চিনি বহুদিন ধরেই মানুষের স্বাদের অনুভূতিকে মুগ্ধ করে আসছে—সেইসাথে জনস্বাস্থ্যের জন্য হয়ে উঠেছে এক বিশাল ঝুঁকি। এবার বিজ্ঞানীরা এই আকর্ষণের পেছনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে পেয়েছেন।
নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক দল প্রথমবারের মতো মানুষের মিষ্টি স্বাদগ্রাহী রিসেপ্টরের আণবিক গঠন চিহ্নিত করেছে এবং দেখিয়েছে যে বহুল ব্যবহৃত দুটি কৃত্রিম সুইটনার (সুক্রালোজ ও অ্যাসপারটেম) কীভাবে এই রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাকে সক্রিয় করে। গবেষণাপত্রটি গত ৭ মে, ২০২৫ এ Cell জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এটি আমাদের স্বাদ উপলব্ধির পেছনের জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবান্ধব কোমল পানীয়, চুইংগাম ও মিষ্টিজাত খাবার তৈরির পথ খুলে দিতে পারে।
গবেষণার প্রধান, নিউরোবিজ্ঞানী চার্লস জুকার বলেন, “এই একটি মাত্র রিসেপ্টরই আমাদের চিরকালীন চিনি-প্রীতির জন্য দায়ী। এখন আমরা এর গঠন জানি, তাই হয়তো আমরা এর কার্যক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজে পেতে পারি।” অর্থাৎ, এমন যৌগ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে যা এই রিসেপ্টরের কার্যপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে স্বাদগ্রহণের ধরন পাল্টে দিতে পারে।
আণবিক গঠনের খোঁজে
ফলমূল থেকে শুরু করে মিষ্টি দই—যে কোনো খাবার যা চিনি বা তার বিকল্প ধারণ করে, তা আমাদের জিভের মিষ্টি রিসেপ্টরকে সক্রিয় করে তোলে এবং মস্তিষ্কে একধরনের সংকেত পাঠায় ডেটা রিওয়ার্ড পাবার মতো।
২০০১ সালে জুকার ও তার দল প্রথম এই রিসেপ্টর শনাক্ত করেন, যা দুটি প্রোটিন (TAS1R2 ও TAS1R3) দ্বারা গঠিত একটি যৌগিক গঠন। একটি প্রোটিন মিষ্টি অণুর সঙ্গে যুক্ত হয়, অন্যটি গঠনগত সমর্থন দেয়।
কিন্তু ২০ বছরেরও বেশি সময় গবেষণার পরও এই রিসেপ্টরের সুনির্দিষ্ট গঠন অজানাই রয়ে গিয়েছিল। এবার অবশেষে গবেষক দলটি এটির গঠন নির্ধারণে সফল হয়েছে। তারা প্রথমে প্রোটিন কমপ্লেক্সটিকে স্থিতিশীল করে তোলেন, তারপর ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপির মাধ্যমে এর পরমাণু স্তরের ছবি ধারণ করেন—যেখানে সুক্রালোজ ও অ্যাসপারটেম যুক্ত অবস্থায় রিসেপ্টরের গঠন দেখা যায়। এরা প্রাকৃতিক চিনির তুলনায় রিসেপ্টরের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত হয়, ফলে ছবি তোলার জন্য এটি স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে।
রহস্য উদ্ঘাটন
গবেষণায় দেখা যায়, TAS1R2 উপঅঙ্গে একটি ক্ষুদ্র গহ্বর আছে, যেখানে সুক্রালোজ বা অ্যাসপারটেম যুক্ত হতে পারে। তবে এরা একটু আলাদা পদ্ধতিতে যুক্ত হয়, যা বোঝায় রিসেপ্টরটি বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিজাত উপাদান চিহ্নিত করতে পারে। TAS1R3 সরাসরি মিষ্টি অণুর সঙ্গে যুক্ত না হলেও রিসেপ্টরের গঠন ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
“এটি আমাদের স্পষ্ট করে বোঝাতে শুরু করেছে যে রিসেপ্টরটি কীভাবে কাজ করে,” বলেন ফিলাডেলফিয়াভিত্তিক স্বাদ বিশ্লেষণ সংস্থা Opertech Bio-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা কাইল পামার।
এই গঠনগত বিশ্লেষণ সাহায্য করতে পারে বোঝার ক্ষেত্রে কেন কেউ কেউ মিষ্টির স্বাদ অন্যদের চেয়ে বেশি অনুভব করেন। ফরাসি গবেষক লোয়িক ব্রিয়াঁ ও তার সহকর্মীরা এই রিসেপ্টরে থাকা প্রাকৃতিক জেনেটিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে কাজ করছেন। এখন রিসেপ্টরের গঠন জানার ফলে এই পরিবর্তনগুলো কীভাবে কাজের ব্যাঘাত ঘটায় তা বিশ্লেষণ করা সহজ হবে।
চীনের ছিলু ইউনিভার্সিটির গবেষক বো লিউর মতে, একই পদ্ধতি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে উমামি স্বাদের রিসেপ্টরের গঠনও উন্মোচিত হতে পারে।
স্বাদের চমক
এই রিসেপ্টরের গঠন জানার ফলে খাদ্য রসায়নবিদরা এমন ক্যালরিমুক্ত স্যুইটনার তৈরি করতে পারবেন, যা বর্তমান বিকল্পগুলোর তুলনায় নিরাপদ এবং আরো স্বাদযুক্ত হবে।
এছাড়া, এই গঠন কাজে লাগিয়ে এমন যৌগ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা প্রাকৃতিক চিনির প্রতি রিসেপ্টরের সংবেদনশীলতা বাড়ায়। এতে স্বাদে ছাড় না দিয়েই চিনি কম খাওয়ার দিকে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা যাবে—একধরনের ‘মলিকিউলার ম্যাজিক’, যা স্থূলতা ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
———
The structure of human sweetness, Cell (2025).
DOI: 10.1016/j.cell.2025.04.021
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


