যেভাবে প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপ আলাদা, সেভাবেই একজন মানুষের নিঃশ্বাস নেয়ার ধরনও হতে পারে একান্তই তার নিজের। শুধু পরিচয় শনাক্ত করার উপায় হিসেবেই নয়, বরং একজনের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বোঝার ইঙ্গিতও দিতে পারে এই নিঃশ্বাসের ছন্দ।
গবেষকরা ৯৭ জন সুস্থ মানুষের নিঃশ্বাস ২৪ ঘণ্টা ধরে পর্যবেক্ষণ করেন। তারা দেখতে পান, শুধুমাত্র নিঃশ্বাসের ধরণ দেখেই অংশগ্রহণকারীদের বেশ নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা যায়। শুধু তাই নয়, এসব নিঃশ্বাসের ছন্দের সঙ্গে শরীরের ওজনের সূচক (BMI) এবং মানসিক অবসাদ বা উদ্বেগের লক্ষণের সম্পর্কও খুঁজে পান তারা। তাদর এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Current Biology জার্নালে।
নিঃশ্বাস ও মস্তিষ্কের যোগসূত্র
প্রতিটি নিঃশ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার প্রক্রিয়া মস্তিষ্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। কারণ, শরীরের সঠিক কার্যক্রম বজায় রাখতে মস্তিষ্ককে অক্সিজেন সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। গবেষকরা ভাবলেন, যেহেতু প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্ক আলাদা, তবে নিঃশ্বাসের ধরণও তো ভিন্ন হওয়ার কথা!
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তারা এমন একটি পরিধানযোগ্য যন্ত্র বানান যা ব্যক্তির দুই নাসারন্ধ্র দিয়ে প্রবাহিত বাতাস রেকর্ড করতে পারে। গলার পেছনে লাগানো এই ডিভাইসে ছোট টিউব থাকে যা নাকের নিচে বসানো হয় এবং এটি মানুষের ঘুম ও জাগরণ—উভয় অবস্থায় নিঃশ্বাসের ধরণ রেকর্ড করে।
ক্রেডিট: Soroka et al.
গবেষকরা নিঃশ্বাসের ছন্দ বিশ্লেষণে ২৪টি সূচক ব্যবহার করেন, যেমন নিঃশ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার সময়কাল, এবং দুই নাকের ফুটা দিয়ে বাতাস প্রবাহের পার্থক্য। ঘুম ও জাগরণকালীন তথ্য আলাদা করে একটি মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমকে প্রশিক্ষণ দেন তারা।
এরপর ৪২ জন অংশগ্রহণকারী কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস বা এমনকি দুই বছর পর পুনরায় ২৪ ঘণ্টার নিঃশ্বাস পরিমাপের জন্য আসেন। তখন ওই অ্যালগরিদম তাদের নিঃশ্বাসের ধরণ থেকেই তাদের চিহ্নিত করতে পারে। জাগরণকালীন নিঃশ্বাসের তথ্য ঘুমকালীন চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য ফল দেয়। যখন ২৪ সূচকের বদলে ১০০ সূচকে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন সঠিক শনাক্তকরণের হার দাঁড়ায় ৯৬.৮ শতাংশ।
নিঃশ্বাস বলছে স্বাস্থ্যের কথা
গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের BMI এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে কিছু প্রশ্নপত্র পূরণ করান। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই তথ্যগুলোর সঙ্গেও নিঃশ্বাসের ধরণ মিলে যায়, যদিও বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারীর মানসিক সমস্যা ছিল খুবই সামান্য।
যেমন, যাদের BMI বেশি, তাদের ঘুমকালীন নিঃশ্বাস অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। আবার যাদের মধ্যে উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার মান বেশি, তাদের নিঃশ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার ধরণেও ছিল পার্থক্য।
স্টকহোমের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের স্নায়ুবিজ্ঞানী আর্টিন আর্শামিয়ান এই গবেষণাকে বলেন, “অসাধারণ এক গবেষণা।”
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হেলেন লাভরেটস্কি বলেন, “আমাদের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী একটি টুল হচ্ছে নিঃশ্বাস।” উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কিছু শাখায় সৈনিকদের চাপ সামলাতে এবং মনোসংযোগ ধরে রাখতে নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণ শেখানো হয়।
নিঃশ্বাস দিয়ে চাপ কমানো সম্ভব?
গবেষক দলটি এখন খুঁজছেন এমন নিঃশ্বাসের ধরণ যেগুলোর সঙ্গে কম মানসিক চাপ ও উদ্বেগের সম্পর্ক রয়েছে। যদি তারা এটি শনাক্ত করতে পারেন, তাহলে তারা মানুষকে শেখাতে পারবেন কীভাবে নিঃশ্বাস নিলে এসব অনুভূতি হ্রাস পায়।
———
Humans have nasal respiratory fingerprints, Current Biology (2025).
DOI: 10.1016/j.cub.2025.05.008
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



