সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন এবং ওমর এম. ইয়াগি ২০২৫ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন এক নতুন ধরনের মলিকিউলার আর্কিটেকচার (molecular architecture) উদ্ভাবনের জন্য। তারা উদ্ভাবন করেছে মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস (MOF)। তাদের তৈরি কাঠামোর ভেতরে রয়েছে বড় বড় ফাঁকা স্থান, যেখানে অণুগুলো সহজে ঢুকতে ও বের হতে পারে। গবেষকেরা এগুলো ব্যবহার করেছেন মরুভূমির বাতাস থেকে পানি সংগ্রহে, পানি দূষণকারী উপাদান আলাদা করতে, কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ করতে এবং হাইড্রোজেন সংরক্ষণে।
ব্রেকিং নিউজ!
২০২৫ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় সুসুমু কিতাগাওয়া (Susumu Kitagawa), রিচার্ড রবসন (Richard Robson) ও ওমর এম. ইয়াগি (Omar M. Yaghi)-কে “মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক উদ্ভাবনের জন্য”।#NobelPrize pic.twitter.com/afsK2iHdUC
— বিজ্ঞানবার্তা – BigganBarta (@bigganbarta) October 8, 2025
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সারা বিশ্বের ল্যাবরেটরিগুলো নানা ধরনের এমন কাঠামো তৈরি করেছে। কিছু নকশা বিশেষভাবে তৈরি হয়েছে কার্বন ডাই-অক্সাইড আটকানোর জন্য, কিছু পানির থেকে PFAS আলাদা করার জন্য, আবার কিছু শরীরে ওষুধ সরবরাহে,কিছু ভয়াবহ বিষাক্ত গ্যাস নিয়ন্ত্রণে। কিছু MOF ফল থেকে নির্গত ইথিলিন গ্যাস আটকে দিতে পারে যাতে ফল ধীরে পাকে। কিছু MOF পরিবেশে থাকা অ্যান্টিবায়োটিকের সামান্য অংশ ভেঙে দিতে সক্ষম এনজাইমকে ঘিরে রাখতে পারে।
সহজভাবে বললে, মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস অত্যন্ত কার্যকর। কিতাগাওয়া, রবসন ও ইয়াগি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কারণ তারাই প্রথম MOF তৈরি করেন এবং এর বিরাট সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র দেখান। তাদের কাজের ফলেই আজ রসায়নবিদরা কয়েক হাজার ভিন্ন ধরনের MOF ডিজাইন করতে পেরেছেন, যা রসায়নে এক নতুন বিস্ময়ের দ্বার খুলে দিয়েছে।
যেমনটা বিজ্ঞানে প্রায়ই ঘটে, ২০২৫ সালের নোবেল রসায়ন পুরস্কারের গল্পও শুরু হয় একজনের প্রচলিত ধারা ভেঙে চিন্তা করার মাধ্যমে। এবার অনুপ্রেরণা এসেছিল এক সাধারণ রসায়ন ক্লাসের প্রস্তুতির সময়, যেখানে ছাত্রদের দণ্ড ও বল দিয়ে অণুর মডেল বানানোর কথা ছিল।
১৯৭৪ সাল। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন রিচার্ড রবসন। তাকে বলা হয়েছিল কাঠের বল দিয়ে পরমাণুর মডেল বানাতে, যাতে ছাত্ররা অণুর গঠন তৈরি করতে পারে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্কশপে কাঠের বলগুলোয় গর্ত করতে হতো, যাতে কাঠের দণ্ড (রাসায়নিক বন্ধন) সেগুলোর সঙ্গে জোড়া লাগানো যায়। তবে গর্তগুলো এলোমেলোভাবে করা সম্ভব ছিল না। প্রতিটি পরমাণু (যেমন কার্বন, নাইট্রোজেন বা ক্লোরিন) নির্দিষ্টভাবে রাসায়নিক বন্ধন তৈরি করে। তাই রবসনকে গর্তের অবস্থান সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হতো।
ওয়ার্কশপ কাঠের বলগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার পর রবসন সেগুলো দিয়ে কিছু অণুর মডেল বানিয়ে দেখলেন। তখনই তার মাথায় এক উপলব্ধি এলো: গর্তগুলো যে নির্দিষ্টভাবে বসানো হয়েছে, সেটাই আসলে বিপুল পরিমাণ তথ্য বহন করছে। কারণ গর্তের অবস্থানের জন্যই মডেল অণুগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক আকার ও গঠন নিচ্ছিল। এখান থেকেই নতুন এক প্রশ্ন জন্ম নিল, যদি তিনি পৃথক পরমাণুর পরিবর্তে অণুগুলোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের অণুকে একসঙ্গে জুড়ে দেন, তাহলে কি একেবারে নতুন ধরনের আণবিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে?
প্রতিবছর যখন তিনি ছাত্রদের পড়াতে কাঠের মডেল বের করতেন, তখনই একই ভাবনা তাকে তাড়িত করত। তবে বাস্তবে তা পরীক্ষা করতে তার লেগে গেল এক দশকেরও বেশি সময়। অবশেষে তিনি হীরকের গঠনে অনুপ্রাণিত একটি সরল মডেল দিয়ে শুরু করলেন। হীরকে প্রতিটি কার্বন পরমাণু চারটি পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি ক্ষুদ্র পিরামিড তৈরি করে। রবসনের লক্ষ্য ছিল একই রকম একটি গঠন তৈরি করা, তবে তার কাঠামো হতো ধনাত্মক আধানযুক্ত কপার আয়ন (Cu+) দিয়ে। কার্বনের মতো কপারও চারটি পরমাণুর সঙ্গে থাকতে পছন্দ করে।
তিনি এই কপার আয়নের সঙ্গে চার বাহু বিশিষ্ট একটি অণু 4′,4″,4”’,4””-tetracyanotetraphenylmethane মিশ্রিত করলেন। নামটি মনে রাখার প্রয়োজন নেই, তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিটি বাহুর শেষে ছিল নাইট্রাইল নামক একটি রাসায়নিক গোষ্ঠী, যা ধনাত্মক আধানযুক্ত কপার আয়নের প্রতি আকৃষ্ট হতো।
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
সেই সময় বেশিরভাগ রসায়নবিদই ভেবেছিলেন, এভাবে কপার আয়নের সঙ্গে চার-বাহুবিশিষ্ট অণু মেশালে কেবল জটলা তৈরি হবে। কিন্তু রবসনের ক্ষেত্রে হলো উল্টোটা। যেমনটা তিনি ভেবেছিলেন, আয়ন ও অণুর অন্তর্নিহিত আকর্ষণ নিজে থেকেই কাজ করল। ফলে তারা নিজেদের সাজিয়ে নিল এক বৃহৎ আণবিক কাঠামোয়। হীরকের কার্বন পরমাণুর মতোই তারা একটি নিয়মিত স্ফটিক গঠন করল। তবে পার্থক্য হলো, হীরা যেখানে শক্ত ও ঘন পদার্থ, সেখানে এই স্ফটিকের ভেতর তৈরি হলো অসংখ্য বিশাল ফাঁকা স্থান।
১৯৮৯ সালে রবসন তার এই নতুন রসায়নিক উদ্ভাবন প্রকাশ করেন Journal of the American Chemical Society-তে। তার আর্টিকেল তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পনা করেন এবং বলেন, এই পদ্ধতি হয়তো একেবারে নতুন উপায়ে পদার্থ নির্মাণের দরজা খুলে দিতে পারে। এমন পদার্থ তৈরি করা সম্ভব হবে যাদের বৈশিষ্ট্য আগে কখনো দেখা যায়নি আর সেগুলো মানবজাতির জন্য উপকারী হতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে, তিনি ভবিষ্যৎকে সঠিকভাবেই অনুমান করেছিলেন।
তার অগ্রণী কাজ প্রকাশের পরের বছরই রবসন বিভিন্ন নতুন ধরনের আণবিক কাঠামো উপস্থাপন করলেন, যেগুলোর ফাঁকা স্থান নানা পদার্থে পূর্ণ করা যায়। এর মধ্যে একটি ব্যবহার করে তিনি আয়ন বিনিময়ের পরীক্ষা চালান। আয়নে ভরা সেই কাঠামোকে তিনি এমন এক তরলে ডুবিয়ে রাখেন, যেখানে ভিন্ন ধরনের আয়ন ছিল। ফল হলো, আয়নগুলো নিজেদের জায়গা বদলে নিল। এভাবেই তিনি প্রমাণ করলেন যে, পদার্থ কাঠামোর ভেতরে ঢুকতে ও বের হতে পারে।
তার পরীক্ষায় রবসন দেখিয়েছিলেন যে, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে এমন স্ফটিক তৈরি করা যায় যার ভেতরে প্রশস্ত ফাঁকা স্থান থাকে এবং সেগুলো নির্দিষ্ট রাসায়নিকের জন্য উপযোগী করে সাজানো সম্ভব। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, এই ধরনের নতুন আণবিক কাঠামো যদি সঠিকভাবে নকশা করা যায় তাহলে তা রাসায়নিক বিক্রিয়ার অনুঘটক হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে রবসনের তৈরি কাঠামোগুলো ছিল বেশ নড়বড়ে এবং সহজেই ভেঙে যেত। অনেক রসায়নবিদ এগুলোকে নিরর্থক বলে মনে করলেও, কিছু গবেষক বুঝতে পেরেছিলেন তিনি আসলে এক গুরুত্বপূর্ণ পথ ধরেছেন। তাদের কাছে রবসনের ধারণা ভবিষ্যতের জন্য অগ্রণী এক চেতনা জাগিয়ে তোলে। আর যাঁরা পরে তার স্বপ্নের ভিত্তি মজবুত করেন, তারা হলেন সুসুমু কিতাগাওয়া এবং ওমর ইয়াগি। ১৯৯২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে তারা আলাদাভাবে একাধিক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। এখন শুরু করা যাক ১৯৯০-এর দশক থেকে, যখন কিতাগাওয়া কাজ করছিলেন জাপানের কিনদাই বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তার গবেষণা জীবনে সুসুমু কিতাগাওয়া সবসময় একটি মূলনীতি অনুসরণ করেছেন: “যা নিরর্থক মনে হয়, তাতেও থাকতে পারে দরকারি কিছু।” তরুণ বয়সে তিনি নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত হিদেকি ইউকাওয়ার লেখা একটি বই পড়েছিলেন। সেখানে ইউকাওয়া প্রাচীন চীনা দার্শনিক ঝুয়াংজি’র উক্তি উদ্ধৃত করেন, আমাদের উচিত কী সত্যিই উপকারী আর কী নয়, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা। কোনো কিছুর তাৎক্ষণিক সুবিধা না থাকলেও তা ভবিষ্যতে মূল্যবান প্রমাণিত হতে পারে।
এই দর্শন থেকেই কিতাগাওয়া ছিদ্রযুক্ত আণবিক কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা খুঁজতে শুরু করেন। তিনি মনে করতেন, এগুলোর নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য থাকা জরুরি নয়। ১৯৯২ সালে তিনি যখন তার প্রথম আণবিক কাঠামো উপস্থাপন করেন, সেটি আসলেই খুব একটা কার্যকর ছিল না। সেটি ছিলো একটি দ্বিমাত্রিক পদার্থ, যার ফাঁকা জায়গায় অ্যাসিটোন অণু লুকিয়ে থাকতে পারত। কিন্তু এই কাজ ছিল অণু দিয়ে কাঠামো বানানোর নতুন ধরনের চিন্তার ফলাফল। রবসনের মতো তিনিও তামার আয়নকে (copper ion) কোণার পাথর হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যেগুলোকে বড় অণুর মাধ্যমে একত্রে যুক্ত করা হয়েছিল।
কিতাগাওয়া এই নতুন ধরনের নির্মাণ প্রযুক্তি নিয়ে আরও পরীক্ষা চালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যখন তিনি গবেষণা তহবিলের জন্য আবেদন করলেন, অর্থদাতারা তার পরিকল্পনায় বিশেষ কোনো তাৎপর্য খুঁজে পাননি। তার তৈরি পদার্থগুলো ছিল অস্থিতিশীল আর নির্দিষ্ট কোনো ব্যবহারও ছিল না, তাই তার বেশিরভাগ প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যাত হয়।
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
তবে তিনি হাল ছাড়েননি। অবশেষে ১৯৯৭ সালে তিনি প্রথম বড় সাফল্য অর্জন করেন। কোবাল্ট, নিকেল বা দস্তা (zinc) আয়ন এবং 4,4′-বাইপাইরিডিন নামের একটি অণু ব্যবহার করে তার গবেষণা দল ত্রি-মাত্রিক মেটাল–অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস তৈরি করে, যেগুলোর মধ্যে খোলা চ্যানেল ছিল। এ ধরনের একটি পদার্থ শুকিয়ে অর্থাৎ পানি সরিয়ে ফেলার পর দেখা গেলো এটি স্থিতিশীল রয়ে গেছে, আর ফাঁকা জায়গাগুলো গ্যাসে পূর্ণ করা সম্ভব। পদার্থটি মিথেন, নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন শোষণ ও নির্গমন করতে পারছিল, তাও কোনো আকার না বদলিয়ে।
কিতাগাওয়ার তৈরি কাঠামোগুলো একদিকে স্থিতিশীল, অন্যদিকে কার্যকরী ছিল, কিন্তু গবেষণা অর্থদাতারা তবুও এতে আকর্ষণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এর একটি কারণ ছিল, রসায়নবিদদের কাছে ইতিমধ্যেই ছিল জিওলাইটস যা সিলিকন ডাই-অক্সাইড দিয়ে তৈরি এক ধরনের ছিদ্রযুক্ত, শক্ত ও স্থিতিশীল পদার্থ। এগুলোও গ্যাস শোষণ করতে পারে। তাহলে কেউ কেন এমন একটি নতুন পদার্থ তৈরি করবে, যা জিওলাইটের মতো ভালো কাজ করে না?
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
সুসুমু কিতাগাওয়া বুঝতে পারলেন, বড় কোনো অনুদান পেতে হলে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে মেটাল–অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস আসলে একেবারে আলাদা কিছু। তাই ১৯৯৮ সালে তিনি Bulletin of the Chemical Society of Japan-এ তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি MOF-এর বেশ কয়েকটি সুবিধা তুলে ধরেন। যেমন, এগুলো বিভিন্ন ধরনের অণু দিয়ে তৈরি করা সম্ভব, ফলে এতে ভিন্ন ভিন্ন কার্যকারিতা যুক্ত করার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। আরেকটি বড় ব্যাপার হলো, তিনি উপলব্ধি করলেন MOF দিয়ে নরম পদার্থও তৈরি করা যায়। জিওলাইটস সাধারণত শক্ত পদার্থ হলেও MOF তৈরি হয় নমনীয় অণুর উপাদান দিয়ে, ফলে এগুলো ভাঁজযোগ্য ও লচকদার হতে পারে।
এরপর তার একমাত্র কাজ ছিল এই ধারণাগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া। কিতাগাওয়া অন্য গবেষকদের সঙ্গে নিয়ে নমনীয় MOF তৈরি করতে শুরু করলেন। আর তারা যখন এই কাজে ব্যস্ত, আমাদের দৃষ্টি এবার ঘুরিয়ে নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে ওমর ইয়াগি আণবিক স্থাপত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
ওমর ইয়াগির জন্য রসায়ন পড়া কোনো সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। তিনি ও তার বহু ভাইবোন জর্ডানের আম্মানে একটি ঘরে বেড়ে উঠেছেন যেখানে বিদ্যুৎ বা পানি কিছুই ছিল না। কঠিন জীবনের মাঝেই স্কুল ছিল তার জন্য একমাত্র আশ্রয়। একদিন, যখন ইয়াগির বয়স দশ, তিনি লুকিয়ে ঢুকে পড়েন স্কুলের লাইব্রেরিতে, যা সাধারণত বন্ধ থাকত। এলোমেলোভাবে একটি বই তুলে নিয়ে খুলতেই তার চোখ আটকে গেল অদ্ভুত অথচ মুগ্ধকর ছবিতে, সেটাই ছিল তার প্রথম আণবিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচয়।
১৫ বছর বয়সে, বাবার কঠোর নির্দেশে ইয়াগি পড়াশোনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। প্রথমে তিনি রসায়নের প্রতি আকৃষ্ট হন, পরে নতুন পদার্থ নকশার শিল্প তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তবে তিনি দ্রুতই বুঝতে পারেন প্রচলিত উপায়ে নতুন অণু তৈরি করা বেশ অনিশ্চিত। সাধারণত রসায়নবিদরা দুটি পদার্থকে একটি পাত্রে মিশিয়ে উত্তাপ দেন, যাতে বিক্রিয়া ঘটে। এতে কাঙ্ক্ষিত অণু তৈরি হলেও সঙ্গে সঙ্গে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত উপজাতও তৈরি হয়।
১৯৯২ সালে ইয়াগি যখন অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা দলনেতা হিসেবে প্রথম কাজ শুরু করেন, তখন তার লক্ষ্য ছিল আরও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে নতুন পদার্থ তৈরি করা। তিনি চেয়েছিলেন যৌক্তিক নকশার মাধ্যমে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানকে লেগো খেলার টুকরোর মতো যুক্ত করে বড় স্ফটিক বানাতে। কাজটি কঠিন ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সফল হন যখন ধাতব আয়নকে জৈব অণুর সঙ্গে যুক্ত করা শুরু করেন।
১৯৯৫ সালে ইয়াগি দুটি ভিন্ন ধরনের দ্বিমাত্রিক পদার্থের গঠন প্রকাশ করেন। এগুলো ছিল জালের মতো, যা তামা বা কোবাল্ট দিয়ে যুক্ত ছিল। পরেরটি তার ফাঁকা স্থানে অন্য অণু ধরে রাখতে পারত, এবং যখন সেগুলো পুরোপুরি ভর্তি থাকত তখন এতটাই স্থিতিশীল হতো যে ৩৫০° সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত করলেও ভেঙে পড়ত না। Nature জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ইয়াগি এই পদার্থের নাম দেন “মেটাল–অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক” (MOF)। এখন এই শব্দটি ব্যবহার করা হয় সম্প্রসারিত ও নিয়মিত আণবিক কাঠামো বোঝাতে, যেগুলো ধাতু ও জৈব (কার্বনভিত্তিক) অণু দিয়ে তৈরি হয় এবং যেগুলোর ভেতরে ফাঁকা স্থান থাকতে পারে।
১৯৯৯ সালে ইয়াগি MOF-এর বিকাশে পরবর্তী মাইলফলক স্থাপন করেন, যখন তিনি বিশ্বকে পরিচয় করান MOF-5-এর সঙ্গে। এই পদার্থটি এখন ক্ষেত্রটির এক ধ্রুপদি উদাহরণ। এটি অত্যন্ত প্রশস্ত ও স্থিতিশীল আণবিক কাঠামো। এমনকি ফাঁকা থাকলেও এটি ৩০০° সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত করা যায়, ভেঙে না গিয়ে।
তবে যে কারণে অনেক গবেষকের চোখ কপালে উঠেছিল, তা হলো, এই ঘনকীয় পদার্থের ভেতরে লুকানো বিশাল পৃষ্ঠতল। কয়েক গ্রাম MOF-5-এর ভেতরে জায়গা লুকিয়ে থাকে একটি ফুটবল মাঠের সমান! অর্থাৎ এটি জিওলাইটের চেয়ে অনেক বেশি গ্যাস শোষণ করতে সক্ষম।
জিওলাইট ও MOF-এর পার্থক্যের কথা বলতে গেলে, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই গবেষকেরা নরম MOF তৈরি করতে সফল হন। এর মধ্যে একটি নমনীয় পদার্থ তৈরি করেছিলেন সুসুমু কিতাগাওয়া নিজেই। যখন এই পদার্থ পানি বা মিথেন দিয়ে পূর্ণ হয়, এটি আকার বদলায়; আর খালি হলে আগের অবস্থায় ফিরে যায়। পদার্থটির আচরণ অনেকটা ফুসফুসের মতো, গ্যাস টেনে নেয় ও ছাড়ে, রূপ বদলায়, কিন্তু তবুও স্থিতিশীল থাকে।
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
ওমর ইয়াগি ২০০২ ও ২০০৩ সালে মেটাল–অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস (MOF)-এর ভিত্তি স্থাপনকে আরও মজবুত করেন। Science এবং Nature-এ প্রকাশিত দুটি আর্টিকেলে তিনি দেখান যে MOF-কে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিবর্তন ও সংশোধন করে নতুন বৈশিষ্ট্য দেওয়া সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, তিনি MOF-5-এর ১৬টি ভিন্ন সংস্করণ তৈরি করেন, যেগুলোর ফাঁপা জায়গা মূল উপাদানের তুলনায় কখনও বড়, কখনও ছোট ছিল। এর মধ্যে একটি সংস্করণ বিশাল পরিমাণ মিথেন গ্যাস সংরক্ষণ করতে সক্ষম ছিল, যা ইয়াগি প্রস্তাব করেন পুনর্নবীকরণযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাস (RNG)-চালিত যানবাহনে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এরপর থেকে MOF সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। গবেষকেরা বিভিন্ন ধরনের উপাদান নিয়ে একধরনের “আণবিক কিট” তৈরি করেছেন, যার সাহায্যে নতুন MOF ডিজাইন করা সম্ভব। এর আকৃতি ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন, ফলে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নতুন MOF তৈরি করা যায়। চিত্রে MOF-এর বিভিন্ন প্রয়োগের উদাহরণ দেখানো হয়েছে। যেমন, ইয়াগির দল যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা মরুভূমির বাতাস থেকে পানি সংগ্রহ করেছে। রাতে তাদের MOF উপাদান বাতাস থেকে জলীয় বাষ্প শোষণ করে রাখে। সকালে সূর্যের তাপে উত্তপ্ত হলে সেই পানি তারা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
এখন পর্যন্ত গবেষকেরা বহু ভিন্নধর্মী ও কার্যকর MOF তৈরি করেছেন। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই উপাদানগুলো এখনও ছোট পরিসরে ব্যবহার হচ্ছে, তবু মানবজাতির কল্যাণে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন ও প্রয়োগের জন্য অনেক কোম্পানি বিনিয়োগ শুরু করেছে। কিছু ক্ষেত্রে সফলতাও এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, ইলেকট্রনিক শিল্পে এখন সেমিকন্ডাক্টর তৈরির সময় প্রয়োজনীয় কিছু বিষাক্ত গ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখতে MOF ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার অন্য একটি MOF ক্ষতিকর গ্যাস ভেঙে ফেলতে পারে, যার মধ্যে রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহারযোগ্য কিছু গ্যাস রয়েছে। একইভাবে অনেক কোম্পানি পরীক্ষা করছে এমন উপাদান, যা কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড সংগ্রহ করতে পারে, ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো সম্ভব হবে।
MIL-101–এর বিশাল গহ্বর রয়েছে। এটি অপরিশোধিত তেল এবং দূষিত পানির অ্যান্টিবায়োটিক ভাঙার অনুঘটক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়াও এটি বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন বা কার্বন ডাই–অক্সাইড সংরক্ষণের জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে।
UiO-67 পানি থেকে PFAS (এক ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক) শোষণ করতে পারে, যা একে দূষণ অপসারণ ও পানি পরিশোধনের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পদার্থে পরিণত করেছে।
ZIF-8 পরীক্ষামূলকভাবে বর্জ্য পানির মধ্য থেকে বিরল ধাতু (rare-earth elements) উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
CALF-20 অসাধারণভাবে কার্বন ডাই–অক্সাইড শোষণ করতে সক্ষম। বর্তমানে এটি কানাডার একটি কারখানায় পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ক্রেডিট: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
কিছু গবেষক মনে করেন, MOF এতটাই সম্ভাবনাময় যে এটি একবিংশ শতাব্দীর উপাদান হয়ে উঠতে পারে। সময়ই বলে দেবে সেটি সত্যি হবে কিনা। তবে মেটাল–অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কসের উন্নয়নের মাধ্যমে সাসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন এবং ওমর ইয়াগি রসায়নবিদদের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন। এর ফলে তারা আলফ্রেড নোবেলের উইলে বর্ণিত ভাষায়, “মানবজাতির সর্বোচ্চ উপকারে” অবদান রেখেছেন।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।








