অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বিশ্বজুড়ে একটি মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে মানবসভ্যতাকে। প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন এমন সংক্রমণে, যেখানে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। কিন্তু এবার গবেষকেরা আশার আলো দেখেছেন এমন এক উৎসে, যা যুগ যুগ ধরে ভয় ও রহস্যে মোড়া—জন্তুদের বিষ!
আমেরিকার পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং গণনা-ভিত্তিক জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বের নানা প্রাণীর বিষ থেকে খুঁজে বের করেছেন নতুন ধরনের ৩৮৬টি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইড। এই প্রোটিন-সদৃশ অণুগুলোর বেশিরভাগই আগে কখনো শনাক্ত করা হয়নি। গবেষকরা এটিকে বলেছেন “Venom-encrypted peptides” বা VEPs। গবেষণাপত্রটি গত ১২ জুলাই, ২০২৫ এ Nature Communications জার্নালে প্রকাশিত হয়।
গবেষণার প্রাথমিক ধাপে তাঁরা প্রায় ১.৬ লাখ বিষ-প্রোটিন বিশ্লেষণ করে কম্পিউটারভিত্তিক পদ্ধতিতে ৪ কোটি ৬০ লাখের বেশি সম্ভাব্য পেপটাইড চিহ্নিত করেন। তারপর তাদের তৈরি করা APEX নামের AI মডেল ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা হয়। সেখান থেকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ৫৮টি পেপটাইড বাস্তব পরীক্ষায় পাঠানো হয়। তার মধ্যে ৫৩টি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
বিশেষ করে মাকড়সা-ভিত্তিক ডেটাবেজ আরাকনোসারভার (ArachnoServer) থেকে সংগৃহীত পেপটাইডগুলো শতভাগ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। পেপটাইডগুলো ব্যাকটেরিয়ার সেল মেমব্রেনের বৈদ্যুতিক ভারসাম্য ভেঙে দিয়ে তাকে ধ্বংস করে দেয়। এদের কাজ করার ধরণ অনেকটা প্রাকৃতিক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইডের মতো, তবে তাদের গঠন ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য অনেক বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ।
ক্রেডিট: Guan et al./Nature Communications
গবেষকরা এই পেপটাইডগুলোর কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, তারা পানিতে কিছুটা অগোছালো অবস্থায় থাকে, কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার মতো পরিবেশে পৌঁছালে নিজেকে মোচড় দিয়ে α-helix গঠন নেয়, যেটি সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকরী এক পদ্ধতি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই গবেষণায় কিছু পেপটাইডকে ইঁদুরে ত্বকের সংক্রমণে প্রয়োগ করে দেখা হয়, এবং তারা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে কোনোরকম বিষক্রিয়া ছাড়াই। বিশেষ করে Arachnoserver-5 নামের পেপটাইডটি A. baumannii নামক এক ভয়ংকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে তিনদিনে তিন-লগ ইউনিট পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া কমিয়ে দিয়েছে।
তবে গবেষকেরা স্বীকার করেছেন, এই পেপটাইডগুলোর কিছুতে এখনও কোষের প্রতি বিষাক্ততা আছে, বিশেষ করে মানব কিডনি কোষের ক্ষেত্রে। ভবিষ্যতে পেপটাইডগুলোর রাসায়নিক পরিবর্তন ও গঠনগত সূক্ষ্মতা বাড়িয়ে কার্যকারিতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিষক্রিয়াও কমানো হবে।
গবেষণাটির এক গবেষণা ড. চ্যাংগে গুয়ান বলেন, “আমাদের দল এখন সেরা পেপটাইড ক্যান্ডিডেট নিয়ে কাজ করছে, যেগুলো থেকে আরো নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হতে পারে, এবং আমরা সেগুলোকে ওষুধ-রসায়নভিত্তিক পরিবর্তনের মাধ্যমে আরও উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
———
Computational exploration of global venoms for antimicrobial discovery with Venomics artificial intelligence. Nat Commun (2025).
DOI: 10.1038/s41467-025-60051-6
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



