সব মেরুদণ্ডী প্রাণীরই একটি পেলভিস (কোমরের হাড়) থাকে, কিন্তু এর মধ্যে কেবল মানুষই এটি ব্যবহার করে সোজা হয়ে দুই পায়ে হাঁটার জন্য। প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে মানুষের পেলভিস ও দুই পায়ে হাঁটার ভঙ্গির (gait) বিবর্তন শুরু হলেও এর সঠিক বিবর্তন প্রক্রিয়া এতদিন রহস্যই ছিল।
সম্প্রতি গবেষকরা পেলভিসে যে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছিল, তার ম্যাপ তৈরি করেছেন যা প্রাচীন মানুষকে প্রথমবার দুই পায়ে হাঁটার সুযোগ দেয় এবং একই সঙ্গে বড় মস্তিষ্কবিশিষ্ট শিশুর জন্ম দেওয়ার মতো শারীরিক ক্ষমতাও তৈরি করে। ২৭ আগস্ট, ২০২৫ Nature জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মানুষের ও অন্যান্য স্তন্যপায়ীর ভ্রূণ অবস্থায় পেলভিসের গঠন প্রক্রিয়ার তুলনা করেছেন। এতে দেখা গেছে, ভ্রূণ অবস্থায় পেলভিসের তরুণাস্থি (cartilage) ও হাড়ের বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ মানুষকে অন্যান্য এইপদের থেকে আলাদা বিবর্তনপথে নিয়ে যায়।
জার্মানির লাইপজিগে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউট ফর ইভোলিউশনারি অ্যানথ্রোপলজির প্যালিওঅ্যানথ্রোপলজিস্ট ট্রেসি কিভেল বলেন, “আমাদের করোটির নিচ থেকে শুরু করে পায়ের আঙুল পর্যন্ত সবকিছুই বদলে গেছে মানুষকে দুই পায়ে হাঁটার উপযোগী করার জন্য।”
তিনি আরও বলেন, এই গবেষণা শুধু আধুনিক মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, প্রাচীন হোমিনিন যেমন ডেনিসোভানদের জীবাশ্ম নিয়েও নতুন উপলব্ধি তৈরি করছে।
মানুষের পেলভিস সময়ের সাথে একটি প্রশস্ত, বাটি-আকৃতির গঠন নেয়, যা সোজা হয়ে হাঁটার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু এই গঠন কীভাবে এল, তা এতদিন অজানা ছিল। গবেষণার গবেষক ও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ডেভেলপমেন্টাল জেনেটিসিস্ট টেরেন্স ক্যাপেলিনি বলেন, “মানুষের পেলভিস চিম্পাঞ্জি বা গরিলার পেলভিস থেকে নাটকীয়ভাবে ভিন্ন। আমরা জানতে চেয়েছিলাম আসলে এখানে কী ঘটছে।”
তদন্তে গবেষকেরা মানুষের পেলভিসের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের নমুনা নিয়ে শারীরস্থানগত (anatomical), টিস্যু-ভিত্তিক (histological) এবং জিনোমিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেন। এরপর তা তুলনা করা হয় ইঁদুর, গিবন ও চিম্পাঞ্জির ভ্রূণের সঙ্গে।
ক্রেডিট: Massimo Brega/Science Photo Library
গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইলিয়াম (ilium) নামের একটি পেলভিস হাড় যা অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহকে সহায়তা করে এবং গ্লুটিয়াল পেশিকে ভর দেয় হাঁটা স্থিতিশীল করতে। গবেষকরা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত বিভিন্ন প্রাইমেট ভ্রূণ ব্যবহার করেন, যেগুলোর অনেকগুলো ১০০–২০০ বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল।
বিশ্লেষণে মানুষের ইলিয়ামের বিকাশে দুটি বিশেষ ধাপ চিহ্নিত করা হয়—
প্রথম ধাপ: গর্ভধারণের প্রায় ৭ সপ্তাহ পর ইলিয়ামের তরুণাস্থি একটি উল্লম্ব দণ্ডের মতো তৈরি হয়। অন্য প্রাইমেটদের ক্ষেত্রেও একইভাবে শুরু হয়। কিন্তু পার্থক্য ঘটে এরপর। মানুষের ভ্রূণে তরুণাস্থিটি দ্রুত ৯০ ডিগ্রি ঘুরে যায়। এর ফলে পেলভিস ছোট ও প্রশস্ত হয়।
দ্বিতীয় ধাপ: গর্ভধারণের প্রায় ২৪ সপ্তাহ পর তরুণাস্থি হাড়ে রূপ নিতে শুরু করে (ossification)। তবে মানুষের ক্ষেত্রে কিছু হাড়কোষ অন্য প্রাইমেটদের তুলনায় অনেক পরে তৈরি হয়। এতে তরুণাস্থি দীর্ঘ সময় তার আকার ধরে রাখতে পারে এবং পেলভিস সঠিক আকৃতিতে বৃদ্ধি পায়।
এই দুটি ধাপ মিলিয়ে মানুষের পেলভিস এমন আকৃতি পায়, যা দুই পায়ে হাঁটার জন্য নিখুঁত।
মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর পেলভিস গঠনের ভিন্নতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি গবেষকেরা কয়েকটি জিন শনাক্ত করেছেন, যেগুলো ইলিয়ামে তরুণাস্থি বৃদ্ধি ও হাড়ের গঠন নিয়ন্ত্রণ করে। মোট পাঁচটি জিন পেলভিসের আকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে তারা জানান।
ডিউক ইউনিভার্সিটির বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজিস্ট ড্যানিয়েল শ্মিট বলেন,
“তারা যে পরিমাণ কাজ করেছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। এর মাধ্যমে আমরা এমন এক প্রক্রিয়া জানতে পারলাম, যা হাড়ের আকৃতি পরিবর্তন করতে সক্ষম, অথচ আগে একেবারেই জানা ছিল না।”
কিভেল আরও বলেন, এই গবেষণা তাকে ভাবাচ্ছে প্রাচীন হোমিনিন জীবাশ্ম থেকে পাওয়া ডিএনএ কি আমাদের জানাতে পারবে, কোন জিন মানুষের কঙ্কালের বিকাশে কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল।
———
The evolution of hominin bipedalism in two steps. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09399-9
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



