সুপারকন্ডাক্টর বা অতিপরিবাহী হলো এমন এক পদার্থ যা বিদ্যুৎকে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই প্রবাহিত হতে দেয়।
অনেক পদার্থই বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে—অর্থাৎ, তাদের ভেতর দিয়ে ইলেকট্রিক কারেন্ট (তড়িৎ প্রবাহ) প্রবাহিত হতে পারে। এই ধরনের পদার্থকে পরিবাহী (conductors) বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ধাতব তারের মাধ্যমে আমাদের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস এবং গৃহস্থালী যন্ত্রপাতিতে বিদ্যুৎ পৌঁছে।
কিন্তু প্রায় সব পরিবাহীতেই কিছুটা প্রতিবন্ধকতা (resistance) থাকে। কেন? কারণ, যখন ইলেকট্রন কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন তারা অন্যান্য কণার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই সংঘর্ষের কারণে কিছু শক্তি নষ্ট হয়, যা আমরা তাপ হিসেবে অনুভব করি। এজন্যই আমাদের কম্পিউটারে কুলিং ফ্যান লাগে।
কিন্তু সুপারকন্ডাক্টর বিদ্যুৎ পরিবাহিত করে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। তবে এই বৈশিষ্ট্য কেবলমাত্র অতিমাত্রায় ঠান্ডা তাপমাত্রায় দেখা যায়। কারণ, যেকোনো তাপ শক্তি ইলেকট্রনকে নাড়িয়ে দেয়, যার ফলে সংঘর্ষ ঘটে। তাপ যত কম, নাড়াচাড়া তত কম; ফলে সংঘর্ষও কম হয়, এবং প্রতিবন্ধকতাও কমে যায়।
খুব ঠান্ডা অবস্থায় পারদ (mercury) এবং সীসা (lead) সুপারকন্ডাক্টর হয়ে যায়। কিছু যৌগও (compound) সুপারকন্ডাক্টর হতে পারে। যেমন, টাইটানিয়াম এবং নাইওবিয়াম দিয়ে তৈরি সংকর ধাতু।
অনেক আধুনিক প্রযুক্তি সুপারকন্ডাক্টরের ওপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, কোয়ান্টাম কম্পিউটার। এসব কম্পিউটার তথ্য সংরক্ষণের জন্য কিউবিট (qubit) নামক একক ব্যবহার করে, যার জন্য সুপারকন্ডাক্টর প্রয়োজন।
বিজ্ঞানীরা সুপারকন্ডাক্টর ব্যবহার করে শক্তিশালী ইলেক্ট্রোম্যাগনেট বা বৈদ্যুতিক চুম্বক তৈরি করতে পারেন। এই ইলেক্ট্রোম্যাগনেট এমন এক ধরনের চুম্বক যা কেবলমাত্র যখন তাতে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় তখনই চুম্বকীয় হয়। সুপারকন্ডাক্টর প্রতিবন্ধকতা ছাড়া বিদ্যুৎ পরিবাহিতা করতে পারায়, তারা অত্যন্ত শক্তিশালী চুম্বকক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম।
সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট MRI (Magnetic Resonance Imaging) মেশিনে ব্যবহৃত হয়। এই যন্ত্রগুলো মানুষের শরীরের ভিতরের বিস্তারিত ছবি তুলে, যা ডাক্তারদের মস্তিষ্কে আঘাত বা টিউমার শনাক্ত করার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে সাহায্য করে।
সুপারকন্ডাক্টর দিয়ে তৈরি চুম্বকই পৃথিবীর দ্রুততম ট্রেনগুলো চালায়। এমন এক ধরনের ট্রেন হলো ম্যাগলেভ (Maglev), যার পূর্ণরূপ Magnetic Levitation। এই ট্রেন সাধারণ ট্রেনের মতো রেলের ওপর চলে না, তারা রেলের ওপরে ভেসে চলে। রেল এবং ট্রেনের চুম্বক একে অপরকে বিকর্ষণ করে। ফলে ট্রেনটা ভেসে থাকে, কোনো ঘর্ষণ হয় না, ফলে গতি কমে না।
প্রথম বাণিজ্যিক ম্যাগলেভ ট্রেন চালু হয় চীনের সাংহাই শহরে, ১ জানুয়ারি ২০০৪ সালে। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৪৩১ কিলোমিটার। জাপানের এল জিরো সিরিজ (L0 Series) ম্যাগলেভ ট্রেন এর চেয়ে আরও দ্রুত চলে—ঘণ্টায় ৬০৩ কিলোমিটার। এমন গতি থাকলে একজন ব্যক্তি বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া মাত্র দেড় ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারবেন।
ছবি: Saruno Hirobano/Wikimedia
তবে বর্তমান সময়ের সুপারকন্ডাক্টরগুলো কেবলমাত্র নির্দিষ্ট তাপমাত্রার নিচে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাগলেভ ট্রেনের চুম্বকগুলোকে –২৬৮° সেলসিয়াস (–৪৫০° ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় ঠান্ডা রাখতে হয়।
মজার ব্যাপার হলো, আমরা এখনও অতিপরিবাহীতার পেছনের কারণ পুরোপুরি জানিনা। লেজার-ভিত্তিক ইমেজিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ইলেকট্রনের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে হয়তো একদিন আমরা জানাতে পারবো কীভাবে সুপারকন্ডাক্টর বিদ্যুৎকে প্রতিবন্ধকতা ছাড়া পরিবাহিতা করতে পারে।
——
বিজ্ঞান কথা-র সম্পূর্ণ তালিকা দেখুন
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



