্রশ্ন হলো, তা দিয়ে কি মস্তিষ্ক পূর্ণ রঙ দেখতে পারবে?” — বলেন তিনি।
জেমসন বলেন, এই গবেষণা চোখ থেকে মস্তিষ্কে যাওয়া রঙের সংকেতের রহস্য উন্মোচনে সহায়তা করতে পারে এবং দেখার ক্ষমতা কতটা বাড়ানো সম্ভব — তা যাচাই করতে পারে। “এই প্রযুক্তি দিয়ে যেভাবে মানুষের দৃষ্টি নিয়ে পরীক্ষা করা যাচ্ছে, তা অন্য কোনো মানবভিত্তিক টুলে সম্ভব হয়নি,” — বলেন তিনি।
———
Novel color via stimulation of individual photoreceptors at population scale, Science Advance (2025).
DOI: 10.1126/sciadv.adu1052
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



