বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (AMD)–এর কারণে দৃষ্টিশক্তি হারানো বহু মানুষকে আবার দেখতে সাহায্য করেছে একটি ক্ষুদ্র রেটিনাল ইমপ্লান্ট। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাত্র ২ মিলিমিটার বাই ২ মিলিমিটার আকারের এবং ৩০ মাইক্রোমিটার পাতলা এই ডিভাইসটি চোখের রেটিনার নিচে প্রতিস্থাপন করা হয়, যেখানে এটি নষ্ট হয়ে যাওয়া আলো-সংবেদনশীল কোষের জায়গা নেয়।
এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে The New England Journal of Medicine-এ। গবেষণায় অংশ নেন ৩৮ জন গুরুতর AMD আক্রান্ত রোগী, যাদের রেটিনা প্রায় সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ইমপ্লান্ট দেওয়ার এক বছর পর দেখা যায়, ৮০% রোগীর দৃষ্টিশক্তিতে “চিকিৎসাগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি” ঘটেছে।
গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষুবিশেষজ্ঞ ফ্র্যাংক হোলৎস বলেন, “যেখানে রেটিনা সম্পূর্ণ মৃত ও অন্ধ ছিল, সেখানে আমরা দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পেরেছি। রোগীরা অক্ষর পড়তে পারছেন, শব্দ চিনতে পারছেন, এবং দৈনন্দিন কাজ করতে পারছেন।”
অপারেশনের কিছু ছোটখাটো জটিলতা থাকা সত্ত্বেও গবেষকরা মনে করেন ইমপ্লান্টের সুফল ঝুঁকির তুলনায় অনেক বেশি। ডিভাইসটির মালিক যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক নিউরোটেকনোলজি কোম্পানি Science Corporation ইতিমধ্যে ইউরোপীয় বাজারে বিক্রির অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের চক্ষুবিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেসকা কর্ডেইরো বলেন, “এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্দরভাবে পরিকল্পিত গবেষণা। যাদের জন্য আগে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা কেবল সায়েন্স ফিকশন মনে হতো, তাদের জন্য এটি এখন বাস্তব সম্ভাবনা।”
দৃষ্টি ফিরে পাওয়া
AMD হলো বয়স্কদের মধ্যে অন্ধত্বের সবচেয়ে সাধারণ ও এখনো অনিরাময়যোগ্য কারণ। এর দুটি ধরন রয়েছে, ‘ওয়েট’ ও ‘ড্রাই’। এই গবেষণায় ছিল ড্রাই AMD আক্রান্ত রোগীরা, সারা বিশ্বে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ ভোগেন। এতে কেন্দ্রীয় রেটিনার আলোক-সংবেদনশীল কোষ ধীরে ধীরে মারা যায়, ফলে পাশের দৃষ্টি ঠিক থাকলেও সামনের পরিষ্কার দৃষ্টি নষ্ট হয়। এতে মানুষ মুখ চিনতে, পড়তে, গাড়ি চালাতে বা টেলিভিশন দেখতে পারে না।
রেটিনার রড ও কোণ নামের কোষগুলো আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে মস্তিষ্কে পাঠায়। AMD তে এরা মারা গেলেও অন্যান্য রেটিনা কোষ টিকে থাকে। তাই বিজ্ঞানীরা ভাবেন, এমন একটি আলো-সংবেদনশীল ইমপ্লান্ট তৈরি করা যায় কি না যা বৈদ্যুতিকভাবে এই কোষগুলোকে উদ্দীপিত করে আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে।
ফোটোভোল্টায়িক ইমপ্লান্ট PRIMA
এই ইমপ্লান্টটির নাম PRIMA (Photovoltaic Retina Implant Microarray)। এটি মূলত ফরাসি কোম্পানি Pixium Vision তৈরি করেছিল, পরে সেটি অধিগ্রহণ করে Science Corporation। এটি সম্পূর্ণ রেডিও এবং ফোটোভোল্টায়িক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থাৎ যে আলো এটিকে সক্রিয় করে, সেটিই এর শক্তির উৎস হিসেবেও কাজ করে।
রোগীরা এটি ব্যবহার করেন বিশেষ চশমার সঙ্গে, যাতে একটি ক্যামেরা থাকে। ক্যামেরাটি আশেপাশের দৃশ্য ধারণ করে এবং ইনফ্রারেড আলোর প্যাটার্নে রূপান্তর করে রেটিনায় পাঠায়। ব্যবহারকারীরা এতে জুম, কনট্রাস্ট ও উজ্জ্বলতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, যদিও এটি সঠিকভাবে ব্যবহার শিখতে কয়েক মাসের প্রশিক্ষণ লাগে।
গবেষণায় ৫টি ইউরোপীয় দেশের ১৭টি সাইটে ৩৮ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এক বছর পর যাদের পরীক্ষা করা হয়, তাদের মধ্যে ২৬ জনের দৃষ্টিশক্তিতে অর্থবহ উন্নতি দেখা গেছে, গড়ে তারা চোখের পরীক্ষার চার্টে দুই লাইন নিচের অক্ষর পর্যন্ত পড়তে পারছিলেন। বেশিরভাগ রোগীর দৃষ্টিশক্তি প্রায় PRIMA–এর সীমার কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
অবশেষে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই বাড়িতে PRIMA ব্যবহার করে অক্ষর, শব্দ ও সংখ্যা পড়তে পারছিলেন। ৩২ জনের মধ্যে ২২ জন জানিয়েছেন, তাদের সন্তুষ্টির মাত্রা “মাঝারি থেকে উচ্চ”।
সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
তবে ব্যবহারকারীদের জীবনমানের সামগ্রিক উন্নতি তেমন পরিলক্ষিত হয়নি। কিছু গবেষক মনে করেন, নতুন ও আকর্ষণীয় ডিভাইস পাওয়ার উচ্ছ্বাস এবং কঠোর প্রশিক্ষণের ফলেও উন্নতি দেখা যেতে পারে। প্লাসিবো গ্রুপের সঙ্গে তুলনা করলে ফলাফল আরও নির্ভরযোগ্য হতো।
হোলৎস নিজেও স্বীকার করেন যে সিস্টেমের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, “এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা মাত্র — এখান থেকে ভবিষ্যতে আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি সম্ভব।”
বর্তমান ডিভাইসটিতে মাত্র ৩৮১টি পিক্সেল আছে, প্রতিটি ১০০ মাইক্রোমিটার আকারের। ফলে পড়ার গতি ধীর এবং দেখা যায় শুধু সাদা-কালো চিত্র, রঙ নয়। তবে মূল ডিজাইনার, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ ড্যানিয়েল প্যালিঙ্কার ভবিষ্যতে রঙিন দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছেন। ছোট পিক্সেল ও বড় ডিভাইসের পরবর্তী সংস্করণ আরও সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
AMD ছাড়াও, এই ইমপ্লান্ট রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার মতো অন্যান্য রোগে আক্রান্তদেরও সাহায্য করতে পারে, যেখানে আলো-সংবেদনশীল কোষ নষ্ট হয় কিন্তু রেটিনার বাকি অংশ সচল থাকে।
তবে এটি একমাত্র সমাধান নয়, বিজ্ঞানীরা স্টেম সেল থেরাপি, অপটোজেনেটিক প্রযুক্তি, এমনকি মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সে ইমপ্লান্ট বসানোর দিকেও কাজ করছেন।
হোলৎসের ভাষায়, “এটি এক বিশাল, পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র, ভবিষ্যতে কোন প্রযুক্তি সবচেয়ে সফল হবে, এখনই বলা কঠিন।”
———
Subretinal Photovoltaic Implant to Restore Vision in Geographic Atrophy Due to AMD. NEJM (2025).
DOI: 10.1056/NEJMoa2501396
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


