আমাদের শরীরে বয়সের দৃশ্যমান প্রভাবগুলোর পেছনে আছে জিনের কার্যকলাপের অদৃশ্য পরিবর্তন। এপিজেনেটিক প্রক্রিয়া ডিএনএ মিথাইলেশন (যেখানে মিথাইল গ্রুপ নামের ছোট ট্যাগ যোগ বা বাদ দেওয়া হয়) বয়স বাড়ার সাথে সাথে কম নির্ভুল হয়ে পড়ে। এর ফলেই জিনের কার্যকলাপে পরিবর্তন আসে, যা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কর্মক্ষমতা কমায় এবং রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
সম্প্রতি ১৭ ধরনের মানব টিস্যুর এপিজেনেটিক পরিবর্তনের ওপর একটি মেটা-অ্যানালাইসিস পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বিস্তৃত চিত্র হাজির করেছে, যা এখন পর্যন্ত বার্ধক্য জিনকে কীভাবে প্রভাবিত করে তার সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র।
গবেষণায় দেখা গেছে, সব টিস্যু একই গতিতে বুড়ো হয় না। যেমন রেটিনা আর পেটের টিস্যুতে বয়স-সম্পর্কিত পরিবর্তন বেশি হয়, অথচ সার্ভিক্স বা ত্বকে তুলনামূলক কম। পাশাপাশি, গবেষকরা সব অঙ্গে সাধারণ কিছু এপিজেনেটিক মার্কার খুঁজে পেয়েছেন। এই “এপিজেনেটিক অ্যাটলাস” বার্ধক্য বোঝা ও বার্ধক্য ঠেকানোর ওষুধের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিক্যুলার বায়োলজিস্ট জোয়াও পেদ্রো মাগালহেস বলেন, “এটা বয়স বোঝার জন্য দুর্দান্ত একটা রিসোর্স। এত বড় মাপের ডেটা আমি আগে দেখিনি, এটা গবেষকদের জন্য খুবই মূল্যবান হবে।”
ডিএনএ মিথাইলেশনের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে ইতিমধ্যেই “এজিং ক্লক” বানানো যায়, যা মানুষের জৈবিক বয়স মাপতে সক্ষম। তবে এখনও প্রশ্ন থেকে যায়, সব টিস্যু কি একই ধরনের বয়সের ছাপ বহন করে?
অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির আইনন ও তাঁর সহকর্মীরা প্রায় ১৫,০০০ নমুনার ওপর গবেষণা করেছেন, যেখানে ১৮ বছর বয়সী থেকে শুরু করে ১০০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের টিস্যু অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁরা ডিএনএর প্রায় ৯ লাখ সম্ভাব্য স্থানে মিথাইলেশনের পরিবর্তন ম্যাপ করে একটি ওপেন-অ্যাক্সেস অ্যাটলাস তৈরি করেছেন।
ফলাফলে দেখা গেছে, গড়ে মিথাইলেশনের হার টিস্যু ভেদে ভিন্ন। যেমন সার্ভিক্সে ৩৫%, ত্বকে ৪৮%, মাংসে ৫১%, হৃদপিণ্ডে ৫৩%, পেটে ৫৭% আর রেটিনায় ৬৩%। বয়সের সাথে প্রায় সব টিস্যুতেই মিথাইলেশন বাড়তে থাকে, ব্যতিক্রম শুধু কঙ্কালপেশী আর ফুসফুস, যেখানে উল্টো কমে যায়।
গবেষকরা টিস্যুগুলোর জিন স্তরে সাধারণ বার্ধক্যের প্রক্রিয়া খুঁজে পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে HDAC4 ও HOX, যেগুলো বার্ধক্য ও কার্যক্ষমতা কমার সাথে যুক্ত। আর MEST, যা ডায়াবেটিস ও স্থূলতার সাথে সম্পর্কিত। দুটোই বার্ধক্যের গতিকে ত্বরান্বিত করে।
তাঁরা আরও দেখেছেন যে PCDHG জিন পরিবারের অতিরিক্ত মিথাইলেশন বহু অঙ্গে বার্ধক্য চালিত করে। আগের গবেষণায় এটিকে মস্তিষ্কের সাদা পদার্থ কমে যাওয়ার সাথে যুক্ত পাওয়া গিয়েছিলো, যা দ্রুত স্মৃতিভ্রংশের লক্ষণ।
গবেষক ম্যাকসু জ্যাক বলেন, এই অ্যাটলাস পুরো শরীর জুড়ে বার্ধক্যের মূল প্রক্রিয়া বুঝতে এবং অ্যান্টি-এজিং থেরাপির নতুন দিক খুঁজে পেতে সহায়ক হবে। তিনি আশা করেন, ভবিষ্যতে আলাদা আলাদা রোগ যেমন হার্ট বা লিভারের বদলে বার্ধক্যকেই মূল সমস্যা ধরে চিকিৎসা করা যাবে।
তবে জার্মানির লিবনিজ ইনস্টিটিউটের এপিজেনেটিসিস্ট হোলগার বিয়ারহফ সতর্ক করে বলেন, মানব জিনোমে প্রায় ৩ কোটি এপিজেনেটিক সাইট আছে, আর এই গবেষণা এখনো তার ক্ষুদ্র অংশকেই কভার করেছে।
আইনন মেনে নিলেও বলেন, তাঁদের ডেটা বার্ধক্যের প্রক্রিয়া উন্মোচন ও তা ধীর করার পথ খুঁজে দিতে পারে। আগের গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়াম মানুষের কঙ্কালপেশীতে তরুণ-ধরনের মিথাইলেশন বজায় রাখতে সাহায্য করে। “শরীরে এমন প্রায় কোনো টিস্যু নেই যা ব্যায়ামের প্রভাব থেকে বঞ্চিত,” তিনি বলেন। তাই ঘুম, খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের মতো বিষয়গুলো কিভাবে বার্ধক্য ধীর করতে পারে তা বোঝার পথও এই গবেষণা খুলে দিয়েছে।
———
DNA Methylation Ageing Atlas Across 17 Human Tissues, Research Square (2025), preprint
DOI: 10.21203/rs.3.rs-7184037/v1
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


