প্রাকৃতিক ইতিহাসের রহস্য উন্মোচনে এবার এক ধাপ এগিয়ে গেল বিজ্ঞান। সম্প্রতি কানাডার আর্কটিকে আবিষ্কৃত একটি গণ্ডারের দাঁত থেকে বিজ্ঞানীরা উদ্ধার করেছেন প্রায় ২৪ মিলিয়ন বছর পুরনো প্রোটিন যা এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রাচীনতম স্তন্যপায়ী এনামেল প্রোটিন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার শুধুমাত্র প্রাচীন প্রোটিন সংরক্ষণের সম্ভাবনা বাড়ায়নি, বরং গণ্ডার পরিবারের (Rhinocerotidae) বিবর্তন নিয়েও নতুন আলোকপাত করেছে। গবেষণাপত্রটি গত ৯ জুলাই, ২০২৫ এ Nature এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে কানাডার উত্তরাঞ্চলের হটন ক্রেটার থেকে সংগৃহীত জীবাশ্ম ব্যবহার করে। ওই এলাকায় বর্তমানে চরম শীতপ্রবণ পরিবেশ থাকলেও মায়োসিন যুগে (২১–২৪ মিলিয়ন বছর আগে) অঞ্চলটি ছিল অপেক্ষাকৃত উষ্ণ (গড় তাপমাত্রা ৮–১২°C)। আর সেই পরিবেশেই গঠিত হয় এক ধরনের প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগার, যেখানে দাঁতের এনামেল স্তরে আটকে ছিল প্রোটিনের অণু।
গবেষকরা বিশেষ ল্যাব প্রযুক্তি ব্যবহার করে দাঁতের এনামেল থেকে ৭টি প্রোটিনের অংশবিশেষ উদ্ধার করেন—যার মধ্যে রয়েছে AMELX (Amelogenin), ENAM (Enamelin), AMBN (Ameloblastin) ইত্যাদি। প্রায় ১,১৬৩টি স্পেকট্রাম ম্যাচ এবং ২৫১টি অ্যামিনো অ্যাসিড সাইট শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এই গণ্ডারটি আজকের Rhinocerotinae (যেমন: কালো বা সাদা গণ্ডার) কিংবা Elasmotheriinae (যেমন: সাইবেরিয়ান ইউনিকর্ন)–এর পূর্বপুরুষ হলেও, এই দুই গোষ্ঠীর পূর্ববর্তী এক প্রাচীন শাখায় অবস্থান করত। অর্থাৎ, এটি একটি আরও প্রাচীন গণ্ডার বংশের প্রতিনিধি, যার কারণে গণ্ডার বিবর্তনের টাইমলাইন পুনরায় লিখতে হতে পারে।
আগের ধারণা ছিল Elasmotheriinae ও Rhinocerotinae-এর মধ্যে বিভাজন ঘটেছিল প্রায় ৪৭ মিলিয়ন বছর আগে, কিন্তু এই গবেষণা বলছে সেটি আসলে হয়েছিল মাত্র ৩৪–২২ মিলিয়ন বছর আগে, যা পূর্ব অনুমানের তুলনায় অনেকটা সাম্প্রতিক।
এই গবেষণার মাধ্যমে গবেষকরা এক নতুন ধারণা দিচ্ছেন—“Proteomic Lagerstätte”। সাধারণ Fossil Lagerstätte বলতে বোঝায় এমন স্থান যেখানে জীবাশ্ম খুব ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু হটন ক্রেটারের ক্ষেত্রে দাঁতের প্রোটিন অণুগুলো এতটা ভালোভাবে সংরক্ষিত ছিল যে বিজ্ঞানীরা এখন এটিকে জৈব-আণবিক স্তরের Lagerstätte হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন।
এছাড়া গবেষণায় ব্যবহৃত thermal age modeling প্রমাণ করেছে যে শীতল অঞ্চলে দাঁতের প্রোটিন হাজার হাজার বছর ধরে সংরক্ষিত থাকতে পারে। এতে বোঝা যায়, শুধুমাত্র DNA-নির্ভর নয়, প্রোটিন-নির্ভর বিবর্তন চিত্রও বহু পুরনো জীবাশ্ম বিশ্লেষণে কার্যকর হতে পারে।
এই গবেষণা দেখিয়ে দিল যে আর্টিক অঞ্চলের হিমায়িত মৃত্তিকা কেবল হাড় বা দাঁতের আকৃতি নয়, বরং জীববিজ্ঞানের জৈব অণু সংরক্ষণেও সক্ষম। ফলে এই অঞ্চল থেকে আরও গভীর সময়ের প্রোটিন উদ্ধার সম্ভব হতে পারে—এমনকি ডাইনোসর যুগেরও!
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে যদি Aceratheriinae (হর্নলেস প্রাচীন গণ্ডার) এবং অন্যান্য প্রজাতির দাঁত বিশ্লেষণ করা যায়, তবে গণ্ডার পরিবারের পুরো বিবর্তন ইতিহাসের একটা আণবিক টাইমলাইন তৈরি করা সম্ভব হবে।
———
Phylogenetically informative proteins from an Early Miocene rhinocerotid. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09231-4
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


