মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ীর বিবর্তন বুঝতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কেবল হাড় বা দাঁতের আকৃতির ওপর নির্ভর করে এসেছি। কিন্তু এবার বিজ্ঞানীরা এমন এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন, যা দাঁতের গভীরে লুকানো প্রোটিন বিশ্লেষণ করে কোটি বছর আগের প্রাণীদের সম্পর্ক ও পরিবেশের তথ্য তুলে ধরতে সাহায্য করবে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায়, কেনিয়ার তুর্কানা উপত্যকার দাঁতের এনামেল (emamel) বা বাইরের শক্ত স্তর থেকে বিজ্ঞানীরা প্রাচীন প্রোটিনের খণ্ডাংশ উদ্ধার করেছেন যা ১৮ মিলিয়ন বছর পুরনো রাইনোসোর দাঁতে সংরক্ষিত ছিল। শুধু তাই নয়, ৯ জুলাই, ২০২৫ এ Nature জার্নালে প্রকাশিত তাদের গবেষণাপত্রে প্লাইস্টোসিন যুগ (১.৫ মিলিয়ন বছর) থেকে শুরু করে ওলিগোসিন (২৯ মিলিয়ন বছর) পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন স্তন্যপায়ীর দাঁতের প্রোটিন খুঁজে পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কীভাবে পাওয়া গেল এত পুরনো প্রোটিন?
জীবাশ্ম দাঁতের ভেতরকার এনামেল টিস্যু একধরনের ঘন, খনিজে পরিপূর্ণ স্তর যা প্রোটিনকে দেহাবশেষে আটকে রাখতে সক্ষম। গবেষকরা “ডায়াজেনেটিফর্ম” নামক পরিবর্তিত প্রোটিনের অংশ বিশ্লেষণ করে শনাক্ত করেছেন যে কোনটা আসলেই জীবাশ্ম থেকে এসেছে এবং কোনটা আধুনিক দূষণের ফলে যুক্ত হয়েছে।
তাঁরা এমনকি দাঁতে রাসায়নিক পরিবর্তনের চিহ্নও শনাক্ত করেছেন, যেমন কারবামাইলেশন, অক্সিডেশন, ডিমাইডেশন এবং গ্লাইকেশন প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া পরিবর্তন। এইসব পরিবর্তন শুধু প্রাচীনতার প্রমাণই নয়, বরং দাঁতের এনামেলে সংরক্ষিত সবচেয়ে পুরনো এডভান্সড গ্লাইকেশন প্রোডাক্টের (AGEs) উপস্থিতির নজিরও স্থাপন করেছে।
কী জানাচ্ছে এই প্রোটিন?
বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে দাঁতের প্রোটিনগুলো বর্তমান স্তন্যপায়ীদের নির্দিষ্ট শ্রেণির সাথে মিল রয়েছে। যেমন, ১৮ মিলিয়ন বছর আগের রাইনোসরের দাঁতের প্রোটিন আজকের গণ্ডার ও ট্যাপির সঙ্গে মিল খায়। তেমনি ৭ মিলিয়ন বছরের পুরনো জলহস্তীর (হিপোপটামাস) প্রোটিনের সাথে আধুনিক জলহস্তী ও তিমির মিল খুঁজে পাওয়া গেছে।
এছাড়াও, একটি ১৬ মিলিয়ন বছরের প্রোবোসিডিয়ান (হাতির প্রাচীন পূর্বপুরুষ) দাঁতের প্রোটিনের সঙ্গে আজকের হাতির মিল পাওয়া গেছে, যা বৈজ্ঞানিকদের জন্য বিশাল এক বিজয়। এই মিলের মাধ্যমে তাঁরা দাঁতের প্রোটিন ব্যবহার করে একটি প্রোটিন-ভিত্তিক বিবর্তনীয় গাছ (phylogenetic tree) নির্মাণ করেছেন, যা পূর্বে কেবল DNA দিয়ে সম্ভব ছিল।
এই গবেষণা দেখিয়ে দিল যে আফ্রিকার গরম, ট্রপিকাল অঞ্চলেও (যেখানে DNA দ্রুত নষ্ট হয়) দাঁতের এনামেল প্রোটিন বহু মিলিয়ন বছর টিকে থাকতে পারে। এর ফলে আমাদের সামনে খুলে যেতে পারে প্লিওসিন-যুগের আগের প্রজাতিগুলোর বিবর্তন বোঝার নতুন দরজা।
এখন প্রশ্ন উঠছে, আমরা কী দাঁতের প্রোটিন বিশ্লেষণ করে ডাইনোসরের যুগ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে দাঁত হতে পারে বিবর্তনের এক নতুন টাইম মেশিন।
———
Eighteen million years of diverse enamel proteomes from the East African Rift. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09040-9
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


