সাইবেরিয়ার পারমাফ্রস্ট থেকে আলাদা করা কিছু অণুজীব (মাইক্রোব) সম্ভবত এক লক্ষ বছরেরও বেশি সময় ধরে জীবিত ছিল, এমনটাই জানা গেছে তাদের ডিএনএ বিশ্লেষণে। তাদের জিনগত মিল অন্য প্রজাতির সঙ্গে এ ইঙ্গিত দেয় যে এত দীর্ঘকাল টিকে থাকার ক্ষমতা জটিল কোষবিশিষ্ট জীবের নিকটাত্মীয় অনেক অণুজীবের মধ্যেই থাকতে পারে।
এর আগে গবেষকেরা প্রাচীন সামুদ্রিক তলানি থেকেও অণুজীব আলাদা করেছিলেন যার বয়স ১০ কোটি বছরেরও বেশি। তবে এত দীর্ঘ সময় ধরে একই জীব আসলে জীবিত থাকতে পারে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারেন লয়েড বলেন, “আমি তো এত দীর্ঘ সময় ধরে কোনো পরীক্ষা চালাতে পারি না। সময় আসলে গবেষণার সবচেয়ে অদ্ভুত ভেরিয়েবল।”
লয়েড ও তাঁর দল এমন জায়গায় অণুজীব খুঁজতে চেয়েছিলেন, যেখানে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তাঁদের ধারণা ছিল, সেখানে যদি কিছু জীবিত থাকে, তবে সেটি নিশ্চয়ই সেই পরিবেশের সমবয়সী। এ উদ্দেশ্যে তাঁরা সাইবেরিয়ার পূর্বতম প্রান্ত চাকচি উপদ্বীপে গিয়ে ২২ মিটার লম্বা বরফকূপ খনন করেন।
এভাবে তাঁরা এমন এক স্তরের সামুদ্রিক তলানি থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, যা প্রায় ১ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ ২০ হাজার বছর আগে জমে গিয়েছিল। এই তলানিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরল পানির ফাঁক ছিল, যেখানে জীবাণুগুলো আটকা পড়ে থাকতে পারে, আর বাইরে থেকে কোনো পুষ্টি বা জীব ঢোকা–বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। লয়েড বলেন, “বরফে জমাট বাঁধার মানে হলো তাদের চারপাশে বরফের গঠন তৈরি হয়।”
এরপরের প্রশ্ন ছিল, কোনগুলো জীবিত আর কোনগুলো মৃত কোষ? গবেষকেরা এজন্য পারমাফ্রস্ট থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডিএনএ টুকরো সিকোয়েন্স করেন এবং সেগুলো থেকে ভিন্ন ভিন্ন জীবাণুর জিনোম পুনর্গঠন করেন। এরপর তাঁরা একটি এনজাইম যোগ করেন, যা ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামত করে, এবং আবারও জিনোম পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চালান।
দেখা যায়, ডিএনএ মেরামতকারী এনজাইম যোগ করার পর বেশিরভাগ জিনোম অনেক বেশি পূর্ণাঙ্গভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে যা ইঙ্গিত দেয় এগুলো মৃত কোষ থেকে এসেছে, কারণ তারা নিজের ডিএনএ অক্ষত রাখতে পারেনি। কিন্তু ছয়টি প্রজাতির জিনোমে প্রায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। এর মানে তাদের ডিএনএ জীবিত কোষ থেকেই এসেছে, যেগুলো বরফে আটকা পড়ার পর অন্তত ১ লক্ষ বছর ধরে সক্রিয়ভাবে নিজেদের জিনোম টিকিয়ে রেখেছে।
এই ছয়টি প্রজাতিই এসেছে প্রোমিথিআর্কিওটা (Promethearchaeota) পর্ব (phylum) থেকে, যাদেরকে অ্যাজগার্ড আর্কিয়া (Asgard archaea) নামেও ডাকা হয়। এই অণুজীবগুলোকেই ধরা হয় ইউক্যারিওটদের (যার মধ্যে প্রাণী, উদ্ভিদ, ছত্রাক ও প্রোটিস্টরা অন্তর্ভুক্ত) সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ জীবিত আত্মীয়।
চায়না ইউনিভার্সিটি অব জিওসায়েন্সেস-এর রেনসিং লিয়াং বলেন, “প্রাচীন পারমাফ্রস্টে জীবিত অ্যাজগার্ড আর্কিয়া আবিষ্কার মানে আমরা তাদের বিবর্তনীয় ইতিহাসে এক নতুন জানালা খুলতে পারলাম… এবং জটিল জীবের উদ্ভবের সময় তারা কীভাবে ভূমিকা রেখেছিল, তা বোঝার চেষ্টা করতে পারব।”
অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, এত দীর্ঘকাল টিকে থাকা অ্যাজগার্ড আর্কিয়া আর তুলনামূলক খোলা পরিবেশে পাওয়া অ্যাজগার্ড আর্কিয়ার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। সবার মধ্যেই প্রোটিন ও ডিএনএ মেরামতের মতো একই ধরনের জিন রয়েছে, যা তাদের কোষ বিভাজন ছাড়াই খুব ধীরে ধীরে অংশ বদলাতে সাহায্য করেছে। লয়েড রসিকতা করে বলেন, “এরা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরস অ্যাজগার্ড। আর এই নিরসতাই প্রমাণ করে যে আসলে তাদের সবার মধ্যেই এ ক্ষমতা রয়েছে।”
রোড আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিফেন ড’হন্ড্ট বলেন, এই গবেষণা আসলেই “একটি বড় অগ্রগতি”—যা থেকে আমরা অস্বাভাবিক দীর্ঘ জীবনকাল বোঝার দিকে এগোচ্ছি, এবং জানতে পারছি এর বিস্তৃতি ও বিবর্তনীয় ভিত্তি সম্পর্কে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ফলাফল পারমাফ্রস্টের মতো জমাট পরিবেশের বাইরের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত নয়। তাঁর ভাষায়, “বরফে জমাট থেকে বহুদিন নিষ্ক্রিয় থাকা আর দীর্ঘদিন খুব কম সক্রিয় থেকে বেঁচে থাকার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে।”
———
Traits enabling persistence of living Promethearchaeota in marine sediments frozen for over 100 kyr, bioRxiv (2025), preprint.
DOI: 10.1101/2025.03.11.642519
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


