গবেষকরা প্রথমবারের মতো শুকরের ভ্রূণে এমন হৃদপিণ্ডে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন যাতে মানব কোষ রয়েছে। এই ভ্রূণগুলো ২১ দিন পর্যন্ত বেঁচে ছিল এবং সেই সময়ের মধ্যেই তাদের ছোট্ট হৃদপিণ্ড হার্টবিট তৈরি করতে শুরু করে। এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি হংকংয়ে অনুষ্ঠিত International Society for Stem Cell Research–এর বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়।
মানব-প্রাণীর সংকর ভ্রূণ (chimaera) তৈরি করে বিজ্ঞানীরা এমন প্রাণী তৈরি করতে চান যাদের দেহে মানব অঙ্গ তৈরি হবে — ভবিষ্যতে যা মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনযোগ্য হতে পারে। এটি বিশ্বজুড়ে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ঘাটতি মোকাবেলার একটি সম্ভাব্য সমাধান।
এই চিমেরা তৈরির একটি কৌশল হলো, প্রাণীর ভ্রূণে এমন কিছু জিন বাদ দেওয়া যা একটি নির্দিষ্ট অঙ্গ (যেমন: হৃদপিণ্ড) তৈরির জন্য জরুরি। এরপর তাতে মানব স্টেম সেল (stem cell) ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যাতে প্রাণীর বদলে মানুষের কোষ দিয়ে ওই অঙ্গটি গঠিত হয়। আগেও বিভিন্ন গবেষক শুকরের ভ্রূণে মানব পেশি এবং রক্তনালীর কোষ তৈরি করেছেন এই পদ্ধতিতে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেয়া গুয়াংজৌ ইনস্টিটিউটস অব বায়োমেডিসিন অ্যান্ড হেলথ–এর ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজিস্ট লাই লিয়াংশুয়ে জানান যে, শুকরের অঙ্গগুলোর আকার ও গঠন মানুষের মতো হওয়ায়, তারা আদর্শ দাতা প্রাণী। এর আগে তার দল শুকরের ভ্রূণে প্রাথমিক পর্যায়ের মানব কিডনি গঠন করেছিল, যা গর্ভবতী শুকরের দেহে এক মাস পর্যন্ত টিকে ছিল। এবার তারা দেখতে চেয়েছেন একই কাজ হৃদপিণ্ডের ক্ষেত্রেও সম্ভব কি না।
এই গবেষণাটি এখনো পিয়ার রিভিউ করা হয় নি।
গবেষণায়, লাই ও তার দল মানব স্টেম সেলকে শুকরের দেহে টিকে থাকার উপযোগী করে তোলে কিছু জিন যোগ করে, যা কোষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে এবং বৃদ্ধি বাড়ায়। এরপর শুকরের এমন ভ্রূণ তৈরি করা হয়, যেখানে হৃদপিণ্ডের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জিন মুছে ফেলা হয়। এরপর নিষিক্ত হওয়ার অল্প সময় পরের একটি পর্যায়ে (মরুলা) কিছু মানব স্টেম সেল এই ভ্রূণগুলোতে প্রবেশ করানো হয়। পরে এই ভ্রূণগুলো প্রতিস্থাপন করা হয় প্রতিস্থাপনকারী (surrogate) শুকরদের গর্ভে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্রূণগুলো ২১ দিন পর্যন্ত বেড়ে উঠেছে, তারপর তারা মারা যায়। লাই মনে করেন, সম্ভবত মানব কোষগুলো শুকরের হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।
যখন গবেষকরা এই ভ্রূণীয় হৃদপিণ্ডগুলো কাছ থেকে পরীক্ষা করেন, তখন দেখা যায় এগুলো সেই পর্যায়ের একটি মানব হৃদপিণ্ডের সমান আকারে বেড়ে উঠেছে যা আঙুলের ডগার মতো। এবং সেগুলো স্পষ্টভাবে স্পন্দিত হচ্ছিল। মানব কোষগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছিল, কারণ সেগুলোতে আগেই আলোকোজ্জ্বল (luminescent) একটি চিহ্ন যোগ করা হয়েছিল, যা আলো ছড়াচ্ছিল।
তবে হৃদপিণ্ডের কত শতাংশ কোষ মানব কোষ ছিল, তা গবেষকেরা প্রকাশ করেননি। আগের গবেষণায়, যেখানে শুকরের ভ্রূণে মানব কিডনি তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে ৪০–৬০% কিডনির টিস্যু মানব কোষ দিয়ে তৈরি হয়েছিল; বাকি অংশ ছিল শুকরের।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্টেম-সেল জীববিজ্ঞানী হিরোমিৎসু নাকাউচি বলেন, হৃদপিণ্ডের কোষগুলো সত্যিই মানব কোষ কি না, তা নিশ্চিত করতে হলে ডেটা আরও ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। চিমেরা গবেষণার একটি কমন চ্যালেঞ্জ হলো, মানব কোষে অন্য প্রজাতির কোষ মিশে যাওয়ার ঝুঁকি।
জাপানের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স, টোকিও’র স্টেম-সেল বিজ্ঞানী হিদেকি মাসাকি জানান, এই আলো ছড়ানো কোষগুলো হৃদপিণ্ডের খুব সীমিত অংশেই ছিল, তাই এগুলো প্রাণীর কোষের সাথে কতটা সংহত হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। যদি হৃদপিণ্ড অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য তৈরি করা হয়, তাহলে সেটি পুরোপুরি মানব কোষ দিয়ে তৈরি হওয়াই জরুরি, নইলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেটিকে বিদেশি বস্তু হিসেবে আক্রমণ করতে পারে।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


