২০২৫ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন জন ক্লার্ক (John Clarke), মিশেল এইচ. দ্যভোরে (Michel H. Devoret) এবং জন এম. মার্টিনিস (John M. Martinis) তাদের “ইলেকট্রিক সার্কিটে ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং এবং এনার্জি কোয়ান্টাইজেশন আবিষ্কারের জন্য”। তারা একাধিক পরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে কোয়ান্টাম জগতের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যগুলো হাতে ধরা যায় এমন একটি বড় সিস্টেমেও বাস্তব রূপ দেওয়া সম্ভব। তাদের তৈরি সুপারকন্ডাক্টিং বৈদ্যুতিক সিস্টেম একটি অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় “টানেলিং” করতে পারে, যেন এটি সরাসরি কোনো দেয়াল ভেদ করে যাচ্ছে। তারা আরও দেখিয়েছেন যে এই সিস্টেম নির্দিষ্ট আকারের শক্তি শোষণ ও নিঃসরণ করে, ঠিক যেমনটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
ব্রেকিং নিউজ!
২০২৫ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ. দ্যভোরে এবং জন এম. মার্টিনিস-কে “ইলেকট্রিক সার্কিটে ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং এবং এনার্জি কোয়ান্টাইজেশন আবিষ্কারের জন্য”।#NobelPrize pic.twitter.com/fe4iItobXH
— বিজ্ঞানবার্তা – BigganBarta (@bigganbarta) October 7, 2025
কোয়ান্টাম মেকানিক্স এমন সব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে যা সাধারণত একক কণার মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে এসব ঘটনাকে “মাইক্রোস্কোপিক” বলা হয়, যদিও এগুলো অনেক সময় অপটিক্যাল মাইক্রোস্কোপ দিয়েও দেখা যায় না। এর বিপরীতে রয়েছে “ম্যাক্রোস্কোপিক” ঘটনা, যা বিপুল সংখ্যক কণার সমষ্টি দিয়ে গঠিত। যেমন, একটি ক্রিকেট বল অসংখ্য অণুর সমন্বয়ে তৈরি, এবং এতে কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল প্রভাব দেখা যায় না। আমরা জানি বলটি দেয়ালে ছুড়ে মারলে প্রতিবারই ফিরে আসবে। কিন্তু একটি একক কণা কখনও কখনও তার ক্ষুদ্র জগতে একই ধরনের প্রতিবন্ধক ভেদ করে অপর প্রান্তে চলে যেতে পারে। এ ঘটনাকে বলা হয় কোয়ান্টাম টানেলিং।
এ বছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে সেইসব পরীক্ষাকে, যেগুলো দেখিয়েছে কীভাবে কোয়ান্টাম টানেলিং অনেক কণার সমন্বয়ে গঠিত ম্যাক্রোস্কোপিক মাত্রায় পর্যবেক্ষণ করা যায়। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলেতে জন ক্লার্ক, মিশেল দ্যভোরে ও জন মার্টিনিস একাধিক পরীক্ষা পরিচালনা করেন। তারা দুটি সুপারকন্ডাক্টর দিয়ে একটি বৈদ্যুতিক বর্তনী তৈরি করেন যেখানে বিদ্যুৎ কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই প্রবাহিত হতে পারে। এরপর এগুলোর মাঝে বসানো হয় এমন একটি পাতলা স্তর যা একেবারেই বিদ্যুৎ পরিবাহক নয়। এই পরীক্ষায় তারা দেখান যে, সুপারকন্ডাক্টরের সব চার্জযুক্ত কণা একসাথে মিলিত হয়ে এমনভাবে আচরণ করে যেন তারা পুরো বর্তনীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটি একক কণা।
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
এই কণাসদৃশ সিস্টেমটি এমন এক অবস্থায় আটকে থাকে যেখানে ভোল্টেজ ছাড়াই শুধু কারেন্ট প্রবাহিত হয় এবং এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার মতো পর্যাপ্ত শক্তি এর থাকে না। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যায়, সিস্টেমটি তার কোয়ান্টাম চরিত্র প্রকাশ করে অর্থাৎ টানেলিং ব্যবহার করে শূন্য ভোল্টেজ অবস্থার বাইরে বেরিয়ে এসে বৈদ্যুতিক ভোল্টেজ সৃষ্টি করে। গবেষকেরা আরও দেখাতে সক্ষম হন যে সিস্টেমটি কোয়ান্টাইজড, অর্থাৎ এটি কেবল নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি শোষণ বা নির্গত করতে পারে।
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
তাদের গবেষণায় কাজে লেগেছে এমন কিছু তাত্ত্বিক ধারণা ও পরীক্ষামূলক উপকরণ, যা দশকের পর দশক ধরে বিকশিত হয়েছে। আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মূলভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। গত এক শতাব্দী ধরে গবেষকেরা এর নানা দিক অনুসন্ধান করেছেন।
কণার টানেলিং ক্ষমতা নতুন কিছু নয়। ১৯২৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানী জর্জ গ্যামভ বুঝতে পারেন যে, ভারী কিছু পরমাণু নিউক্লিয়াস একটি বিশেষ ধরনের ক্ষয়প্রক্রিয়ায় ভেঙে পড়ে আর এর কারণ হলো টানেলিং। নিউক্লিয়াসের ভেতরে ক্রিয়াশীল বলগুলো এর চারপাশে একধরনের বাধা বা “ব্যারিয়ার” তৈরি করে, যা কণাগুলোকে ভেতরে আটকে রাখে। কিন্তু তারপরও মাঝে মাঝে নিউক্লিয়াসের একটি ক্ষুদ্র অংশ এই প্রতিবন্ধক পেরিয়ে বাইরে চলে আসে এবং পালিয়ে যায় ফলে মূল নিউক্লিয়াস অন্য একটি মৌলে রূপান্তরিত হয়। টানেলিং না থাকলে এ ধরনের নিউক্লিয়ার ক্ষয় সম্ভব হতো না।
টানেলিং হলো এক ধরনের কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া, যেখানে সম্ভাবনা বা সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো কোনো পরমাণু নিউক্লিয়াসের বাধা বা ব্যারিয়ার খুবই উঁচু ও প্রশস্ত হয়, তাই এর ভেতর থেকে একটি অংশের বাইরে আসতে অনেক সময় লাগে। আবার কিছু নিউক্লিয়াস সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। যদি আমরা কেবল একটি মাত্র পরমাণুর দিকে তাকাই, তখন অনুমান করা সম্ভব নয় ঠিক কবে ক্ষয় হবে। কিন্তু একই ধরনের বিপুল সংখ্যক নিউক্লিয়াস একসাথে পর্যবেক্ষণ করলে গড়পড়তা কত সময় পর টানেলিং ঘটে তা নির্ধারণ করা যায়। এ সময়কে সাধারণত হাফ-লাইফ বা অর্ধায়ু দিয়ে বর্ণনা করা হয়। অর্ধায়ু হলো যে সময়ের মধ্যে একটি নমুনার অর্ধেক নিউক্লিয়াস ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যায়।
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
পদার্থবিজ্ঞানীরা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, একসাথে একাধিক কণার টানেলিং কি পরীক্ষা করা সম্ভব? নতুন ধরনের এ পরীক্ষার ধারণা আসে এমন এক বিশেষ ঘটনাকে ঘিরে, যা ঘটে যখন কোনো কিছু পদার্থকে অতি নিম্ন তাপমাত্রায় শীতল করা হয়।
সাধারণ পরিবাহী পদার্থে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় কারণ সেখানে ইলেকট্রনগুলো মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারে। কিন্তু কিছু পদার্থে পরিস্থিতি ভিন্ন, যখন এগুলো অত্যন্ত ঠান্ডা হয়, তখন আলাদা আলাদা ইলেকট্রন আর স্বাভাবিকভাবে ছুটোছুটি করে না; বরং তারা সামঞ্জস্যপূর্ণ নাচের মতো সমন্বিত হয়ে প্রতিরোধ ছাড়াই প্রবাহিত হয়। এ অবস্থায় পদার্থটি সুপারকন্ডাক্টর হয়ে যায়। আর ইলেকট্রনগুলো জোড়ায় জোড়ায় যুক্ত হয়, যাদের বলা হয় কুপার জুটি (Cooper pairs)। লিওন কুপারের নাম অনুসারে এ নামকরণ করা হয়েছে। কুপার, জন বার্ডিন ও রবার্ট শ্রিফার একসাথে ব্যাখ্যা করেছিলেন সুপারকন্ডাক্টর কীভাবে কাজ করে। এর জন্য তারা ১৯৭২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারও পান।
কুপার জুটি সাধারণ ইলেকট্রনের মতো আচরণ করে না। সাধারণত ইলেকট্রনরা একে অপরের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে না। একই বৈশিষ্ট্যের দুটি ইলেকট্রন একই জায়গায় থাকতে পারে না। যেমন, একটি পরমাণুতে ইলেকট্রনরা ভিন্ন ভিন্ন শক্তিস্তরে (শেল) নিজেদের সাজিয়ে নেয়। কিন্তু যখন ইলেকট্রনরা সুপারকন্ডাক্টরে জোড়ায় যুক্ত হয়, তখন তারা কিছুটা তাদের স্বতন্ত্রতা হারায়। আলাদা দুটি ইলেকট্রন সবসময় ভিন্ন, কিন্তু দুটি কুপার জুটি একেবারে অভিন্ন হতে পারে। এর মানে হলো সুপারকন্ডাক্টরের সব কুপার জুটি মিলে একক সত্তা বা একক কোয়ান্টাম সিস্টেম হিসেবে বর্ণনা করা যায়। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় একটি একক ওয়েভ ফাংশন। এই ওয়েভ ফাংশন বর্ণনা করে, নির্দিষ্ট অবস্থায় নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসহ সিস্টেমকে দেখার সম্ভাবনা কতটুকু।
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
যদি দুটি সুপারকন্ডাক্টরকে মাঝখানে একটি পাতলা ইনসুলেটর বা প্রতিবন্ধক বসিয়ে যুক্ত করা হয়, তবে সেটিকে বলা হয় জোসেফসন জংশন (Josephson junction)। পদার্থবিজ্ঞানী ব্রায়ান জোসেফসনের নামানুসারে এটির নামকরণ হয়েছে। তিনি এই জংশনের জন্য কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল হিসাব করেছিলেন এবং আবিষ্কার করেছিলেন যে, জংশনের দুই পাশে থাকা ওয়েভ ফাংশন একত্রে বিবেচনা করলে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ঘটনা দেখা দেয় এবং এর জন্য তিনি ১৯৭৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
জোসেফসন জংশন দ্রুতই নানা ক্ষেত্রে ব্যবহার শুরু হয়, যেমন মৌলিক ভৌত ধ্রুবক ও চৌম্বক ক্ষেত্রের অত্যন্ত নির্ভুল পরিমাপে।
এই গঠন পদার্থবিজ্ঞানীদের নতুনভাবে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক দিকগুলো অন্বেষণের সুযোগ দেয়। এর মধ্যে একজন ছিলেন অ্যান্থনি লেগেট, যিনি জোসেফসন জংশনে ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম টানেলিং নিয়ে তাত্ত্বিক কাজ করেছিলেন। তার গবেষণা নতুন ধরনের পরীক্ষার অনুপ্রেরণা দেয় এবং এর জন্য তিনি ২০০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
এই বিষয়গুলো জন ক্লার্কের গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে একেবারে মিলে যায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করার পর তিনি বার্কলেতে চলে আসেন এবং সেখানে নিজের গবেষণা দল গড়ে তোলেন। তিনি মূলত সুপারকন্ডাক্টর এবং জোসেফসন জংশন ব্যবহার করে বিভিন্ন ঘটনা অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, প্যারিস থেকে পিএইচডি শেষ করার পর মিশেল দ্যভোরে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে জন ক্লার্কের দলে যোগ দেন। একই দলে ছিলেন পিএইচডি শিক্ষার্থী জন মার্টিনিস। তারা একসাথে ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম টানেলিং প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ নেন। পরীক্ষার যন্ত্রপাতিকে বাইরের যেকোনো প্রভাব থেকে রক্ষা করতে অনেক বেশি যত্ন ও নির্ভুলতা প্রয়োজন ছিল। তারা তাদের বৈদ্যুতিক বর্তনীর প্রতিটি বৈশিষ্ট্য সঠিকভাবে মাপতে এবং বুঝতে সফল হন।
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
কোয়ান্টাম ঘটনাগুলো মাপার জন্য তারা জোসেফসন জংশনে একটি দুর্বল কারেন্ট পাঠান এবং ভোল্টেজ মাপেন, যা বর্তনীর বৈদ্যুতিক রোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। শুরুতে জোসেফসন জংশনের ওপরে ভোল্টেজ ছিল শূন্য, যেমনটা আশা করা হয়েছিল। কারণ, সিস্টেমের ওয়েভ ফাংশন এমন এক অবস্থায় আটকে থাকে যেখানে কোনো ভোল্টেজ সৃষ্টি হতে পারে না। এরপর তারা গবেষণা করেন, এই অবস্থা থেকে সিস্টেম টানেলিং করে বের হতে কত সময় লাগে এবং তখন ভোল্টেজ তৈরি হয়। যেহেতু কোয়ান্টাম মেকানিক্সে সম্ভাবনার ভূমিকা থাকে, তাই তারা অসংখ্যবার মাপজোখ করেন এবং ফলাফল গ্রাফে অঙ্কন করেন। সেখান থেকে তারা শূন্য-ভোল্টেজ অবস্থায় থাকার সময়কাল নির্ণয় করতে সক্ষম হন। এটি অনেকটা যেমন অণুকেন্দ্রের অর্ধায়ু মাপার ক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক ক্ষয়ের পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করা হয়।
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
টানেলিং প্রমাণ করে যে পরীক্ষায় সুপারকন্ডাক্টরের কুপার জুটিগুলো তাদের সামঞ্জস্যপূর্ণ নাচে এমনভাবে আচরণ করে যেন তারা একটি বিশাল একক কণা। গবেষকেরা আরও নিশ্চিত হন যখন তারা দেখেন যে সিস্টেমে শক্তির মাত্রা (energy levels) কোয়ান্টাইজড। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নামই এসেছে এই পর্যবেক্ষণ থেকে, ক্ষুদ্র জগতে শক্তি আলাদা আলাদা প্যাকেজ বা কোয়ান্টা আকারে বিভক্ত থাকে।
নোবেলজয়ীরা শূন্য-ভোল্টেজ অবস্থায় বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাইক্রোওয়েভ প্রেরণ করেন। এদের মধ্যে কিছু শোষিত হয় এবং সিস্টেম উচ্চতর শক্তিস্তরে পৌঁছে যায়। এতে দেখা যায়, সিস্টেমে যত বেশি শক্তি থাকে, শূন্য-ভোল্টেজ অবস্থার স্থায়িত্ব তত কম হয় যা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পূর্বাভাসের সঙ্গেই মিলে যায়। আসলে, একটি ক্ষুদ্র কণা কোনো বাধার পেছনে আটকা থাকলেও একইভাবে আচরণ করে।
এই পরীক্ষা কোয়ান্টাম মেকানিক্স বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। সাধারণত যে ধরনের কোয়ান্টাম প্রভাব ম্যাক্রোস্কোপিক মাত্রায় দেখা যায়, সেগুলো গড়ে ওঠে অসংখ্য ক্ষুদ্র উপাদান ও তাদের আলাদা আলাদা কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে। যেমন, লেজার, সুপারকন্ডাক্টর বা সুপারফ্লুইড তরল। কিন্তু এই পরীক্ষায় ভিন্ন কিছু ঘটেছে। একটি সম্পূর্ণ ম্যাক্রোস্কোপিক অবস্থা (অগণিত কণার অভিন্ন ওয়েভ ফাংশন) থেকেই সরাসরি একটি ম্যাক্রোস্কোপিক প্রভাব অর্থাৎ পরিমাপযোগ্য ভোল্টেজ সৃষ্টি হয়েছে।
অ্যান্থনি লেগেটের মতো তাত্ত্বিক পদার্থবিদরা নোবেলজয়ীদের তৈরি ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম সিস্টেম–এর তুলনা করেছেন এরভিন শ্রোডিঙ্গারের বিখ্যাত চিন্তাপ্রসূত পরীক্ষার সঙ্গে, যেখানে একটি বাক্সের ভেতরে বিড়ালকে কল্পনা করা হয় একসাথে জীবিত ও মৃত, যদি না আমরা ভেতরে তাকাই। (এরভিন শ্রোডিঙ্গার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৩৩ সালে।) তার এই চিন্তাপ্রসূত পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল দেখানো যে, এ ধরনের অবস্থা আসলে কতটা অযৌক্তিক, কারণ সাধারণত কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো ম্যাক্রোস্কোপিক মাত্রায় মুছে যায়। পুরো একটি বিড়ালের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য কোনো ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
কিন্তু লেগেট যুক্তি দেখান যে জন ক্লার্ক, মিশেল দ্যভোরে ও জন মার্টিনিসের ধারাবাহিক পরীক্ষা প্রমাণ করেছে যে, অসংখ্য কণার সমন্বয়ে গঠিত সিস্টেমও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী আচরণ করতে পারে। অসংখ্য কুপার জুটির এই সিস্টেম একটি বিড়ালের তুলনায় বহু গুণ ছোট হলেও যেহেতু পুরো সিস্টেমের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য একসাথে মাপা যায়, তাই একজন কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানীের কাছে এটি অনেকটা শ্রোডিঙ্গারের কল্পিত বিড়ালের সমতুল্য।
এ ধরনের ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম অবস্থা কণার ক্ষুদ্র জগতের নিয়মকানুনকে কাজে লাগিয়ে নতুন পরীক্ষার সম্ভাবনা উন্মোচন করে। একে বড় স্কেলে এক ধরনের কৃত্রিম পরমাণু হিসেবে ধরা যেতে পারে আর্থাৎ একটি পরমাণু, যার তার ও সকেট আছে, যা নতুন পরীক্ষামূলক যন্ত্রে যুক্ত করা যায় কিংবা নতুন কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে কাজে লাগানো যায়। উদাহরণস্বরূপ, কৃত্রিম পরমাণু ব্যবহার করা হয় অন্য কোয়ান্টাম সিস্টেমের অনুকরণ করতে এবং সেগুলোকে বুঝতে সাহায্য করতে।
আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো জন মার্টিনিসের করা কোয়ান্টাম কম্পিউটার সংক্রান্ত পরীক্ষা, যেখানে তিনি এনার্জি কোয়ান্টাইজেশন ব্যবহার করেন (যেটি তিনি ও অন্য দুই নোবেলজয়ী প্রথম প্রদর্শন করেছিলেন)। তিনি এমন একটি বর্তনী ব্যবহার করেন, যেখানে কোয়ান্টাইজড অবস্থাগুলো তথ্যের বাহক হিসেবে কাজ করে যেগুলোকে বলা হয় কোয়ান্টাম বিট (কিউবিট)। সবচেয়ে নিম্ন শক্তি-অবস্থা শূন্য হিসেবে এবং তার পরের ধাপ এক হিসেবে ধরা হয়। সুপারকন্ডাক্টিং সার্কিট হলো ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির প্রচেষ্টায় অনুসন্ধান করা প্রযুক্তিগুলোর একটি।
সুতরাং এ বছরের নোবেলজয়ীরা পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে ব্যবহারিক সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের ভৌত জগত সম্পর্কে তাত্ত্বিক বোঝাপড়াতেও নতুন দিক উন্মোচন করেছেন।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।








