চাঁদের দূরপৃষ্ঠ থেকে সংগৃহীত প্রথম পাথরের নমুনা ঘেঁটে চীনের বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন এক চমকপ্রদ আবিষ্কার। এক ধরনের বিরল উল্কাপিণ্ডের টুকরো, যা সৌরজগতের ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে। চীনের ছাং’ই-৬ (Chang’e-6) মিশনের মাধ্যমে সংগৃহীত এই নমুনাগুলো গত বছরের জুনে পৃথিবীতে ফেরত আসে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই টুকরোগুলো এমন কিছু গ্রহাণুর গুড়ো রয়েছে যেগুলি সৌরজগতের জন্মের আগের। এর রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারবেন, কীভাবে এই গ্রহাণুগুলো পৃথিবী ও চাঁদের মতো গ্রহীয় বস্তুকে পানি-সহ নানা উদ্বায়ী যৌগ দিয়ে সমৃদ্ধ করেছিল।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী ইউকি কিয়ান বলেন, “ছাং’ই-৬ মিশনের লক্ষ্যগুলোর তালিকায় এটা ছিল না তবু এমন এক অপ্রত্যাশিত ও গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার সামনে এসেছে।” এই আবিষ্কারের ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে Proceedings of the National Academy of Sciences জার্নালে।
চাঁদের কাছের পৃষ্ঠ ও দূরপৃষ্ঠ
যেসব মিশন এখন পর্যন্ত চাঁদ থেকে পাথরের নমুনা সংগ্রহ করেছে, তাদের বেশিরভাগই চাঁদের পৃথিবীমুখী অংশ (নিয়ার সাইড) থেকে নিয়েছে—যেখানে অপেক্ষাকৃত কম গর্ত ও বেশি আগ্নেয়গিরি কার্যকলাপ দেখা যায়। কিন্তু ছাং’ই-৬ অবতরণ করেছে চাঁদের দূরপৃষ্ঠ দিকের দক্ষিণ মেরু এইটকেন বেসিনে, যা চাঁদের পৃষ্ঠের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জুড়ে বিস্তৃত সবচেয়ে বড় ও গভীরতম গর্ত। এর একটি মূল লক্ষ্য ছিল, কেন চাঁদের এই দিকটি পৃথিবীমুখী দিকের থেকে এতটা আলাদা, তা বোঝা।
ক্রেডিট: Yi-Gang Xu
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রায় চার বিলিয়ন বছর আগে এক বিশাল গ্রহাণুর সংঘর্ষে এই গর্তটি তৈরি হয়। ফলে এখানে সেই সংঘর্ষ ও অন্যান্য উল্কাপাতের টুকরো ছাড়াও চাঁদের অভ্যন্তরীণ স্তর (ম্যান্টল)-এর শিলাখণ্ডও রয়েছে, যা সংঘর্ষে ওপরের দিকে উঠে এসেছে।
চমকপ্রদ আবিষ্কার
যখন গবেষকেরা প্রথমে এই বিরল উল্কাখণ্ডগুলো দেখেন, তারা ভেবেছিলেন এগুলো চাঁদের ম্যান্টল থেকেই এসেছে। কিন্তু লোহা, ম্যাঙ্গানিজ ও দস্তার পরিমাণ বিশ্লেষণ করে তারা দেখেন, এগুলোর রাসায়নিক গঠন চাঁদের অন্যান্য নমুনার সঙ্গে মেলে না। এরপর তারা তিনটি অক্সিজেন আইসোটোপের অনুপাত পরীক্ষা করেন। চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেসের গুওয়াংজু ইনস্টিটিউট অব জিওকেমিস্ট্রির গবেষক মাং লিন বলেন, “এই অনুপাত আসলে মানুষের আঙুলের ছাপের মতো৷ এটি বলে দিতে পারে, কোন গ্রহীয় বস্তু থেকে এই নমুনা এসেছে। এটা একপ্রকার মহাকাশ ফরেনসিক্স।”
ফলাফল দেখায়, এই উল্কাখণ্ডের আইসোটোপ স্বাক্ষর মানব-অধ্যয়নকৃত দুই গ্রহাণু রিউগু ও বেন্নুর সঙ্গে মিলে যায়। জাপান ২০১৯ সালে রিউগু ও নাসা ২০২০ সালে বেন্নু থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। উভয় গ্রহাণুতেই পাওয়া গিয়েছিল সৌরজগতের আগের ধূলিকণা ও জলসহ উদ্বায়ী যৌগ।
গবেষকেরা মনে করছেন, এই ধরনের গ্রহাণুই একসময় চাঁদ ও পৃথিবীতে প্রচুর পানি ও যৌগ সরবরাহ করেছিল। নমুনার রাসায়নিক গঠন আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে জানা যেতে পারে, এমন মহাজাগতিক শিলাগুলো পৃথিবী ও চাঁদের বিকাশে কী ভূমিকা রেখেছিল।
গবেষণাপত্রের সহলেখক জিনটুয়ান ওয়াং বলেন, “এই ধরনের উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে খুব কমই টিকে থাকে, কারণ এরা অত্যন্ত ভঙ্গুর, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলেই ভেঙে যায়।”
দলনেতা ই-গ্যাং শু জানান, ভবিষ্যতে ছাং’ই-৬ থেকে সংগৃহীত আরও নমুনা বিশ্লেষণ করে তারা হয়তো এই উল্কাখণ্ডগুলোর বয়স নির্ধারণ করতে পারবেন। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে, এগুলোর মূল গ্রহাণুই কি না চাঁদের দক্ষিণ মেরু–এইটকেন বেসিন তৈরির কারণ ছিল।
———
Impactor relics of CI-like chondrites in Chang’e-6 lunar samples. PNAS (2025).
DOI: 10.1073/pnas.2501614122
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



