ডায়ার উলফ বা ডায়ার নেকড়ে (Aenocyon dirus) ছিল এক ভয়ংকর ক্যানিড প্রজাতি, যা অতীতে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় বিচরণ করত। এই প্রজাতির অস্তিত্ব মিলেছিল প্রায় ১,২৫,০০০ বছর আগে থেকে শুরু করে ১০,০০০ বছর আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ প্লাইস্টোসিন যুগের শেষ প্রান্ত এবং হলোসিন যুগের প্রারম্ভে। ১৮৫৮ সালে প্রথম জীবাশ্ম আবিষ্কারের চার বছর পরে এই প্রজাতির নামকরণ করা হয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এদের দুটি উপপ্রজাতি চিহ্নিত করেছেন—Aenocyon dirus guildayi এবং Aenocyon dirus dirus।
ডায়ার নেকড়ের জীবাশ্মের বৃহত্তম সংগ্রহ লস অ্যাঞ্জেলেসের বিখ্যাত র্যাঞ্চো লা ব্রেয়া টার পিটসে পাওয়া গেছে। যদিও তারা বাস্তবে বিলুপ্ত হলেও লোককথা এবং সাহিত্যে তাদের উপস্থিতি আজও জীবন্ত। জর্জ আর. আর. মার্টিনের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘A Song of Ice and Fire’ (যার উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে ‘Game of Thrones’), ডায়ার নেকড়েকে নতুন করে জনপ্রিয় করে তোলে। এই গল্পে স্টার্ক পরিবারের প্রতীক এবং পরিবারের প্রতিটি সন্তানের একেকটি ডায়ার নেকড়ে ছিলো।
বেশি বড়, মোটা গা, গাঢ় রঙের লোম, এবং প্রচণ্ড শক্তিশালী চোয়ালসহ এরা দেখতে ছিল আধুনিক ধূসর নেকড়ের মতো হলেও আকারে অনেকটাই বিশাল ও বেশি ভয়ংকর। তাদের খাদ্যতালিকায় ছিল হিমযুগীয় বাইসন, ঘোড়া এমনকি ম্যামথের মতো বিশালকায় প্রাণীও। ধারণা করা হয়, প্রায় ১০,০০০ বছর আগে এই প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়: ডায়ার নেকড়ে ফিরে এসেছে?
২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Colossal Biosciences ঘোষণা দেয়, তারা সফলভাবে তিনটি ‘ডায়ার নেকড়ে’ সদৃশ বাচ্চার জন্ম দিতে পেরেছে। তাদের নাম রাখা হয়েছে রমুলাস, রেমাস এবং খালেসি।
প্রশ্ন হলো, এই নবজাত বাচ্চাগুলো কি সত্যিই বিলুপ্ত Aenocyon dirus? আদতেই কি ডায়ার নেকড়ের পুনর্জন্ম ঘটেছে? নাকি এটি শুধুই বিজ্ঞানের আরেকটি অনুকরণ কৌশল?
ডায়ার নেকড়ে ফিরেছে—নাকি ফিরিয়ে আনার অভিনয়?
যারা মনে করছেন, বিজ্ঞানীরা আসল Aenocyon dirus প্রজাতিকে ফিরিয়ে এনেছেন, তারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। বাস্তবতা হলো, এই নতুন বাচ্চাগুলো সম্পূর্ণভাবে ধূসর নেকড়ের জিনগত রূপান্তর মাত্র। অর্থাৎ এরা জেনেটিক এবং শ্রেণিবিন্যাসের দিক থেকে Canis lupus, Aenocyon dirus নয়। মূল ডায়ার নেকড়েকে এখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তবে কেন এত আলোচনা, এত দাবি?
তাহলে কি কারণে ফিরিয়ে আনা গেল না ডায়ার নেকড়েকে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে ১৯৯৬ সালে, যখন প্রথম স্তন্যপায়ী প্রাণী ‘ডলি’ ভেড়ার ক্লোন তৈরি করা হয়েছিল। প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে সহজ—প্রথমে দাতার কোষ থেকে নিউক্লিয়াস সংগ্রহ করে তা একই প্রজাতির একটি ডিম্বাণুতে বসানো হয়। তারপর সেই নিষিক্ত কোষ রাখা হয় সারোগেট মায়ের গর্ভে, এবং জন্ম হয় ক্লোন ডলির।
কিন্তু বিলুপ্ত প্রাণীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অনেক জটিল। কারণ সেখানে কোনো জীবিত কোষ বা পূর্ণাঙ্গ জিনোম থাকে না। প্রাচীন ডিএনএ সাধারণত খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ হয়, ফলে তাকে কাজে লাগিয়ে পুরো প্রাণী তৈরি করা কঠিন। তাহলে Colossal কী করেছে?
যা তারা করেছে, তা হলো জেনেটিক অনুকরণ
Colossal Biosciences প্রথমে ১৩,০০০ বছর পুরনো ডায়ার নেকড়ের দাঁত এবং ৭২,০০০ বছর পুরনো একটি খুলি থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে। বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ধূসর নেকড়ের সঙ্গে ডায়ার নেকড়ের জিনগত পার্থক্য খুঁজে পান, যার মধ্যে ২০টির মতো জিন ছিল এই পার্থক্যের মূল উৎস। এই জিনগুলোই ডায়ার নেকড়ের অনন্য বৈশিষ্ট্য তৈরি করত—যেমন দৈত্যাকার দেহ, সাদা গাঢ় লোম, চওড়া কপাল, ধারালো দাঁত, ভয়াল গর্জন।
এরপর বিজ্ঞানীরা CRISPR-Cas9 প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধূসর নেকড়ের ডিএনএ-তে ডায়ার নেকড়ের এই নির্দিষ্ট জিনগুলো প্রতিস্থাপন করেন। CRISPR একধরনের “জেনেটিক কাঁচি”, যা ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশ কেটে সেখানে নতুন তথ্য বসাতে সক্ষম। ঠিক যেভাবে একটি ভুল বানান ঠিক করতে ওয়ার্ড ডকুমেন্টে কাট-পেস্ট করা হয়, তেমনই।
এই প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানীরা মারাত্মক সতর্কতার সাথে এগিয়েছেন। একটি ভুল জিন প্রবেশ করালেই অন্ধত্ব, বধিরতা বা অন্য কোনো বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারত। ধূসর নেকড়ের তিনটি রঙ নিয়ন্ত্রণকারী জিন ঠিকভাবে প্রতিস্থাপন করতে না পারলে জটিলতা সৃষ্টি হতো।
সব ঠিক থাকলে, সম্পাদিত কোষ থেকে নিউক্লিয়াস বের করে ধূসর নেকড়ের ডিম্বাণুতে বসানো হয়। তারপর ক্লোন করা নিষিক্ত কোষগুলো স্থানান্তর করা হয় কুকুরের গর্ভে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সারোগেট মা হিসেবে গৃহপালিত কুকুর ব্যবহৃত হয়েছে।
কুকুর? নেকড়ে নয়? কেন?
কারণ ধূসর নেকড়ে একটি বন্য প্রজাতি, যাদের গর্ভধারণ করানো কঠিন। তারা স্ট্রেসে ভোগে, আগ্রাসী হয়ে ওঠে, এবং গবেষণার জন্য উপযুক্ত পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে না। অপরদিকে গৃহপালিত কুকুর জেনেটিকভাবে ধূসর নেকড়ের সঙ্গে ৯৯.৯৯% মিল রাখে, এবং গর্ভকালীন সময়, শরীরের গঠন ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও প্রায় এক।
ফলে কুকুরের গর্ভেই জন্ম নেয় দুটি বাচ্চা—রমুলাস ও রেমাস, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে। পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে খালেসি নামের আরেকটি শাবক জন্মায়।
এই শাবকরা আসলে কে?
এই তিনটি বাচ্চা সম্পূর্ণরূপে ধূসর নেকড়ে, তবে তাদের জিনের মধ্যে ডায়ার নেকড়ের কিছু বৈশিষ্ট্য ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, Aenocyon dirus ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি—শুধু তার কিছু চেহারা ও আচরণগত গুণাবলি আধুনিক নেকড়ের শরীরে বসানো হয়েছে।
তাহলে পুরো ডায়ার নেকড়ে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব কেন? – এর প্রধান কারণ হলো, এখন পর্যন্ত ডায়ার নেকড়ের সম্পূর্ণ জিনোম মানচিত্র (genome sequence) আমাদের হাতে নেই। তা পাওয়াও প্রায় অসম্ভব, কারণ প্রাচীন ডিএনএ ক্ষয়প্রাপ্ত, এবং কার্যকর কোষ তো নেই-ই। জিনোম থাকলেও, তা কোথায় বসাবো? তাছাড়া এমন ডিম্বাণু বা গর্ভাশয় নেই যা Aenocyon dirus-এর মতো প্রাণী তৈরি করতে পারে।
এছাড়াও, শুধুমাত্র ডিএনএ থাকলেই প্রাণী তৈরি হয় না। দরকার এপিজেনেটিক (epigenetic) তথ্য, যা নির্ধারণ করে কোন জিন কখন চালু হবে বা বন্ধ থাকবে। এই তথ্য আমাদের কাছে ডায়ার নেকড়ের ক্ষেত্রে একেবারেই অজানা।
তাহলে কি এই গবেষণার সবই ব্যর্থ?
একেবারেই না। Colossal Biosciences-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও খ্যাতিমান জেনেটিক বিজ্ঞানী ড. জর্জ চার্চ বলছেন, এটি ডি-এক্সটিংশন বা বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি একটি সাহসী সূচনা।
Colossal গবেষণায় আরও একাধিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছে। যেমন, তারা ধূসর নেকড়ের রক্ত থেকে এন্ডোথেলিয়াল প্রোজেনিটর কোষ (EPCs) সংগ্রহের একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি করেছে, যা ক্লোনিং ও জিন সম্পাদনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে।
এই অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতে তারা ম্যামোথ, তাসমানিয়ান টাইগারসহ আরও অনেক বিলুপ্ত প্রাণীকে ফিরে আনার চেষ্টা করবে।
Colossal-এর উপদেষ্টা অ্যান্ড্রু পাস্ক বলেন, “ডায়ার নেকড়ের এই প্রকল্পটি দেখিয়ে দিয়েছে যে, মানুষের হাতে এখন প্রকৃতির হারানো বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার শক্তি রয়েছে।”
কলোসাল বায়োসায়েন্সেস আরও জানায়, তারা নতুন একটি ‘নন-ইনভেসিভ ব্লাড ক্লোনিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করে বিপন্ন প্রজাতির লাল নেকড় (Canis rufus)-এর দুইটি ক্লোনজাত বংশ উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া গতমাসে (মার্চ ২০২৫) তারা জিন সম্পাদনার মাধ্যমে ম্যামথের মতো বৈশিষ্ট্যযুক্ত “উলি মাউস” বা লোমশ ইঁদুরের জন্ম দিয়েছে।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


