কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) আজ বিশ্বে এক নিঃশব্দ বিপ্লব এনেছে। যদি ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু যন্ত্র না হয়ে আংশিকভাবে “জীবন্ত” হয়? এখানেই আসে নতুন এক ধারণা— অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্স (Organoid intelligence) বা ওআই (OI)। এটি এমন এক প্রযুক্তি, যেখানে মস্তিষ্কের কোষের মতো জীবন্ত কোষ দিয়ে তৈরি হচ্ছে কম্পিউটার। একে বলে বায়োকম্পিউটিং — যেখানে প্রযুক্তি আর প্রাণ একসঙ্গে কাজ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের বর্তমান বদলেছে, আর ওআই হয়তো বদলে দেবে আমাদের ভবিষ্যৎ।অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্ট কম্পিউটার সিস্টেমকে বায়োহাইব্রিড সিস্টেম বলা যেতে পারে, কারণ এখানে জীবন্ত কোষ ও যান্ত্রিক উপাদানের একত্রে ব্যবহার হয়। কল্পনা করুন, যদি কোষ দিয়ে তৈরি একটা ছোট্ট মস্তিষ্ক দাবা খেলতে পারে! হ্যাঁ, ঠিক শুনেছেন! এই চমকপ্রদ প্রযুক্তির নামই হলো অর্গানোয়েড ইন্টেলিজেন্স (OI)। এটি এমন একটি নতুন দুনিয়া যেখানে জীবন্ত কোষ ব্যবহার করে কম্পিউটার বানানো হচ্ছে!
অর্গানোয়েড মানে হলো ল্যাবে তৈরি করা ছোট্ট মস্তিষ্কের টুকরো। দেখতে মস্তিষ্কের মতো না, কিন্তু সেই মস্তিষ্কের মতোই কাজ করতে পারে! অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্স বলতে বোঝানো হয় মানব স্টেম সেল থেকে তৈরি, ক্ষুদ্র, ত্রিমাত্রিক মস্তিষ্কসদৃশ কোষগুচ্ছ (organoids) ব্যবহার করে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বা হিসাব-নিকাশ করা। গতানুগতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেখানে সিলিকন চিপ ও ডিজিটাল লজিকে ভিত্তি করে তৈরি, সেখানে ওআই জীবন্ত কোষের জটিলতা ও নমনীয়তা ব্যবহার করে কাজ করে। এটি শুধু একটি নতুন কম্পিউটিং পদ্ধতি নয়, বরং মানব মস্তিষ্ক ও চিন্তাভাবনার প্রকৃতি বুঝতে এক অভিনব উপায়ও বটে।
এইভাবে, অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্স জীববিজ্ঞান ও যন্ত্রের মধ্যে এক সেতুবন্ধন গড়ে তোলে। জৈবিক পদ্ধতির মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও উন্নত করে তোলা সম্ভব যেখানে মানুষের মতো শিখতে পারা, খাপ খাইয়ে নিতে পারা এবং নতুনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা যুক্ত হয়। এই ছোট্ট কোষগুলো একে অপরের সাথে সংযোগ তৈরি করে, শিখতে পারে, এমনকি অদ্ভুত কাজও করতে পারে। আপনার হয়তো জানেন, আমাদের সাধারণ কম্পিউটার সিলিকন চিপ দিয়ে কাজ করে এবং গাণিতিক হিসাব দ্রুত করতে পারে। কিন্তু যখন জটিল তথ্যের প্রশ্ন আসে বা একসাথে অনেক কাজ করতে হয়, তখন কম্পিউটার হোঁচট খায়। এখানে অর্গানোয়েড ইন্টেলিজেন্স একদম নতুন কিছু নিয়ে আসছে। এটা জীবন্ত কোষ দিয়ে এমন কম্পিউটার তৈরি করতে চায়, যেটা কম শক্তি খরচ করবে, দ্রুততর হবে এবং আরো হবে অনেক শক্তিশালী ও দক্ষ।
ক্রেডিট: Noelia Anton Bolanos/Irene Faravelli
অর্গানোয়েড ইন্টেলিজেন্স আসলে মানুষের মস্তিষ্কের মতো কাজ করতে পারে। মস্তিষ্ক কীভাবে একসাথে অনেক কাজ করে এবং অসম্পূর্ণ বা অনিশ্চিত তথ্য থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, ঠিক সেভাবেই অর্গানোয়েড শিখতে পারে এবং কাজ করতে পারে। যারা এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, তাদের ধারণা, একদিন এই অর্গানোয়েডগুলো প্রচলিত কম্পিউটার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে! অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্সের মূলেই রয়েছে বায়োকম্পিউটার — এমন কম্পিউটার যেগুলো জীববৈজ্ঞানিক উপাদান (যেমন নিউরন বা DNA) ব্যবহার করে কাজ করে। সাধারণ কম্পিউটার যেখানে ০ ও ১ (বাইনারি কোড) এবং বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে চলে, বায়োকম্পিউটার সেখানে জীবন্ত কোষের জটিল ক্রিয়াকলাপ ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করে। এই প্রযুক্তি শুধু কম্পিউটারেই নয়, চিকিৎসাতেও দারুণ কাজ করতে পারে! স্টেম সেল পদ্ধতির উদ্ভাবকরা প্রমাণ করেছেন ত্বক থেকেও নিউরন উৎপাদন করা সম্ভব। এই নিউরনগুলো দিয়ে তৈরি মস্তিষ্ক অর্গানয়েড–
- গবেষণায় মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতি অনুকরণ করতে পারে।
- নতুন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আগেভাগেই যাচাই করা সম্ভব।
- মস্তিষ্ক বিকাশ, স্মৃতি, ও শেখার প্যাটার্ন বুঝতে সাহায্য করে।
বর্তমানে ব্যবহৃত প্রতিটি অর্গানয়েডে ~৫০,০০০ কোষ থাকে, যা একটি ফলের মাছি (ছোট মাছি)-র স্নায়ুতন্ত্রের সমান। ওআই তৈরিতে প্রয়োজন একটি অর্গানয়েডে প্রায় ১ কোটি কোষ — মানে অনেক বড় আকারে তৈরি করতে হবে। ধরুন, অটিজম রোগী থেকে কোষ নিয়ে, সেগুলোর মাধ্যমে মস্তিষ্কের অর্গানোয়েড তৈরি করে, বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন — কীভাবে এসব রোগ কাজ করে, কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কীভাবে আরও ভালো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। এই নতুন পদ্ধতিতে রোগের গভীরে গিয়ে সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব! ওআই ভবিষ্যতে মানব মেডিসিনে বিপ্লব ঘটাতে পারে, যেমন:
- আলৎসহাইমার রোগীর ত্বক থেকে তৈরি অর্গানয়েডে স্মৃতি পরীক্ষা।
- ওষুধ বা রাসায়নিক পদার্থ শেখার ও স্মৃতিতে কী প্রভাব ফেলে তা পর্যবেক্ষণ।
- অটিজম, স্মৃতিলোপ, বা স্নায়ুগত ব্যাধির তুলনামূলক বিশ্লেষণ।
তবে, এই প্রযুক্তি এতই নতুন যে, অনেক বড় প্রশ্নও সামনে আসছে। যেমন, যদি অর্গানোয়েডরা একসময় কনশাস হয়ে ওঠে, তাহলে আমাদের তাদের সাথে কীভাবে আচরণ করা উচিত? এরকম আরও অনেক প্রশ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। কিছু গবেষক এমনকি সাইলেন্ট সাফারিং (অনুভব করতে পারে কিন্তু প্রকাশ করতে না পারা) থেকে রক্ষা করতে, স্মৃতি মুছে ফেলার সীমা (enforced amnesia) ও নির্দিষ্ট সময় পর মেমোরি রিসেট করার মতো ধারণা দিয়েছেন। মানব কোষ ব্যবহার করে তৈরি হওয়া অর্গানয়েড নিয়ে নৈতিকতা, জীববিজ্ঞানের সীমা এবং প্রযুক্তির একত্রীকরণ—সবকিছুই মাথায় রাখতে হবে। অর্গানোয়েডগুলির মধ্যে কোষগুলো দেখতে মানুষের মস্তিষ্কের ছোট সংস্করণ না হলেও এই ছোট্ট পেন ডট সাইজ কোষগুলোর মধ্যে নিউরন থাকে, যা মস্তিষ্কের মতো কাজ করে এবং একে অপরের সাথে বহু সংযোগ তৈরি করতে পারে। বৈজ্ঞানিকরা একে “ডিশে ইন্টেলিজেন্স” বলেন।
ক্রেডিট: Will Kirk/Johns Hopkins University
ড. থমাস হার্টুং ২০১২ সালে মানব ত্বক থেকে মস্তিষ্ক অর্গানয়েড তৈরি শুরু করেন এবং এখন তিনি ও তার টিম এমন বায়োহার্ডওয়্যার (bio hardware) তৈরি করছেন, যা সুপারকম্পিউটারের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি-সাশ্রয়ী হতে পারে। Organoid Intelligence আমাদের সামনে এমন একটি দিগন্ত খুলে দিচ্ছে, যেখানে জীববিজ্ঞান ও প্রযুক্তি একসাথে কাজ করে এমন সমস্যার সমাধান করবে যা আগে কেবল কল্পনার জগতেই ছিল।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অফ পাবলিক হেলথ-এর ড. লেনা স্মিরনোভা বলেন, “আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করছি, যেখানে মানুষ ও মানুষের তৈরি জিনিসের মধ্যে পার্থক্য ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে।”
তাহলে চিন্তা করুন, এটাই ভবিষ্যত! অর্গানোয়েড ইন্টেলিজেন্স পুরোপুরি প্রস্তুত না হলেও, এর সম্ভাবনা অনেক বিশাল। হয়তো একদিন আমাদের পৃথিবী বদলে যাবে এবং আমরা এক নতুন প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করবো!
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।




