মহাবিশ্বের গান আমরা অবশেষে শুনতে পাচ্ছি! হয়তো কারো কাছে তেমন নাটকীয় কিছু মনে নাও হতে পারে কিন্তু এগুলো যেন মহা-সিম্ফনির সুরের বদলে হালকা পাখির ডাকের মতো। কিন্তু গত এক দশকে এই গানগুলো বিজ্ঞানীদের মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিশাল, অদ্ভুত এবং শক্তিশালী ঘটনাগুলো বোঝার পথে সহায়তা করেছে।
প্রায় ঠিক দশ বছর আগে, লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজারভেটরি (LIGO) প্রথমবারের মতো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ “শুনতে” সক্ষম হয়। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ হলো স্থান-কালের বুননে তৈরি ঢেউ, যা মহাবিশ্বের সবচেয়ে সহিংস সংঘর্ষ থেকে উৎপন্ন হয়। প্রথম সনাক্তকরণ ঘটে ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। সেদিন দুটি কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল মিলিত হয়ে একীভূত হওয়ার সময় যে সুর তৈরি হয়েছিল, তা ধরা পড়ে। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে আলবার্ট আইনস্টাইন যে ধরনের মহাকর্ষীয় তরঙ্গের কথা বলেছিলেন, তা সত্যিই বিদ্যমান। এখন পর্যন্ত LIGO ও অন্যান্য যন্ত্র প্রায় ৩০০টি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ঘটনা শনাক্ত করেছে। আজকে আমরা তিনটি ঘটনার কথা বলবো যার মধ্যে সবচেয়ে লেটেস্ট ঘটনাটি ১৯৭০-এর দশকে মহাকাশবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং প্রদত্ত একটি উপপাদ্যকে সমর্থন করে।
লিভিংস্টন (লুইজিয়ানা) ও হ্যানফোর্ড (ওয়াশিংটন) নামে LIGO-র যমজ দুটি স্থাপনায় লেজার রশ্মি দুইটি বাহুতে প্রতিফলিত হয়। এগুলো L আকারে সাজানো, প্রতিটির দৈর্ঘ্য চার কিলোমিটার। রশ্মিগুলোর অতি ক্ষুদ্র স্থানচ্যুতি স্থান-কালের প্রসারণ ও সংকোচনকে নির্দেশ করে, যা কম্পিউটারের পর্দায় তরঙ্গ হিসেবে রেকর্ড হয়। শব্দে রূপান্তর করলে সেই তরঙ্গ পাখির ডাকের মতো শোনায়।
LIGO-র প্রথম দশ বছরের আবিষ্কারকে উদ্যাপন করতে, এখানে বিশেষজ্ঞদের মতে LIGO-র কিছু সেরা “হিট” তুলে ধরা হলো।
রিং টোন
গতকাল (১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫) Physical Review Letters জার্নালে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যটি এসেছে সবচেয়ে স্পষ্ট মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সংকেত থেকে।
১৪ জানুয়ারির একটি সংকেত যখন LIGO-র তথ্যভাণ্ডারের শোরগোলের মধ্য থেকে ধরা পড়ল, গবেষকরা দুটি কৃষ্ণগহ্বরের মিলনের শব্দ শুনতে পেলেন। তবে এবার তারা সংঘর্ষের পর জন্ম নেওয়া নতুন কৃষ্ণগহ্বরের সৃষ্ট কম্পনও শনাক্ত করতে সক্ষম হন।
ক্রেডিট: Caltech/MIT/LIGO Lab/Matt Heintze
সাধারণত এই “রিংডাউন” ধাপটিকে মিলনের মূল তরঙ্গ থেকে আলাদা করা কঠিন হয়। কিন্তু গত দশ বছরে LIGO-র যন্ত্রগুলো এতটাই সূক্ষ্মভাবে উন্নত করা হয়েছে যে এবার বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সংবেদনশীল পরিমাপ করতে পেরেছেন।
রিংডাউনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে দুটি মূল কৃষ্ণগহ্বর (যাদের সম্মিলিত পৃষ্ঠের আয়তন ছিল ২,৪০,০০০ বর্গকিলোমিটার) একত্র হয়ে আরও বৃহত্তর একটি কৃষ্ণগহ্বর তৈরি করেছে যার পৃষ্ঠের আয়তন ৪,০০,০০০ বর্গকিলোমিটার। এই আয়তনের স্পষ্ট বৃদ্ধি স্টিফেন হকিং-এর “ব্ল্যাক হোল এরিয়া থিওরেম”-এর বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে দিল। সেই উপপাদ্যে বলা হয়েছিল যে কৃষ্ণগহ্বরের পৃষ্ঠের আয়তন কখনোই কমতে পারে না। যদিও হকিং নিজে এই নিশ্চিতকরণ দেখতে পাননি, ২০১৬ সালে তিনি বলেছিলেন যে তিনি মনে করেন LIGO এই কাজটি করতে পারবে।
এই শনাক্তকরণ দ্রুতই “আমার প্রিয়গুলোর একটি হয়ে উঠবে,” বলেন ডেভিড রেইৎসে, ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (প্যাসাডেনা) LIGO ল্যাবরেটরির নির্বাহী পরিচালক। তার সহকর্মী ও LIGO পদার্থবিদ ক্যাটেরিনা চাটজিওআনৌ যোগ করেন, “এটা ছিল আমাদের জন্য নিখুঁত দশম বার্ষিকীর উপহার।”
প্রথম চির্প
LIGO ২০০২ সালে কার্যক্রম শুরু করলেও, ২০১৫ সালের আপগ্রেড শেষ হওয়ার পরেই এটি প্রথমবার মহাকর্ষীয় তরঙ্গের শব্দ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। আর সেটি ছিল এক বিরাট ঘটনা। পাঁচ মাস ধরে বিজ্ঞানীরা বারবার যাচাই করেন যে সংকেতটি কেবলমাত্র ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ নয় কিংবা পরীক্ষার জন্য কৃত্রিমভাবে বসানো “ভুয়া চির্প” নয়। সব যাচাই শেষ হওয়ার পর সারা বিশ্বের সংবাদ সম্মেলনে আনন্দের সঙ্গে আবিষ্কারটি ঘোষণা করা হয়। প্রথমবার বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেলেন যে তারা “মহাবিশ্বের বজ্রধ্বনি শুনতে সক্ষম”, যদিও পৃথিবীতে পৌঁছানোর সময় সেই বজ্রধ্বনি ছিল মাত্র ক্ষুদ্র এক ঝিলিকের মতো, বলেন রেইৎসে।
সেই ঝিলিক এসেছিল ১৩০ কোটি বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি কৃষ্ণগহ্বর সংঘর্ষ থেকে। মহাকর্ষীয় তরঙ্গগুলো সেই সংঘর্ষের পর স্থান-কালের ঢেউ হয়ে যাত্রা শুরু করে এবং অবশেষে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। “এটি ছিল যুগ্ম কৃষ্ণগহ্বর ব্যবস্থা (binary black-hole systems)-এর প্রথম প্রত্যক্ষ প্রমাণ,” বলেন গ্যাব্রিয়েলা গনজালেজ, যিনি তখন LIGO-র মুখপাত্র এবং লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ।
এই শনাক্তকরণ ২০১৭ সালের নোবেল পুরস্কার জয় করে, কারণ এটি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে শতবর্ষ পুরোনো মহাকর্ষীয় তরঙ্গের পূর্বাভাসকে নিশ্চিত করেছিল। তবে আইনস্টাইনের এক জায়গায় ভুল ছিল: তিনি ভেবেছিলেন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কখনোই বাস্তবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে না।
আলোর প্রদর্শনী
২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট, LIGO যখন একটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ঘটনার কম্পন অনুভব করল, তার কয়েক সেকেন্ড পরই নাসার ফার্মি গামা-রে স্পেস টেলিস্কোপ ৪০ মিলিয়ন পারসেক দূর থেকে উচ্চ-শক্তির ফোটনের ঝলক শনাক্ত করে। দুটি শনাক্তকরণ মোটেও কাকতালীয় ছিল না।
বিজ্ঞানীরা উপসংহারে পৌঁছেছেন যে উভয় ঘটনাই ঘটেছিল দুটি নিউট্রন তারার সংঘর্ষ থেকে। নিউট্রন তারা হলো অতিঘন তারার অবশিষ্ট কেন্দ্র, যা একসময় সুপারনোভায় পরিণত হয়েছিল। যখন দুটি তারা একে অপরের চারপাশে ঘূর্ণায়মান হয়ে ধাক্কা খেল, তখন তারা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নির্গত করেছিল, যা কৃষ্ণগহ্বর সংঘর্ষের সঙ্গে মেলেনি। এই ধাক্কা একটি আলোর বিস্ফোরণও তৈরি করে, যাকে বলা হয় গামা-রে বিস্ফোরণ, মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণের ধরন। এটাই প্রমাণ করে যে সংঘর্ষে জড়িত বস্তুগুলো আসলেই নিউট্রন তারা ছিল।
ক্রেডিট: NSF/LIGO/Sonoma State University/A. Simonnet
এই আবিষ্কার কেবল নিউট্রন তারার প্রথম সংঘর্ষ শনাক্তই নয়, বরং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও আলোর যুগপৎ উপস্থিতিরও প্রথম উদাহরণ। এটি নিশ্চিত করে যে নিউট্রন তারার সংঘর্ষ থেকেই গামা-রে বিস্ফোরণ হয় এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও আলো একই গতিতে চলাচল করে (যেমন আইনস্টাইন পূর্বাভাস দিয়েছিলেন)। এ ছাড়া এটি প্রকাশ করে যে এমন সংঘর্ষ থেকে স্বর্ণ ও প্লাটিনামের মতো ভারী উপাদান তৈরি হয়। তাই গবেষকেরা একে “গোল্ড মাইন” ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। “মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে এটি এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ আবিষ্কার,” বলেন পিটার ফ্রিটশেল, এমআইটির কেমব্রিজ ক্যাম্পাসে LIGO-র সহকারী পরিচালক।
“এটাই ছিল সেই উৎস যেটির জন্য আমরা অপেক্ষা করছিলাম, আর এটি আতশবাজির মতো এল,” বলেন গনজালেজ।
বোনাস: দৈত্যাকার সংঘর্ষ
২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর, LIGO শনাক্ত করে দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ। কৃষ্ণগহ্বরদুটির ভর যথাক্রমে সূর্যের ভরের ১০০ এবং ১৪০ গুণ। এত বৃহৎ ভরের বস্তুর সংঘর্ষ LIGO আগে কখনো ধরতে পারেনি। এর ফলে যে বিশাল কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হলো, তার ভর সূর্যের ভরের ২২৫ গুণ।
ক্রেডিট: The SXS Project
এই দুটি কৃষ্ণগহ্বর অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ঘুরছিল। তাদের একটি নাকি আশেপাশের স্থান-কালের বুননকে এমনভাবে বিকৃত করেছিল, যা টর্নেডোর মতো মনে হয়, বলেন জার্মানির পটসডামে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাভিটেশনাল ফিজিক্স-এর পরিচালক আলেসান্দ্রা বুয়োনান্নো। গবেষকেরা মনে করেন, এই কৃষ্ণগহ্বরগুলো নিজেরাও আগে সংঘর্ষ থেকে তৈরি হয়েছিল। ফলে সর্বশেষ সংঘর্ষে যে কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয়েছে, তাকে এক অর্থে তাদের “নাতি” বলা যায়। সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এর পেছনে হয়তো একটি জটিল গঠন-ইতিহাস রয়েছে।
———
GW250114: Testing Hawking’s Area Law and the Kerr Nature of Black Holes. Physical Review Letters (2025).
DOI: 10.1103/kw5g-d732
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।






