সমাজে বৈষম্য এবং দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দ্রুত বার্ধক্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। চারটি মহাদেশে পরিচালিত এক বিস্তৃত গবেষণায় এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শিক্ষা বার্ধক্যকে ধীর করতে সবচেয়ে কার্যকর উপাদানগুলোর একটি। গবেষণাটি গত ১৫ জুলাই, ২০২৫ এ Nature Medicine জার্নালে প্রকাশিত হয়।
গবেষণাটিতে স্বাভাবিকভাবেই উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মতো পরিচিত কারণগুলোর কথাও উঠে এসেছে, যেগুলো বার্ধক্য ত্বরান্বিত করে। তবে গবেষকেরা বলছেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবগুলোর সংযুক্তি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে কেন বিভিন্ন দেশে বার্ধক্যের গতি এতটা ভিন্ন হয়।
গবেষণার প্রধান গবেষক আগুস্তিন ইবানেজ বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন এবং অনিশ্চয়তার এই যুগ আমাদের এক ধরনের “হতাশার জগতে” নিয়ে গেছে যা মানুষকে মানসিক ও শারীরিকভাবে বার্ধক্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। “আমরা ভাবিই না, এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কত বড় প্রভাব ফেলছে।”
বয়সের ব্যবধান
গবেষণায় ৪০টি দেশের মোট ১,৬১,৯৮১ জন অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ৭টি দেশ লাতিন আমেরিকায়, ২৭টি ইউরোপে, ৪টি এশিয়ায় এবং ২টি আফ্রিকায় অবস্থিত। বিভিন্ন দেশের তথ্য সমন্বয় করতে অর্থাৎ নিশ্চিত করতে যে সব ভেরিয়েবল একইভাবে মাপা হয়েছে তা প্রায় তিন বছর লেগে গেছে, বলেন ইবানেজ।
গবেষকেরা আগে থেকে বিদ্যমান গবেষণাগুলো বিশ্লেষণ করে এমন সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেন যেগুলো বার্ধক্য বাড়াতে বা কমাতে ভূমিকা রাখে এবং যেগুলো দেশের মধ্যে তুলনাযোগ্য। এরপর এই তথ্যগুলো একটি মেশিন লার্নিং মডেলে ট্রেইন করানো হয়, যা কারও প্রকৃত বয়সের তুলনায় তার শরীর-মন কতটা “বুড়ো” হয়েছে তা নির্ধারণ করে।
যেমন, যদি কারও প্রকৃত বয়স হয় ৫০ বছর, কিন্তু মডেল বলছে তারা ৬০ বছরের মতো, তাহলে তাদের ‘বায়োবিহেভিয়ারাল এজ গ্যাপ’ হলো ১০ বছর।
গবেষণায় দেখা গেছে, মিশর ও দক্ষিণ আফ্রিকায় বার্ধক্য দ্রুত হচ্ছে, ইউরোপে সবচেয়ে ধীরে, এবং এশিয়া ও লাতিন আমেরিকা মাঝামাঝি অবস্থানে।
গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের সূচক যেমন ভোটাধিকারের সীমাবদ্ধতা, অন্যায্য নির্বাচন, রাজনৈতিক দলের ওপর চাপ ইত্যাদির সঙ্গে দ্রুত বার্ধক্যের শক্ত সম্পর্ক পাওয়া গেছে যা গবেষকদের জন্যও ছিল বিস্ময়কর। এছাড়া কম জাতীয় আয়, বায়ু দূষণ, সমাজে বৈষম্য এবং লিঙ্গ বৈষম্যও এর সঙ্গে জড়িত।
২১,৬৩১ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্যের মধ্যে কিছু ছিল ৪ বছর ব্যবধানে নেওয়া, যার ফলে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনের তুলনা করা সম্ভব হয়েছে। এই তথ্য থেকে দেখা যায়, যাদের বয়সের ব্যবধান বেশি, তাদের কগনিটিভ ক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়।
মানসিক চাপের মূল্য
এই সব সামাজিক ও রাজনৈতিক উপাদান কীভাবে শরীরের বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে ইবানেজ মনে করেন, মানসিক চাপের কারণে শরীর ও মস্তিষ্কে যে শারীরিক প্রতিক্রিয়া হয়, সেটাই মূল কারণ হতে পারে।
তবে গবেষণার একটি সীমাবদ্ধতা আছে। যেহেতু এতগুলো দেশের তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যেমন ধূমপানের মতো বিষয় বাদ দিতে হয়েছে, কারণ সেগুলো দেশে দেশে ভিন্নভাবে মাপা হয়েছে।
স্যুয়েমোতো আরও বলেন, “মাত্র ৪ বছরের ফলোআপ ডেটা বার্ধক্য বিশ্লেষণের জন্য খুবই সীমিত।” তিনি অন্তত ১০ বা ২০ বছর ব্যবধানের তথ্য দেখতে চান।
তবে দুজনই আশাবাদী, ভবিষ্যতে কোনও দেশের জন্য বয়স বাড়ার প্রধান কারণগুলো বুঝে সেই অনুযায়ী সরকারি নীতিনির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, মডেল কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তাদের প্রকৃত বয়সের চেয়ে কম বয়স দেখিয়েছে — অর্থাৎ তারা জীববৈজ্ঞানিকভাবে ‘তরুণ’। ইবানেজ বলেন, “এই মানুষদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো খতিয়ে দেখলে হয়তো অন্যদেরও অকাল বার্ধক্য থেকে রক্ষা করার পথ খুঁজে পাওয়া যাবে।”
———
The exposome of healthy and accelerated aging across 40 countries. Nat Med (2025).
DOI: 10.1038/s41591-025-03808-2
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


